আংটি দিয়েই গলে যেত বারো হাত শাড়ি, বাংলার মসলিন যে কারণে আজও খুঁজছে সারা বিশ্ব
Bengal Maslin : মসলিনের এমন কদর ছিল যে বিদেশিরা হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোল বা গণ্ডারের শিং-র মত মূল্যবান জিনিসের বদলে কিনত এই কাপড়

প্রাচীনকাল থেকেই বয়ন শিল্পে বিশেষ স্থান দখল করেছিল বাংলা। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও পুস্তকমালা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় এসবের। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, দক্ষিণ ভারতের গোলমরিচ ও বাংলার মসলিন দুইই নাকি বিদেশিদের আকৃষ্ট করেছিল। মসলিনের এমন কদর ছিল যে বিদেশিরা হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোল বা গণ্ডারের শিং-র মত মূল্যবান জিনিসের বদলে কিনত এই কাপড়। তবে এদের মধ্যে রোমানদের কাছে মসলিনের মূল্য ছিল সোনার চেয়েও দামি। তারা নাকি সোনার বিনিময়ে কিনে নিয়ে যেত এই কাপড়। তারা যে এইধরনের কাপড় ব্যবহার করত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মমি দেখে। আর এই রোমানদের হাত ধরেই সমগ্র ইউরোপের ছড়িয়ে পড়ে বাংলার মসলিন শিল্প।
চৈনিক পর্যটক মা হুয়ান পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতে এসেছিলেন। তাঁর লেখা ভ্রমণবৃত্তান্ততেও বাংলার মসলিনের উল্লেখ আছে। তাঁর লেখা তথ্য অনুযায়ী, সেইসময় বাংলায় পাঁচ থেকে ছয় রকমের উৎকৃষ্ট মানের মসলিন পাওয়া যেত। আর সেইসব মসলিনের তৈরি উপাদান চীনের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হত। মুঘল আমলে বাংলা থেকে মসলিন, সিল্ক ও মুক্তো সারা বিশ্বে সরবরাহ করা হত। এই সময়, বাংলা ছিল সূতিবস্ত্র তৈরির প্রধান এলাকা। আর এর কেন্দ্রগুলি ছিল ঢাকা জেলার চারপাশে। তাই মসলিনের তৈরি উপাদান মধ্য এশিয়ায় ‘ডাকা’(daka) নামে বিশেষ খ্যাতি লাভ করতে থাকে। বাংলা থেকে তৈরি সূতিবস্ত্র ও শিল্প পাঠানো হত ইউরোপ, ইন্দোনেশিয়া, জাপানেও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Suta Bombay Brand: ২০১৬ সালে নিজেদের জমানো পুঁজি থেকে তিন লক্ষ করে দিয়ে শুরু হয় শাড়ির ব্যবসা। সুজাতার ‘সু’ এবং তানিয়া নামের ‘তা’ মিলে ব্র্যান্ডের নাম রাখলেন তাঁরা ‘সুতা’।
পূর্বের সেই গৌরব এখনও অটুট। আজ, বাংলা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পরেও দুই বাংলাতেই মসলিন, সিল্ক ও সূতিবস্ত্রের আগের মতো সমান গৌরব বজায় আছে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমানে চাষ হচ্ছে মসলিন কীটের। জানা যায়, এই চাষের ক্ষেত্রে কোনোরকম কীটনাশক বা সারের ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয় মসলিন কীট। ক্রমে চাহিদা বাড়ায় বেড়েছে চাষের পরিসরও। বর্তমানে বর্ধমানের সমুদ্রগড়র অকালপৌষ ও সাসিনাড়া গ্রামেও চাষ হচ্ছে মসলিন কীটের। এছাড়াও নদিয়ার নবদ্বীপে, মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে সমান তালে চলছে এই চাষ। শোনা যায়, এদের মধ্যে বর্ধমানে তৈরি করা মসলিন শাড়ি এতই নরম ও সূক্ষ্ম যে, একটি আংটির মধ্যে দিয়ে গলে যেতে পারে সেটি।
বাংলার মসলিন আজও সারা বিশ্বের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। আর এই কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদি উদ্যোগ ভবন, রাজ্য গ্রামীণ শিল্প বোর্ড এবং কিন্ডলিং হ্যান্ডিক্রাফটস অ্যান্ড ইন্ডিজেনাস আর্ট-এর যৌথ উদ্যোগে এক অভিনব ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছে কয়েকবছর ধরে। নাম - ‘মসলিন সার্কিট ভ্রমণ’। মসলিন কাপড় যেমন উপাদেয়, তেমনি দেখার মতো তার বয়ন পদ্ধতি ও গুটিগুলিও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Malmal Saree: যারা ট্রেন্ডি না হয়ে এই শরতে হতে চাইছে স্টাইলিশ, এই শরতে তাদের জন্য এমন অন্যরকম সাজের ভাবনা ভাবা যেতেই পারে।
কী হয় এই মসলিন সার্কিট ভ্রমণে? দেখা যাক সেসব। দুবছর ধরে প্রচুর বিদেশি এই ধরনের ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে ঘুরতে আসছেন পশ্চিমবঙ্গে। তাঁদের দেখানো হয় মসলিন চাষের পদ্ধতি, কীভাবে গুটি থেকে সুতো কাটা হয়, বুনন কীভাবে হয় - ইত্যাদি নানা বিষয়। শুধু তাই নয়, সামনে তৈরি করা কাপড়ের কাজ দেখে পছন্দ হলে সঙ্গে করে কিনেও নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন ক্রেতারা। ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে এখানেই তৈরি করা হয়েছে বিশ্রামের ঘর, বাথরুম। রয়েছে খাবার সহ চা-কফির ব্যবস্থাও। ভ্রমণকারীরা বর্ধমান, নদীয়া ও মুর্শিদাবাদের জেলা সার্কিট হাউসের থেকে এই গ্রামগুলিতে ভ্রমণে যেতে পারেন।
এই উদ্যোগে গ্রামীণ শিল্পীদের যেমন অর্থের যোগান হচ্ছে, তেমনি বিদেশিদের আগমনে রাজ্য তথা দেশের অর্থব্যবস্থার উপরও প্রভাব পড়ছে। বাড়ছে অর্থকোষ। বর্তমানে এই রাজ্যের মসলিন কাপড়ের বেশ চাহিদা দেখা দিয়েছে গ্রেট ব্রিটেন ও অষ্ট্রেলিয়ায়। এই উদ্যোগ দীর্ঘায়িত হলে, আশা করা যায় মসলিনের বাজার ভবিষ্যতে আরও ছড়িয়ে পড়বে, যাতে আখেরে লাভবান হবে বাংলাই।
















