ট্রেন্ড আসে যায়, বিজয়িনী সেই শাড়িই! মলমলে লেগে কাশফুলের গন্ধ

Malmal Saree: যারা ট্রেন্ডি না হয়ে এই শরতে হতে চাইছে স্টাইলিশ, এই শরতে তাদের জন্য এমন অন্যরকম সাজের ভাবনা ভাবা যেতেই পারে।

Rimpi
৩ মিনিট
ট্রেন্ড আসে যায়, বিজয়িনী সেই শাড়িই! মলমলে লেগে কাশফুলের গন্ধ

আলসেমির রং কী হতে পারে? যে কোনও হালকা রংই হয়তো হতে পারে আলসেমির র‌ং। ধরা যাক, সবুজ। ঠিক গাঢ় সবুজ নয়, হালকা। যেরকমটা শরতে কচি ঘাসের গায়ে রোদ পড়লে দেখা যায়, তেমন একটা নরম রং দেখতে পাই আমরা। সেই রং যদি দু'-মুঠো ছড়িয়ে নেওয়া যায় শাড়িতে! অবশ্য সেটা যে সে শাড়ি হলে হবে না। শাড়ি হতে হবে সুতির, মলমল কাপড়ের। মলমল সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র। অবন ঠাকুর লিখেছিলেন, "কারো গায়ে ফুলদার লক্ষ টাকার মলমলি চাদর।" একসময় বেশ চল ছিল মলমলের ধুতির– বঙ্কিমচন্দ্রর 'রজনী' উপন্যাসে রামসদয়বাবু মলমলের ধুতি পরতেন।

এসব পুরনো কথা থাক। মন ধরা দিক মলমলের শাড়িতে। তার আঁচল হতে হবে ফুরফুরে হাওয়ার মতো দস্যি। ব্লাউজখানি হোক না কাশফুলের মতো সাদা রাফল স্লিভ। বা হাকোবা ব্লাউজেও মন্দ লাগবে না। নরম রঙের তো এই এক মজা। তাকে ধারণ করতে হয়। আর ধারণ করতে পারলেই, ঝলমলে গাঢ় রঙের পোশাকের ভিড়ে, সে হয়ে উঠবে ভোরবেলার মতো আদুরে। নরম রং, তারও তো মায়া আছে। সবুজ শাড়ির আঁচলে বাতাস খেলা করে গেলে, মনে তো হবেই যেন কাশের বনে ঢেউ লেগেছে। অথচ এই সাজে যে হেঁটে যাবে, সে শুভঙ্করের নন্দিনী নয়, অমিত-র লাবণ্য নয়, সে বরং সুনীলের নীরা। ছটফটে, প্রাণবন্ত। ছেলেমানুষির আলস্য-রঙ তার পোশাকে, তার চলায়। যে যুবতী ছিল, অথচ কোন পুণ্যে ফের কিশোরী হলো, কেউ জানে না।

শিশির ভেজা ঘাসে তোমার চাঁপা রঙের পা

তোমার চোখে চোখ রেখেছে সদ্য ফোটা জুঁই

সেই মুহূর্তে নীরা তুমি টেরও পেলে না

ফুলকে ছেড়ে ভ্রমর বললো কিশোরীটিকে ছুঁই।

এই যে মায়ারং-এর কথা বললাম, সে রঙ কি খুব পরিপাটি? একদমই না। আলস্য আর মায়া, এই দুই-ই ভারি অগোছালো। শীতের বেড়ালের মতো এলোমেলো বসে মিঠে-রোদ পোহায়। শান্তিনিকেতনের মেয়েরা তেমন আলস্য জড়ায় শাড়িতে। এখানে শাড়ির প্লিট পরিপাটি আর ক'জনেরই বা থাকে! কাঁধের কাছে জড়ো হয়ে থাকা শাড়ির আঁচল দেখে মনে হতেও পারে কী তাড়াহুড়ো! যেন গুছিয়ে শাড়িটা পরার অবকাশটুকু পায়নি। অথচ, এ এখানকার নিজস্ব স্টাইল। কখনও খোলা চুল, কখনও আবার হাতখোঁপা থেকে উঁকি দেবে গুলঞ্চ, রঙ্গন, বা মধুমালতীরা। গয়নাগাটি পরলেও হয়, না পরলেও। জোরজার নেই কারও। শুধু কপালে টিপখানি, বিকেলের অস্তসূর্যের মতো চেয়ে থাকে যেন। একদা শান্তিনিকেতনের মেয়েরা কপালে খয়েরের টিপ পরত, কেউ পরত গুঁড়ো টিপ, কেউ বা শিউলিফুলের পাপড়ির রস দিয়ে কপাল রাঙাত। আজকাল প্রাকৃতিক টিপের চল কমেছে, তবে একেবারে উঠে যায়নি। এখনও শান্তিনিকেতনে কোনও কোনও মেয়ে, গুঁড়ো টিপে কপাল সাজিয়ে কোমরে সুতি শাড়ির আঁচলখানি গুঁজে সাইকেল চালিয়ে চলে যায় হুস করে। ঝরা শালের পাতার ওপর দিয়ে তাদের চলে যাওয়ার শব্দ মর্মরিয়ে ওঠে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রিয় শান্তিনিকেতনের হরিচরণ 'বঙ্গীয় শব্দকোষ'-এ জানিয়েছেন, সংস্কৃত 'মর্মর' থেকে এসেছে মলমল। অর্থ, বস্ত্রধ্বনি। মলমলের শাড়ি পরে সাইকেলবিহারিণী যখন কোপাই নদীর পানে যায় তখন পুরুষের মনে ধ্বনি গুঞ্জরিয়া উঠে।

ছবিতে: রিম্পি, ছবিওয়ালা: সুব্রত ঘোষ

কিন্তু এই যে পোশাকের রং নিয়ে, ধরন নিয়ে এত ভাবছি, কেন ভাবছি- তা মনে হতেই পারে। আজকাল যে কোনও রঙ যে কোনও সময় যে কেউ পরতেই পারে। তাতে কোনও আপত্তি নেই। এটাই এখন ট্রেন্ডি। কিন্তু যারা ট্রেন্ডে গা না ভাসিয়ে হাঁটতে চাইছে একেবারে একার রাস্তায়, তারা? যেমন হাঁটতেন রবীন্দ্রনাথ। সব ঋতুতে সব রঙের সাজ যে চলে না এ-কথা মানতেন তিনি। রাণী চন্দর লেখায় আছে সে-সব কথা। রবীন্দ্রনাথের মতো যারা ট্রেন্ডি না হয়ে এই শরতে হতে চাইছে স্টাইলিশ, যারা একটু গুছিয়ে একটা অগোছালো মনকে দেখতে চাইছে, এই শরতে তাদের জন্য এমন অন্যরকম সাজের ভাবনা ভাবা যেতেই পারে। এই যে অলংকারবিহীন একটা সাজ, তাই বলে কি সত্যি সত্যিই কোনও অলংকার থাকবে না? থাকবে। তবে সেই অলংকার প্রকৃতির, রঙের, সৌন্দর্যের। সাজতে বসে নিজেকে ঢেকে ফেলে অন্য কেউ হয়ে ওঠা তো শান্তিনিকেতনের সাজ নয়। বরং নিজের ভেতর থেকে নিজেকে আরও বেশি করে টেনে বের করে আনাই হলো এখানকার সাজ। তার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়া চাই।

শান্তিনিকেতন তো এভাবেই প্রকৃতি আর মানুষকে মিলিয়ে দেওয়ার গল্প বলছে বহুকাল ধরে। ঋতু বদলে গেলেই এখানে বদলে যায় পোশাকের রঙ। কাজেই ঠিক সময়ে প্রকৃতি থেকে ঠিক রংটা বেছে নিতে হবে। এই শরতে ঘাসরঙা শাড়ি আর কাশরঙা ব্লাউজে মেয়েরা খুঁজে নিক নিজেকে।

লিখেছেন
Rimpi
Rimpi
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?