সঙ্গী ১১৯ বছরের পুরনো প্রজেক্টর, যে ভাবে বেঁচে আছেন কলকাতার শেষ বায়োস্কোপওয়ালা

Tammanna Taj Tonni
৩ মিনিট
সঙ্গী ১১৯ বছরের পুরনো প্রজেক্টর, যে ভাবে বেঁচে আছেন কলকাতার শেষ বায়োস্কোপওয়ালা

ত্রিপল টাঙিয়ে গজিয়ে উঠেছে সারি সারি দোকান। কোনোটায় জ্বাল হচ্ছে এক কড়াই দুধ। পাশেই কোথাও এক কোপে মাংসের ধড়মুণ্ডু আলাদা করছে কসাই। রাস্তার ওপর থরে থরে সাজানো চটচটে তেলের ড্রাম। চারপাশে জমাট নোংরার স্তুপ। কলেজ স্ট্রিটের খুব কাছে। আমার-আপনার অচেনা কলকাতা। কলাবাগানের মার্কাস স্কোয়ার।

সেখানে ৮/১০ ফুটের ছোট্ট খুপড়িতে থাকেন বছর ৬২-র মহম্মদ সেলিম। পরিবারের সদস্য বলতে ৮ জন। স্ত্রী, ৪ ছেলে, ২ মেয়ে এবং ১১৯ বছরের পুরনো একটি প্রোজেক্টর। তাঁর নানা-র আমল থেকে প্রোজেক্টরটা পরিবারের সঙ্গে। কত উত্থান-পতনের সাক্ষী। ঘরে ঘরে টেলিভিশন এল, তারপর মোবাইল, এখন ইন্টারনেট। আগে বায়োস্কোপ দেখতে কচিকাঁচারা ছুটে আসত। আজকাল ফিরেও তাকায় না। হাতে মোবাইল, ছেলেমেয়েরা স্মার্ট হয়েছে। দর কমেছে পুরনো প্রজেক্টরের। তাই বলে বাতিল করে দেবেন! কত জনে বলেছে, লোহালক্কড়ের দোকানে বিক্রি করে দাও। ভাল দাম পাবে। ওসব শুনলে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে সেলিমের। প্রোজেক্টর ছাড়া আজও অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না। “ওই যে আপনারা কী বলেন না, যদি হও সুজন তেঁতুলপাতায় ন’জন। আমরা আটজনে মিলেমিশে বেশ ভালোই আছি।”

সময়টা ১৮৯৮। হীরালাল সেন প্রতিষ্ঠা করলেন রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি। বাংলার প্রথম প্রোডাকশন হাউস। সেলিমের নানা ছিলেন রয়্যাল বায়োস্কোপের কর্মী। সেই থেকে পরিবারের রক্তে মিশে গেল সিনেমা। তিন পুরুষ ধরে তাঁরা সানন্দে বায়োস্কোপওয়ালা।

সেটা গত শতাব্দীর ছয়ের দশক। বাবার সঙ্গে গুটি গুটি পায়ে প্রোজেক্টর নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন যুবক সেলিম। দিলীপকুমার তখন মধ্যগগনে। একা হাতে শাসন করছেন গোটা বলিউড। সেলিমের প্রিয় নায়ক বলে কথা। ‘দিল দিয়া দর্দ লিয়া’ কিংবা ‘গঙ্গা যমুনা’-র মতো এক সে-এক হিট ছবির ক্লিপ চালিয়ে দিতেন প্রোজেক্টরে। রেগে যেতেন আব্বা। আব্বার চিরকালের পছন্দ অশোককুমার। এই নিয়ে বাবা-ছেলের কত ঝগড়াই না হয়েছে। এখন ভাবলে হাসি পায়। কোথায় মিলিয়ে গেল সেই সব দিন!

এই তো সেদিন! আটের দশকেও ব্যারাকপুর, মেটিয়াবুরুজ, বরানগরের রাস্তায় রাস্তায় প্রোজেক্টর নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। স্পষ্ট মনে পড়ে মহম্মদ সেলিমের। রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্র, শ্রীদেবী-র ছবি দেখতে ছেঁকে ধরত কচিকাঁচারা। প্রত্যেকের হাতে ২৫ পয়সার কয়েন। কালো কাপড়ে ঢাকা ম্যাজিক বক্সে চোখ রাখতেই হাসি ফুটে উঠত মুখে। হাসি দেখে মন ভাল হয়ে যেত সেলিমের। একসময় কলকাতার প্রত্যেক পাড়ায় ঘুরে বেড়াত এই বায়োস্কোপওয়ালারা। মা-বাবারা তখন সন্দেহের চোখে তাকাত না। অবলীলায় এগিয়ে দিত ছেলেমেয়েদের। কখনওসখনও নিজেরাও চোখ গলিয়ে দেখে নিত পছন্দের তারকাদের। লো-ওয়াট বাল্বের আলোআঁধারি যে এমন মায়াবী দৃশ্য তৈরি করতে পারে, আজও ভাবতে বসলে আশ্চর্য লাগে সেলিমের।

বায়োস্কোপ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন লাগাতার। বাজার তখন পড়তির দিকে। অনুরোধ করলেন এক ইঞ্জিনিয়ারকে। ছবির সঙ্গে শব্দ যোগ হল প্রোজেক্টরে। বদলে ফেললেন পুরনো ছবির ক্লিপ। পৌঁছে গেলেন মুরগিহাটা। ৫ টাকায় ১ কিলো বাতিল ফিল্ম কিনে নিজেই বানিয়ে ফেললেন ছোট্ট একটা ছবি। এ জেলা থেকে সে জেলা। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্য। মেলায়-মেলায় নতুন ছবি আর প্রোজেক্টরের গাড়ি নিয়ে কম ঘোরেননি। অনেকদিন পর যখন বাড়ি ফিরতেন চোখে জল আসত। ওই তো সামান্য আয়! ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু কিনবেন, সেই সামর্থ হত না।

২০০৭ সালে সেলিমকে নিয়ে তৈরি হল তথ্যচিত্র। টিম স্টার্নবার্গ বিশ্বের দরবারে তুলে ধরলেন কলকাতার এক বায়োস্কোপওয়ালার কাহিনি। সেই বছর অস্কারে মনোনীত হল ছবিটি। শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে গিয়েছিল ৮/১০–এর ছোট্ট ঘরে। ২০১৫ সালে ডাক পেয়েছেন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও। ‘ফুল অউর কাঁটে’ ছবি থেকে ৭ মিনিটের বায়োস্কোপ বানিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন নন্দনে। লোকজনের লাইন পড়ে গেল। তাঁকে ঘিরে অটোগ্রাফ, সেলফি কত কী! সেলিম ভালই জানে আসলে ওসব হুজুগ! সাতদিনের মাতামাতি। তারপর যে কে সেই! মার্কাস স্কোয়ারের এঁদো গলি। ছোট্ট খুপড়ি। বাতিল যন্ত্র আর ঝাপসা হয়ে আসা চোখ!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।