নুপুর বিতর্কে মুসলিম বিশ্বর গোঁসা, যে কারণে সম্পর্ক মেরামতে মরিয়া ভারত

বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র নুপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যে উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ। নবী সম্পর্কে নুপুর শর্মার মন্তব্যর জের শুধুই দেশে নয়, বিদেশের একাধিক জায়গায় পরে। অতীতেও বিজেপির একাধিক নেতা কর্মীর ইসলাম-বিরোধী মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। কিন্তু এইবার নুপুর শর্মার মন্তব্যের পরই ভারতের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিকভাবে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশন। এর ৫৭টি সদস্য দেশের মধ্যে রয়েছে কাতার, কুয়েত, ইরান, বাহারিন, ওমান, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশ। ইসলাম ধর্মগুরু মহম্মদ সম্পর্কে নুপুর শর্মার মন্তব্যে ক্ষিপ্ত ছয় সদস্যের গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলও। ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক সুদূরপ্রসারী ইতিহাস আছে। সেই সম্পর্ক অটুট রাখতে ভারত একপ্রকার বদ্ধপরিকর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে থাকা ভারতীয় রাষ্ট্রদূতরা ইতিমধ্যেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় বসতে শুরু করেছে।

ভারতের ভাবনার কারণ কী?
ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সাংস্কৃতিক, আর্থিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বহু পুরনো। প্রথম যখন এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের বাণিজ্যের ধারণা চালু হলো, তখন থেকেই এদের সম্পর্কের শুরু। আবার ভারতের সঙ্গে গ্রিস, রোম এবং সমগ্র ইউরোপের বাণিজ্যের সেতু হিসেবে কাজ করত পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি। এই দেশগুলির পথ ধরেই ভারত ইউরোপের দেশগুলিতে মশলা, রেশম, নীল রপ্তানি করত এবং বিনিময়ে ইউরোপ থেকে আমদানি করা হতো সোনা, রূপা।

ব্রিটিশ-শাসনাধীন ভারতেও মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন চলত। পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে বিপুল খনিজ তেলের সন্ধান ভারত এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে এদের বাণিজ্যিক চরিত্রকে বদলে দেয়।

আরও পড়ুন: মুসলিম বিশ্বের চাপে বেকায়দায় ভারত, সামাল দিতে কী অস্ত্র মোদি-শাহর?

বর্তমানে ভারতের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ছয় ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি। মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকেই প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৩/৫ ভাগ আমদানি করে ভারত। শুধু তাই নয়, কর্মসংস্থানেরও বড় বাজার তৈরি করেছে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি। সংখ্যার হিসেবে ধরলে প্রায় ৮৯ লাখ ভারতীয় বিভিন্ন পেশায় আরব, কুয়েত, দুবাই, ইরাক, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলিতে কর্মরত। এইসব প্রবাসী ভারতীয়রা প্রায় বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ তাঁদের পরিবারের কাছে পাঠায়, যা ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডর অন্যতম পরিচালক শক্তি হিসেবে কাজ করে। গত বছরই আরও বিনিয়োগের লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সঙ্গে একটি আর্থিক চুক্তি করে ভারত। ভারতের মূল লক্ষ্য ছিল, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের সম্পর্ককে আরও মজবুত করা। নুপুর শর্মার মন্তব্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির কড়া পদক্ষেপের পর ভারত স্বাভাবিকভাবেই ড্যামেজ কন্ট্রোলের পথে হাঁটছে।

পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি এবং ভারতের নির্ভরতা
ভারতে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উত্তোলন হয় তা দিয়ে গোটা দেশের চাহিদার ২০ শতাংশও পূর্ণ হয় না। দেশের বাজারে অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি মেটাতে প্রায় ৮০ শতাংশ তেলই ভারতকে আমদানি করতে হয়। অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বলে একটি সংস্থা ‘ইন্ডিয়াস অয়েল ইমপোর্টস: ট্রেন্ডস ইন ডাইভারসিফিকেশন’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। সেই গবেষণাপত্র অনুযায়ী শেষ ১৫ বছর ধরে ভারত প্রায় ৬০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরবের মোট দেশগুলির থেকে। ২০২০-'২১ অর্থবর্ষে ভারত মোট তেল আমদানির ২২ শতাংশ করেছে ইরাক থেকে, ১৮ শতাংশ করেছে সৌদি আরব থেকে। ২০২১ আর্থিক বর্ষে ভারতকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করার তালিকায় প্রথম দশে আছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, ওমান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলি।

পরিশোধিত তেলেরও একটা বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই। ভারত সরকারের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তথ্য বলছে, কম সালফারযুক্ত পেট্রোলিয়াম ও বেশি সালফারযুক্ত পেট্রোলিয়াম- উভয় ক্ষেত্রেই ভারত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষত ওমান, দুবাই থেকে তেল আমদানি করে।

তেল রপ্তানি বাদ দিলে ভারতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যর বাণিজ্যিক সমীকরণ ঠিক কেমন?
২০১৭ থেকে ২০২১- শেষ পাঁচ বছরে ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমশ বেড়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শেষ পাঁচ বছরে ভারতের সঙ্গে এই দেশগুলির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের আর্থিক পরিমাণ ৩.৯৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গেই ভারতের বাণিজ্যিক অঙ্কের পরিমাণ ২৭৭.৪ বিলিয়ন ডলার। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আরব আমিরশাহি ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের সাত শতাংশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে।
এর ঠিক পরেই আছে সৌদি আরব। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি ভারতে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যর সবচেয়ে বড় বাজার। চা, বাসমতি চাল থেকে বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি- সবকিছুরই চাহিদা বেশি মধ্যপ্রাচ্যর বাজারে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশের মধ্যেকার বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেবার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে দুই দেশ। এই চুক্তির ফলে ভারতের ব্যবসায়ীরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রায় ৯৯ শতাংশ বাজারেই নিজেদের জিনিস বিক্রি করার সুযোগ পাবে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে চুক্তির কথা মাথায় রেখেই ভারত আগামী দিনে বিনা শুল্কে বাণিজ্যের দিকে জোর দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি আফ্রিকার ক্ষেত্রেও বড় বাজার হিসেবে কাজ করে। সেই কথা মাথায় রেখেই ভারত মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিতে জোর দিয়েছে।

কর্মসংস্থান ও পশ্চিম এশিয়া
পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে প্রায় ৮৯ লক্ষ ভারতীয় বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। দুবাই, আবু ধাবি, শারজা, উমম-আল-কোয়াইন, ফুজাইরা এবং রাস- আল-খাইমা নিয়ে গঠিত সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩৪ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয় কর্মরত। সৌদি আরবে প্রায় ২৬ লক্ষ এবং কুয়েতে প্রায় ১০ লক্ষ ভারতীয় কাজ করে। তেল কারখানা থেকে শুরু করে কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, নার্স, ডাক্তার সবরকম পেশারই লোক প্রত্যেক বছর কাজের সুযোগের আশায় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে আসে। এই বৈদেশিক অর্থ ভারতীয় অর্থনীতিকেও বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২১ আর্থিক বর্ষে ভারতের বৈদেশিক অর্থের প্রায় ৫৫ শতাংশ অর্থের বিচারে প্রায় ৬৮.৯৭ বিলিয়ন এসেছে পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত ভারতীদের থেকেই।

পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি মানেই বাণিজ্যে বিপুল ধাক্কা। জেনেশুনে সেই ভুল করতে চায় না ভারত সরকার।

More Articles

;