ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্ম তাঁর হাত ধরেই, জাম্বো মজুমদারকে ভুলে গেল দেশ

উইং কমান্ডার জাম্বো মজুমদারকে ভারতের জাতীয় নায়কদের অন্যতম বলা হয়।

tiasa gupta
৪ মিনিট
ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্ম তাঁর হাত ধরেই, জাম্বো মজুমদারকে ভুলে গেল দেশ

ফিরে যেতে হবে ৯০ বছর আগের সেই দিন। ১৯৩২ সালের ৮ অক্টোবর। ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্ম। কোনও ধুমধাম হয়নি। পরাধীন ভারতের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় বিমানবাহিনী।

১৯৩০ সালে, ছয় যুবককে (হরিশচন্দ্র সরকার, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, অমরজিৎ সিং, ভূপেন্দ্র সিং, আইজাদ বক্স আওয়ান এবং টিএন ট্যান্ডন) আরএএফ ক্রানওয়েল-এ পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে ২৯ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের রেলওয়ে ওয়ার্কশপ থেকে নিয়োগ করা হয়েছিল। এঁরা ভারতে সামরিক বিমান চালনার প্রথমদিকের পথিকৃৎ ছিলেন। সামরিক বিমান চালানোয় যাঁর নাম আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে, তিনি কৃষ্ণকুমার 'জাম্বো’ মজুমদার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল, আইএএফ-এর সম্প্রসারণ। এর জন্য তিনি ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে বাহিনীর ভেতরেও সওয়াল করেন। এর পুরস্কার হিসেবে তিনি আদায় করে নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের দেওয়া বিশেষ সাম্মানিক মেডেল। একবার নয়, দু'-দু’বার। ভারতীয় বিমানবাহিনীর গৌরবের ধারক যাঁরা, তাঁদের মধ্যে নেপথ্যের কারিগর হিসেবে জাম্বোর নাম উল্লেখ করতে হয়।

কে এই করুণকৃষ্ণ 'জাম্বো' মজুমদার?

উইং কমান্ডার জাম্বো মজুমদারকে ভারতের জাতীয় নায়কদের অন্যতম বলা হয়। স্বাধীনতার আগে যাঁরা প্রথম বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান আকাশে উড়িয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম জাম্বো মজুমদার। তিনিই প্রথম, যিনি ভারতীয় হিসেবে পান 'ইংল্যান্ড ডিসটিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’ (ডিএফসি) মেডেল। একবার নয়। তিনি এই সম্মান পান দু'-দু’বার। ৭০ বছর ব্রিটিশরা সেটা আগলে রেখেছিল। পরে তা খোলাবাজারে নিলাম হয়। কিন্তু কেউ সেটা শেষ পর্যন্ত কিনতে এগিয়ে আসে না। ভারতের স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণে দেশ কি ফিরে দেখবে না এই মহান কিংবদন্তিকে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় তিনি ইউরোপ উড়ে যান। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর ট্র্যাজিক মৃত্যু হয়। আজ ভারতের বিমানবাহিনীর গায়ে লেগে আছে গৌরবের তকমা, প্রশ্ন হলো, এই আইএফ সম্প্রসারণে যিনি পথিকৃৎ, তাঁকে দেওয়া সম্মান কেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়নি এতকাল? এর কোনও উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত নেই।

উইং কমান্ডার করুণকৃষ্ণ মজুমদারের জন্ম ১৯১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যিনি উইং কমান্ডার পদে পৌঁছেছিলেন।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। যেহেতু তিনি ছয় ফুটের বেশি লম্বা ছিলেন এবং তাঁর চেহারা ছিল সুগঠিত, তাই তাঁর ডাকনাম ছিল জাম্বো। তিনি দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩২ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং রয়্যাল এয়ারফোর্স কলেজ ক্র্যানওয়েলে ভর্তি হন । ১৯৩৩ সালে তিনি প্রশিক্ষিত পাইলট হিসেবে ভারতে ফিরে আসেন। তিনি ও তাঁর বড় ভাই জয়কৃষ্ণ মজুমদার একসঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিলেন। দু’জনেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রিটিশদের ভারতছাড়া করতে বাধ্য করেছিল সেই বিদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতকতার বিষ পালটে দিল ইতিহাস

১৭৫৭ সালে পলাশির আমবাগানে বাংলার স্বাধীনতা হরণের পর ভারতে ব্রিটিশরাজ মূলত দু'টি সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। প্রথমটি ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালের সেনা বিদ্রোহ এবং দ্বিতীয়টি তার ঠিক ৮৯ বছর পর নৌ বিদ্রোহ।

জাম্বো মজুমদার তিনের দশকে ফ্লাইং অফিসার হিসেবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ১ নম্বর স্কোয়াড্রনে যোগ দেন। তিনি প্রথমে ওয়েস্টল্যান্ড ওয়াপিটি এবং তারপর হকার হার্ট উড়ে গিয়েছিলেন। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্রুত তিনি ১ নং স্কোয়াড্রনের 'সি' ফ্লাইটের ফ্লাইট কমান্ডার পদে উন্নীত হন। ১৯৪১ সালের জুন মাসে, মজুমদারকে স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে উন্নীত করা হয় এবং তিনি মিরামশাহতে ১ নং স্কোয়াড্রনের দায়িত্ব পান। ১৯৪১ সালের অগাস্ট মাসে, ১ নং স্কোয়াড্রনকে ওয়েস্টল্যান্ড লাইসান্ডার বিমানের সঙ্গে আপগ্রেড করা হয় এবং ড্রিগ রোডে প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

কেন ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ? বিমানবাহিনীর স্বার্থে এই যুদ্ধ যে প্রয়োজন, তা সহকর্মীদের বুঝিয়েছিলেন জাম্বো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হরজিন্দর ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার। তিনি ছিলেন ঘোর জাতীয়তাবাদী। তিনি ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ চাননি। একবার তিনি ছিলেন জাম্বোর সঙ্গে একসঙ্গে। জাম্বো তাঁর সহকর্মীকে কী যুক্তি দিয়েছিলেন?

হরজিন্দর, যদি আমরা এই যুদ্ধে অভিশপ্ত ব্রিটিশদের পক্ষে না লড়ি, যুদ্ধ শেষ হলে আমরা ফ্লাইং ক্লাবের চেয়ে ভালো কিছু হতে পারব না। আমাদের ভাগ্য এতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমাদের অবশ্যই লড়াই করতে হবে, এবং আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, আইএএফ সম্প্রসারণ করতে হবে। যুদ্ধ জয়ের পর, ভারত অধিপতি হবে এবং আমাদের নিজস্ব বিমানবাহিনী হবে। এই লক্ষ্যেই আমাদের এগোতে হবে।

অর্থাৎ ভারতীয় বিমানবাহিনীর ইতিহাসকে যাঁরা এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অবশ্যই পথিকৃৎ জাম্বো। এর পরের গল্প অনেকটাই জানা।

১৯৪২ সালে, ইম্পেরিয়াল জাপানি বাহিনী বার্মা দখল করে। রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের নং ১ স্কোয়াড্রনকে বার্মায় পোস্ট করা হয়েছিল এবং জাম্বো তাঁর স্কোয়াড্রন নিয়ে ৩১ জানুয়ারি, ১৯৪২-এ টাংগুতে পৌঁছেছিলেন। পরের দিনই থাইল্যান্ডের মে হং সন-এ অবস্থিত ইম্পেরিয়াল জাপানিজ আর্মি এয়ারফোর্স টাংগু-তে বোমাবর্ষণ করে। উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়।

জাম্বো অবিলম্বে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেছিলেন, যদিও ওয়েস্টল্যান্ড লাইসান্ডার একটি সেনা সহযোগিতা বিমান ছিল, যা যোদ্ধা বা বোমারু বিমান হিসেবে কাজ করার জন্য নয়। লাইসান্ডারের স্টাব উইংসে দু’টি ২৫০ পাউন্ড বোমা ঝুলিয়ে, তিনি ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২-এ মায়ে হং সনের জাপানি বিমানঘাঁটির দিকে একা যাত্রা করেন। জাম্বো নিচুতে উড়তে এবং লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে বোমা ফেলে শত্রুর হ্যাঙার, বিমান এবং বিমানঘাঁটি ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়েছিলেন। পরের দিন তিনি পুরো স্কোয়াড্রনকে বোমা হামলার মিশনে নেতৃত্ব দেন এবং বিমান, বেতারস্থাপনা এবং ভবনগুলি ধ্বংস করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'মোস্ট ডেকরেটেড’ ভারতীয় পাইলট হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর চমৎকার পাইলটিং দক্ষতা এবং অদম্য চেতনার কারণে, লাইফ ম্যাগাজিন তাঁকে ১৫ মে, ১৯৪৪-এর সংখ্যায় বিশ্বের সবচেয়ে অসামান্য বারো জন এয়ারম্যানের মধ্যে স্থান দেয়। তাঁর প্রতিকৃতি-শিল্পী ছিলেন উইলিয়াম ড্রিং। রয়্যাল একাডেমি-তে আঁকা হয়েছিল সেই ছবি।

১৯৪৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে, জাম্বো একটি হকার হারিকেনে লাহোরের কাছে ওয়ালটনে একটি উড়ন্ত প্রদর্শনীতে অংশ নেন। তিনি উড়োজাহাজটি বেছে নেন, তাতে ত্রুটি ছিল। ফ্লাইং অফিসার হরজিন্দর তাঁকে এ-ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। তিনি সেই নিষেধ মানেননি। আর সেটাই কাল হয়েছিল তাঁর জীবনে।

এ্যারোবেটিক রুটিনে ডুব দেওয়ার সময় বিমানটি মাটিতে পড়ে যায়। জাম্বো ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর বয়স ছিল ৩১।

লাহোরে তাঁর কবরের মার্বেলফলকে এই এপিটাফটি দেখা যায়:

যাও পথচারীরা এবং যদি পারো সেটাই করো, যা একজন মানুষ তাঁর দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় করে।

রোজ কত কিছুই না ঘটে। তাই কি স্মৃতির অতলে ডুবে যান জাম্বোরা? তাঁর জন্মদিনের মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁকে স্মরণের দায় থেকে যায় না দেশের?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।