কয়লা থেকে যুদ্ধবিমান, কেন বেসরকারি হাত শক্ত করতেই মরিয়া মোদি সরকার?
পবনহংস বিক্রির প্রক্রিয়া টেনে এনেছে রাফালে চুক্তির তুলনা। মোদি সরকার রাফালে-র নতুন চুক্তিতে পরীক্ষিত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্থান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডকে ছেঁটে ফেলেছিল। তার বদলে বিদেশি সংস্থার ভারতীয় সহযোগী করা হয়েছিল অনিল আম্বানির নতুন সংস্থাকে।

রাফালে অনিল আম্বানি, পবনহংসে স্টার লাইন, কয়লা আমদানিতে আদানি। একের পর এক বেসরকারি সংস্থাকে সুবিধে পাইয়ে দেওয়া, কিংবা সরকারি সংস্থা বেচে লাট- সরকারের এই প্রবণতা নিয়ে বিরোধীরা বারবার গলা ছেড়েছে। কখনও সংসদে, কখনও সংসদের বাইরে। কিন্তু অবস্থা একই রয়ে গেছে!
কিছুদিন আগের খবর ছিল, এই প্রথম কোল ইন্ডিয়া বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে চলেছে। গত বছরের খবর, সরকার কোল ইন্ডিয়াকে ১২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে তৈরি থাকার জন্য নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ, কোল ইন্ডিয়াকে চাপে রাখার প্রক্রিয়াটা তখনই শুরু হয়ে যায়। 'ন্যাশনাল হেরাল্ড'-এর মতো পুরনো মামলায় রাহুল গান্ধীকে ইডি-র তাড়া করার নমুনা দেখেছে দেশ। ফলে সুযোগ বুঝে কংগ্রেস যে বদলা নেবে, তা বলাই বাহুল্য। কয়লা আমদানিতে আদানি গোষ্ঠীকে সুবিধে পাইয়ে দেওয়া নিয়ে তারা সরকারকে চেপে ধরেছে। এই নিয়ে সরব কংগ্রেস। আদানি গোষ্ঠীকে ফায়দা পাইয়ে দিতে মোদি সরকার কোল ইন্ডিয়াকে কয়লা আমদানির নির্দেশ দিয়েছে কি না, তা নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অভিযোগ, গত বছর থেকে একের পর এক সিদ্ধান্ত, সবশেষে কোল ইন্ডিয়াকে কয়লা আমদানির নির্দেশ ও তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা এনটিপিসি-র আদানি গোষ্ঠীকে কয়লা আমদানির বরাত দেওয়ার পিছনে মূল কারণ হলো আদানি গোষ্ঠীকে ফায়দা পাইয়ে দেওয়া। কংগ্রেস নেতারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এর আগে রাফালের বরাত অনিল আম্বানির সংস্থাকে পাইয়ে দেওয়ার পেছনে মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
কংগ্রেস নেতারা বলছেন, মাটির নিচে কয়লা মজুতের পরিমাণের হিসেবে ভারত গোটা বিশ্বে পঞ্চম স্থানে। তাহলে ভারত কেন অস্ত্রেলিয়ার কাছ থেকে কয়লা কিনবে? কংগ্রেস ন্যাশনাল হেরাল্ড-এর কথা টেনে এনেছে, তাদের বক্তব্য, সেই মামলায় ইডি যখন দফায় দফায় রাহুলকে জেরা করেছে, তখন কয়লা আমদানি নিয়ে কেন তারা তদন্ত করবে না? এটাও তো দুর্নীতি!
এখানেই শেষ নয়। পুরনো তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, সরকার-নিয়ন্ত্রিত এনটিপিসি-র বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কয়লা সরবরাহ করার বরাত পায় আদানি গোষ্ঠী। গত বছরের শেষে এই কাজের বরাত পায় তারা। চুক্তি অনুযায়ী, এনটিপিটিসি-কে ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা সরবরাহ করবে গৌতম আদানির অস্ট্রেলীয় সংস্থা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এদিকে রাফালে দুর্নীতির সহজ পাঠ এবং তারপর অনিল আম্বানির সংস্থাকে সুবিধে করে দেওয়া নিয়ে মোদিকে বারবার কাঠগড়ায় তুলেছে বিরোধীরা। তাতে অবশ্য সরকারের কিছু আসে-যায়নি। বলে দিচ্ছে ঘটনাপ্রবাহই।
২০১৫ সালের ২৮ মার্চ রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড গঠিত হয়। ১৩ দিন পর নরেন্দ্র মোদি প্যারিসে ঘোষণা করেন, ৩৬টি রাফাল বিমান কিনবে ভারত। ২ সপ্তাহ পরে ডিফেন্স লিমিটেডের অধীনস্থ রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচার গঠিত হয়। ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরনো চুক্তি বাতিল হয়। ২৪ অগাস্ট, ২০১৬, প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটি ৩৬টি রাফাল বিমান কেনার সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেয়।
হ্যালে-র প্রস্থান ও আম্বানির আগমন- নেহাত কাকতালীয় নয়। বিভিন্ন সময়ে চর্চায় উঠে এসেছে, ১. দাসাউ-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচারের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছিল ২০১৫ সালে। ২. ডিআইপিপি (Deperartment of Industrial Policy and Promotion) কর্তৃক রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচারকে লাইসেন্স প্রদান করতে বলা হয়েছে সংস্থাকে। গুজরাতের মেহসানে সামরিক বিমান ও যন্ত্রাংশ তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে কারখানা হয় মহারাষ্ট্রের নাগপুরে। সেখানে অনুমতি ছিল জেটবিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির। সেখানেও সঠিক সময়ে দাম মেটাতে না পারার জন্য অনিল আম্বানিদের জরিমানা করা হয়। ভারতীয় অর্থনীতিতে আম্বানিদের আটের দশক থেকে উল্কাসদৃশ উত্থান ও ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁদের নিরবচ্ছিন্ন প্রভাব বহু আলোচিত বিষয়। সেই আলোচনায় প্রবেশ না করেও বলা যায়, যে গোষ্ঠী কস্মিনকালেও প্রতিরক্ষা তো দূর, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিল না, সেই রকম একটা আনকোরা কোম্পানিকে কেন প্রতিরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভারতের বাজি হিসেবে গণ্য করা হল, বারবার তার জবাব চাইবে দেশ। আর মোদি সরকার বারবার এর উত্তর দিতে বাধ্য থাকবে। যে প্রশ্নটা উঠেছে, তা হলো অনিল আম্বানির গ্রুপ, যাদের বাজারে দেনার পরিমাণ ছিল ১,২০,০০০ কোটি টাকা, তাদের দাসাউ-এর মতো একটা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থা অফসেট সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা হলো কীভাবে? এর পিছনে কার হাত ছিল, তা বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না। একটা প্রায় দেউলিয়া হতে চলা কোম্পানিকে এভাবেই কি লাইফলাইন দিল মোদি সরকার?
পবনহংস নিয়েও কম তোলপাড় হয়নি। এই সরকার আগেই বেচারাম তকমা পেয়েছে। সরকারি সংস্থাকে বেচে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বারবার। এবার আর এক বেসরকারি সংস্থাকে সুবিধে করে দেওয়ার অভিযোগ। যাদের পবনহংস বিক্রি করা হলো, তাদের হাতে হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৪১। কেন্দ্র পবনহংস বিক্রি করল মাত্র ২১১ কোটি টাকায়। নীতিগত বেসরকারিকরণে নামমাত্র দামে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রির আর এক উদাহরণ হয়ে রইল পবনহংস। বেসরকারি সংস্থা স্টারলাইন মোবিলিটি প্রাইভেট লিমিটেডকে বিক্রি করা হয়েছে পবনহংস। নতুন এই সংস্থা তৈরি করা হয়েছে মাত্র ৬মাস আগে।
পবনহংস বিক্রির প্রক্রিয়া টেনে এনেছে রাফালে চুক্তির তুলনা। মোদি সরকার রাফালে-র নতুন চুক্তিতে পরীক্ষিত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্থান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডকে ছেঁটে ফেলেছিল। তার বদলে বিদেশি সংস্থার ভারতীয় সহযোগী করা হয়েছিল অনিল আম্বানির নতুন সংস্থাকে। সেই সংস্থাও তখন বয়সে ছিল নবীন। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক জানিয়ে দেয়, ২১১.১৪ কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে পবনহংস লিমিটেড।
আবারও এক নবীন বেসরকরি সংস্থার হাতে পবনহংস চলে গিয়ে তৈরি হলো সুবিধাবাদের বাণিজ্যিক হস্তান্তরের ইতিহাস। যে ইতিহাস নতুন নয়।
















