এখনও পরিস্থিতির শিকার হাজার হাজার নির্ভয়া! যেভাবে ‘ধর্ষণ রাজধানী’র তকমা জুটল দিল্লির
Dellhi Crime: নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রাজধানী দিল্লি গায়ে সেঁটে বসেছে ‘ধর্ষণ রাজধানী’র তকমা

বারবার শিরোনামে দিল্লি। কখনও হত্যা, কখনও ধর্ষণ, কখনও স্রেফ ডাকাতি; যেন অপরাধ জগতের ঠেকা নিয়ে রেখেছে খোদ রাজধানী। ঝকঝকে রাস্তাঘাট, আলোর রোশনাই, উৎসব, হুল্লোড়, এই সবের মধ্যেই একের পর এক মৃত্যু। প্রথম অপরাধকে টেক্কা দিচ্ছে পরের নৃশংসতা। ধৃতরা ধরা পড়ছে আইনের হাতে। শাস্তিও হচ্ছে। এমনকী সেই নৃশংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে হচ্ছে সিনেমা, সিরিজ, সিরিয়ালও। কিন্তু বদল হচ্ছে না পরিস্থিতির। রাজধানী শহরের আইন ব্যবস্থা কী তবে এতটাই শিথিল যা ভয় দেখাতে পারছে না অপরাধীদের!
গত বছর দিল্লি ছিল শিরোনামে। মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের জেরে এখনও শিউরে ওঠে গোটা দেশ। নিজের প্রেমিকাকে খুন করে, তার দেহ ৩৫ টুকরো করেছিল আফতাব। তারপর ফ্রিজের মধ্যে জমিয়ে রেখেছিল দিনের পর দিন। সেই রহস্যের জট এখনও ছাড়াতে পারেনি পুলিশ, এরই মধ্যে নতুন বছরের শুরুতে আবারও ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী থেকে দিল্লির রাজপথ। দিল্লির কাঞ্ঝাওয়ালা রোডের লাডপুর গ্রামের কাছে মাঝরাস্তায় একটি স্কুটিতে করে যাচ্ছিলেন বছর কুড়ির এক তরুণী। হঠাৎই একটি চার চাকা এসে ধাক্কা মারে সেই স্কুটিতে। ছিটকে পড়ে যান তরুণী। তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়, বরং বলা ভালো, সবে শুরু। এরপরই সেই ভয়াবহ দৃশ্য। যে গাড়িটির ধাক্কায় মেয়েটি পড়ে যায় সেই গাড়িটি চোখের নিমেষে ইউ টার্ন নিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকেন তরুণীকে। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ ওভাবেই ঘষটাতে ঘষটাতে মেয়েটিকে নিয়ে যায় ঘাতক গাড়ি।
খবরের চ্যানেল খুললেই ‘দিল্লি’! কখনও প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে তরুণী, কখনও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জেরে থমকে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, কখনও আবার চুরি, ডাকাতি, রাহাজানির দামামায় উদ্ভ্রান্ত শহরের অলিগলি। যেন অপরাধীদের পুষছে গোটা রাজ্য! আর অকাতরে ঘুম দিচ্ছে প্রশাসন! অন্যদিকে, দশ বছর আগে নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রাজধানী দিল্লি গায়ে সেঁটে বসেছে ‘ধর্ষণ রাজধানী’র তকমা। আর এই দাবির পাশাপাশি এসে যোগ হয়েছে আরও আরও অপরাধের নজির।দিল্লি এখন এ নামেই কুখ্যাত। সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দুপুর কোনো সময়ই নিরাপদ নয় সেখানকার নারীরা। ধর্ষণ যেন মামুলি বিষয় সেখানে। প্রতিদিনই নারীরা শিকার হচ্ছে ধর্ষণের। ফলে নারীদের জন্য দেশের সবচেয়ে অনিরাপদ ও অসুরক্ষিত শহর হয়ে উঠেছে দিল্লি। ভারতের সরকারি এক রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delhi Woman Car Accident : কিন্তু ২০২৩-এর প্রথম দিনেই এমন ঘটনা বুঝিয়ে দিল, এখনও অবস্থা ফেরেনি। নারী সুরক্ষা এখনও বিশ বাঁও জলে।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে দিল্লিতে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় ১৩ হাজার ৮৯২টি মামলা দায়ের হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালে দিল্লিতে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যাটা ছিল ৯ হাজার ৭৮২। এই রিপোর্ট স্পষ্ট করে দেয় অপরাধ বৃদ্ধির ছবিটা। যে হারে লাগিয়ে বাড়ছে এই প্রবণতা তাতে রীতিমত চোখ কপালে বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ সকলেরই। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য থেকে আরও জানা গিয়েছে, দেশটির ১৯টি মেট্রোপলিটন শহরে নারীদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের মোট মামলার প্রায় ৩২ শতাংশই নথিভূক্ত হয়েছে দিল্লিতে। দিল্লির পরেই স্থান মুম্বাইয়ের।
অপরাধের সব শাখাতেই বিচরণ দিল্লির। যার সিংহভাগই অবশ্য নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। ছবিটা এতটাই ভয়ংকর যে সেখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুজন করে নাবালিকাকে ধর্ষণের মুখোমুখি হতে হয়। এছাড়াও যৌতুক সংক্রান্ত কারণে খুন এবং অন্যান্য প্রাণহানির ঘটনাও রয়েছে তালিকায়।
মনে পড়ে দশ বছর আগের সেই রাতের ঘটনা। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। রাতের শোয়ে সিনেমা দেখে ফিরছিলেন এক যুবতী। সঙ্গে এক বন্ধু। নেমে এসেছিল কালো ছায়া। রাজধানীর বুকে সেদিন নৃশংসভাবে গণধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল তাঁকে। নির্ভয়াও ভয় পেয়েছিল সেদিন। এখনও সেই ঘটনা দগদগে ঘায়ের মতো লেগে আছে। মাঝে কেটে গিয়েছে ১০টি বছর। বদলেছে সময়। পরিবর্তন হয়েছে আইন। কিন্তু, কমেছে কি মেয়েদের উপর নির্যাতন? শোষণ-বঞ্চনার দিনযাপন! নির্ভয়াকাণ্ডের এক দশক পর এখনও তো মার খাচ্ছে শ্রদ্ধা অথবা অঞ্জলীরা। তাহলে কোথায় আইন? কীসের পুলিশি তৎপরতা? কেন এত এত আধুনিকতার মধ্যেও অন্ধকারেই পর্যবসিত হয় শহরের নারীরা। পাথর চাপা প্রশ্নের ভিড়ে প্রজন্ম।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Women Safety : দিল্লি, মুম্বাই,চেন্নাই, কলকাতা, ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরে যে ছবি ধরা পড়ল সমীক্ষায়
সাম্প্রতিক অঞ্জলীর মৃত্যুর ঘটনার দিকে তাকানো যাক। নতুন বছরের শুরুতে রাজপথে অমন দৃশ্য। সিসিটিভি ফুটেজে তার সবটাই ধরা পড়ল। প্রত্যক্ষদর্শী দীপক ঘটনার বর্ণনা জানিয়ে ফোনও করলেন সঠিক সময়ে, অথচ ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে উপস্থিত হল প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর। ততক্ষণে অবশ্য পলাতক ঘাতক গাড়ি। এখানেই শেষ নয়, এই বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ হতে পেতেও সময় লেগে গেল গোটা দুটো দিন! রাজধানী শহরে প্রশাসন কি তবে এতটাই নিস্পৃহ? নাকি অপরাধ তাঁদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে? অপরাধ যতোই কথিক হোক,শাস্তি অথবা আইনের হাতে যখন ক্ষমতা রয়েছে কেন তার প্রয়োগ করতে প্রতিবারই দেরি করছে প্রশাসন, তার উত্তর শুধুই ধোঁয়াশা। তবে দিল্লির অপরাধের এহেন ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না আইন ব্যবস্থা।
রাত বারকেই মেয়েরা ঘরবন্দি, আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও কেন এমন চিত্রের সম্মুখীন হতে হবে নারী সমাজকে? কেন একটা নির্ভয়ার ঘটনা থেকে ঘুরে দাঁড়ায় না সমাজ? কেন আরও আরও নির্ভয়ারা ধর্ষিতা হয় রোজ? তাছাড়া শুধু ধর্ষণ নয়, অপরাধের প্রতিটি শাখাতেই পুলিশের নিস্পৃহতার ছবিটা স্পষ্ট। এই বিষয়ে একটি সাক্ষাতকারে দিল্লি পুলিশেরই প্রাক্তন কমিশনার নীরজ কুমার প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, দিল্লি পুলিশে সব পর্যায়ই এখন নেতৃত্বহীনতায় ভুগছে। এই কারণেই দিল্লিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ।
তার ওপর আবার আধুনিকতায় পাল্লা দিয়ে এসেছে সাইবার ক্রাইয়েমের উৎপাত। নিত্যদিন হাজার হাজার অপরাধীর জন্ম দিচ্ছে নেট মাধ্যম। যদিও ভারতীয় দণ্ডবিধির কিছু ধারা, যেমন প্রতারণা, জালিয়াতির সঙ্গে সাইবার অপরাধকে যুক্ত করা হয়েছে, তবুও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি এখনও। এরই মধ্যে ক্রাইমকে হাতিয়ার করে সিনেমাও বানিয়েছেন পরিচালক। একেবারে সত্যঘটনা তুলে এনেছেন দৃশ্যে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির এহেন প্রয়াসও মাঠে মারা যাচ্ছে তবে? নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘দিল্লি ক্রাইম’- এর দুটি সিজনই যথেষ্ট জনপ্রিয়। অথচ অপরাধীদের ঠেকানো গেল না এখনও। এখনও রোজ দিন করতে হয় নির্ভয়া অথবা শ্রদ্ধাদের।
নির্ভয়া কাণ্ডের পর থেকেই জোয়াল কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁর বাবা মা, সমাজের ঘটে চলা একটার পর একটা নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। প্রশাসন এবং সিস্টেমের চোখে আঙুল দিয়ে প্রশ্ন করেছেন। গলা তুলে স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কাটেনি ভয়! নির্ভয়া গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছিল দিল্লি ক্রাইম প্রথম সিজন। সিরিজটি পেয়েছিল অ্যামি অ্যাওয়ার্ড। তারপর কুখ্যাত কাচ্চা বানিয়া গ্যাং-এর অপরাধ নিয়ে নির্মিত হয় দ্বিতীয় সিজন। দুটিরই উদ্দেশ্য ছিল সমাজের অন্ধকার জগৎকে কাঠগড়ায় তোলা। অথচ কোথায় বদলালো চিত্র! উপরন্তু সাম্প্রতিক শ্রদ্ধা হত্যা রহস্যে উঠে এল খুনিও নাকি অনুপ্রাণিত হয় ডেকস্টার নামে একটা সিরিজ দেখেই। অর্থাৎ সিনেমা সিরিজ বানিয়ে পরিচালক যখন ভাবছেন এবার হয়তো শুধরে দেবেন সমাজের একটা শ্রেণীকে,ঠিক তখনই ওই সিরিজ সিনেমা দেখে নতুন করে অপরাধের ছক সাজাচ্ছে অন্য একটা শ্রেণী! তাই সমাজের মানসিক চিকিৎসার বিষয়টির দিকে জোর দেওয়াও বাধ্যতামূলক। তবে এই ছবিটার সার্বিক বদলে শুধু প্রশ্ন তুললেই হবে না, উত্তর খোঁজাও আবশ্যক। আর অন্ধকারে উৎস থেকেই প্রয়োজন এক ছটাক উৎসারিত আলো। প্রয়োজন একজন কাণ্ডারির। আলোর মশাল হাতে নিয়ে যে পারবে নির্ভয়াদের ভয় কাটাতে।
















