দিল্লির ঘটনায় আরও একবার চোখে আঙুল, কতটা নিরাপদ কলকাতা-সহ অন্য শহরের মেয়েরা?
Women Safety : দিল্লি, মুম্বাই,চেন্নাই, কলকাতা, ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরে যে ছবি ধরা পড়ল সমীক্ষায়

একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে দেশ। একটা বিভৎস অভিজ্ঞতার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন একটা ভয়াবহতার দৃশ্য। যেন কোনও এক হলিউড হরর ফিল্ম। অথচ এসবই ঘোর বাস্তব। দিনে দিনে অপরাধ জগৎ এমন একটা অন্ধকার দিকে চালনা করছে গীতা দুনিয়াকে যে দেখলেই শিউরে উঠতে হয়। বছর শেষের কিছু আগে পর্যন্তই দিল্লির শ্রদ্ধা ওয়ালকার হত্যা রহস্যের জট পরতে পরতে ঘনিয়েছে। নিত্যদিন নিয়া মোড় নিয়েছে তদন্ত। সেই জের সামাল দিতে না দিতেই নতুন বছরের একেবারে শুরুর দিন মধ্যরাতে আবারও নৃশংস এক ঘটনার সাক্ষী থাকল দিল্লির রাজপথ।
শনিবার মধ্যরাতের ঘটনা। অর্থাৎ সবেমাত্র নতুন বছরের দামামা বেজেছে দেশে। দিল্লির কাঞ্ঝাওয়ালা রোডের লাডপুর গ্রামের কাছে মাঝরাস্তায় একটি স্কুটিতে করে যাচ্ছিলেন বছর কুড়ির এক তরুণী। হঠাৎই একটি চার চাকা এসে ধাক্কা মারে সেই স্কুটিতে। ছিটকে পড়ে যান তরুণী। তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়, বরং বলা ভালো, সবে শুরু। এরপরই সেই ভয়াবহ দৃশ্য। যে গাড়িটির ধাক্কায় মেয়েটি পড়ে যায় সেই গাড়িটি চোখের নিমেষে ইউ টার্ন নিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকেন তরুণীকে। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ ওভাবেই ঘষটাতে ঘষটাতে মেয়েটিকে নিয়ে যায় ঘাতক গাড়ি। এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। জোরকদমে চলছে তদন্ত প্রক্রিয়া তাতেই উঠে এসেছে সিসিটিভি ফুটেজের প্রসঙ্গ। আর তার থেকেও দেখা গিয়েছে নিয়া চমক। বান্ধবীর রহস্যময় পালানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কিন্তু দিল্লির এই সাম্প্রতিক ঘটনা তো কোনও ব্যতিক্রম নয়। অথবা হঠাৎ করে ছিটকে পরে যাওয়া কোনও বিষয়ও নয়। গোটা দেশ জুড়ে যা ঘটছে একের পর এক তাতে তো প্রশ্ন উঠছে দেশের সার্বিক ছবিটা নিয়েই। ভারতের বিভিন্ন শহরে কোথাও রাতের অন্ধকারে কোথাও আবার দিনের আলোয়, প্রকাশ্য রাজপথে কেন এমন চিত্র বারবার? এই প্রশ্নগুলোই আমাদের থেকে দিচ্ছে রহস্য উন্মোচনের দিকে। তাই এখন খুবই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে দিল্লি সহ ভারতের অন্যান্য শহরগুলিকে নিয়ে একটা সমীক্ষা করা। প্রয়োজন জানা, কতটা নিরাপদ মহিলারা? এই যে এত আধুনিকতার মোড়ক, তার পরেও কেন এখনও নারী সুরক্ষা বিশ বাঁও জলে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dellhi Death Case : সিসিটিভিতে ধরা পড়ল দিল্লি দুর্ঘটনার ঠিক আগের রহস্যময় মুহূর্ত
ইন্ডিয়া টুডের তরফে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা সামনে আনা হয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন শহরের তুলে ধরা হয়েছে ছবিটা। এই ধরনের ঘটনা এড়াতে কোথায় কোথায় কী কী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পুলিশি টহল রয়েছে তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে তাতে।
হায়দ্রাবাদ - ঝকঝকে রাস্তা, আলো, অনতি দূরে দূরে একটা করে চেক পোস্ট। শুনে খুবই গোছানো এবং কড়া নিরাপত্তার একটা ছবি সামনে আসবে পাঠকদের। কিন্তু সর্ষের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অজস্র ভূতেরা। মহিলা এক সাংবাদিক রাত তিনটে সময় মেট্রোপলিটন শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ক্যাব ধরার জন্য বারবার হাত দেখাতে থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তা উপেক্ষা করে চলে যায়। হাতে গোনা মাত্র কয়েক জন এসে জিজ্ঞেস করে কোনও সাহায্যের প্রয়োজন কিনা! এমনকী এমন প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয় তাকে যে, ‘তোমার রেট কি?’। অর্থাৎ রাতে রাস্তায় একা মহিলা মানেই সে ‘কল গার্ল’! শুনতে অবাক লাগলেও এই আধুনিকতার মোড়কে এই ছবিটাই ঢুকে রয়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, এই সব কিছুই ঘটছে প্রকাশ্য রাস্তায়, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুলিশের চেক পোস্ট। জানা গিয়েছে এই ঘটনার সময় ওই এলাকা দিয়ে পুলিশের একটি ভ্যানকেও চলে যেতে দেখেন মহিলা। অথচ তারাও নির্বিকার। এক প্রকার ভ্রুক্ষেপ না দিয়েই চলে যায় গাড়ি।
চেন্নাই - আবার চেন্নাই-এর ছবিটা বেশ খানিকটা অন্যরকম। রাতের শহরে যথেষ্ট পুলিশি উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। অনেক আঁধারের মধ্যে হঠাৎ একটা আলোর হদিশ মিলে যেমন হয়, এ যেন ঠিক তাই। জানা গিয়েছে, পুলিশের তরফ বেশ কয়েকবার খোঁজ নেওয়া হয়েছে সাহায্যের বিষয়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rajasthan Tantrik kills Couple : ওই যুগলকে সে-ই খুন করেছে। তারপর যে কাহিনির বিবরণ দিল, তা শুনে পুলিসেরও গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যায়…
কলকাতা - ২০২১ সালের সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ভারতের সবথেকে নিরাপদ শহর হল কলকাতা। অথচ যখন একের পর এক ভয়বহ ঘটনার সাক্ষী থাকছে দেশের বিভিন্ন রাজপথ তখন কেন যথেচ্ছ পুলিশের উপস্থিতি মিলল না তিলোত্তমার পথে? অনেকক্ষণ পর হয়তো একটা পুলিশের ভ্যানের টহল লক্ষ্য করা গেল ঠিকই তবে নিরপত্তার নিরিখে এটা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা বলা দায়। যদিও কলকাতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক হল, এখানে রাস্তায় খারাপ মন্তব্যের শিকার হতে হয়নি মহিলা প্রতিনিধিকে। তবে হয় তো মানসিকতার দিক থেকে উন্নতির পথে আজও কলকাতার স্থানই প্রথম।
বেঙ্গালুরু - ঘড়িতে তখন রাত ১২ টা। বেঙ্গালুরুর রেসিডেন্সি রোডে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিবেদক আনাঘা কেশব। শুনশান পথঘাট। ইতিউতি চলছে গাড়ি। আর এরই মাঝে সমীক্ষারত প্রতিবেদক। ভারতের বিভিন্ন শহরের নারীদের পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক সেই ছবি তখন তাঁর মাথায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের তরফে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল বলেই জানিয়েছেন তিনি। সাহায্যের প্রয়োজন নেই জেনে চলে যায় পুলিশ। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই ঘটে ঘটনাটি। হঠাৎ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় একটি বাইক। গাড়ি থামিয়ে সরাসরি মহিলাকে পরিষেবা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করে বাইক আরোহী। ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে প্রতিবেদক কেশব, কীসের পরিষেবা। উত্তরে আবারও সরাসরি সেই লোকটি তাঁকে বলে, বডি ম্যাসাজ করার কথা। ভাবা যায়! সেই একই ছবি! রাস্তায় রাতে একা মহিলা মানেই সে যৌন কর্মী! হায় রে আধুনিকতা!
মুম্বাই - দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাই। নিরাপদ শহর হিসেবেও মুম্বাইয়ের নাম উপরের দিকেই। কিন্তু এখানে সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ভূত। ইন্ডিয়া টুডে সাংবাদিকরা ওই প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে বিভিন্ন জায়গায় খারাপ হয়ে পড়ে আছে রাস্তার আলো। রাত বাড়লে কার্যত অন্ধকার নামে। যে দেশে দিনের আলোয়, প্রকাশ্য রাস্তাতেই নিরাপদ নয় মহিলারা সেখানে এমন অন্ধকার তো বিপদের মূল নিশানা। যার ফলে মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতার ছবিটা স্পষ্ট। যদিও, জুহু এবং বান্দ্রার মতো ব্যস্ত এলাকার ছবিটা পৃথক। সেখানে যথেষ্ট আলো রাস্তায়। রয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ টহলদারি এবং উপযুক্ত সিসিটিভির নজরদারি।
দিল্লি - অতঃপর দিল্লি। প্রতিবেদনের শেষ থেকেও নতুন করে শুরু করা যায় ভারতের রাজধানীকে নিয়ে। দিল্লি যেন দিনে দিনে অন্ধকারে বাসভূমি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ঘটনার পর ঘটনার ঘনঘটা। অপরাধ জগৎ নিয়ত মাথা চাড়া দিচ্ছে এ শহরের পরতে পরতে। সাম্প্রতিক অঞ্জলী অথবা কিছু দিন আগের শ্রদ্ধা মৃত্যুর ঘটিনাগুলিই তার প্রমাণ। আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না কিছুই। এমনকী নির্ভয়া কাণ্ডের ভয়াবহতা আজও দগদগে ঘা। দিল্লিতে নারী সুরক্ষা যেন এখনও বিশ বাঁও জলে। অথচ এটাই দেশের রাজধানী। দিল্লির ডিফেন্স কলোনীর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ক্যাবের অপেক্ষায় প্রতিবেদক অর্পিতা আর্য। রাত বেশ গভীর। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল তাঁর পাশে, কোথায় নামাতে হবে এই বিষয়ে জানতেও চায়ম কিন্তু সাংবাদিক বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে। ব্যাস তার পরই সে হুবহু এক ছবি। আবারও এক বাইক আরোহী এসে দরদাম জিজ্ঞেস করে মহিলাকে। অথচ এই শহরেই তখন ঘটে গিয়েছে ভয়াবহতার দৃশ্য। সিসিটিভি, পথ বাতি এমনকী পুলিশের ভ্যান সবই রয়েছে। অথচ কিছুতেই যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। এত এত আধুনিকতা, এত এত আভিজাত্যের মোড়কে মার খাচ্ছে নিরাপত্তার ছবিটাই।
তথ্য সূত্র - ইন্ডিয়া টুডে
















