মানুষ নয়, কেন ১৯৭১-এর চিন ভারত যুদ্ধে বীরত্বের পুরস্কার পেয়েছিল এক খচ্চর?
India china war : ৭১-এর যুদ্ধে এক সাহসী সৈনিক ছিল খচ্চর পেডঙ্গি

উঁচু পাহাড়, সর্বত্র ঘন সবুজ জঙ্গল। মাঝে বইছে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী। অরুণাচল প্রদেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ধারে এমনই দুর্গম এলাকায় হামলা করেছে চিনা সেনাবাহিনী। সম্প্রতি শিরোনাম দখল করেছে খবরটি। ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে বিস্তারিত আলোচনা, বৈঠক। দুপক্ষই পিছিয়ে গিয়ে সাময়িকভাবে। কিন্তু ভারত চীনের এই যুদ্ধের ঘটনা তো এই প্রথম নয়। আজ থেকে ষাট বছর আগে অর্থাৎ ১৯৬২ সালের স্মৃতি আজও দগদগে। স্বাভাবিকভাবেই সাম্প্রতিক ঘটনা খুঁচিয়ে তুলেছে সেই ঘা-কে। বারবার উঠে আসছে সৈনিকদের প্রাণপণ লড়াইয়ের গল্প। জেতার গল্প। রক্তক্ষরণের গল্প।
কিন্তু যুগে যুগে সীমান্তে দেশের সেপাই হয়ে লড়াই করেছে যারা তাদের দলেই রয়েছে পেন্ডগি। তফাৎ এই শুধু, মানব জন্ম জোটেনি তার। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি পেন্ডগি মানুষ নয়, একটি খচ্চর। কিন্তু সৈনিক হিসেবে দেশের হয়ে লড়াইয়ে সেও সওদাগর।
গল্পটা সত্যিই খুব অপরিচিত। এই এত এত পর্যালোচনার ভিড়ে পশু তো নিমিত্ত মাত্র। কিন্তু পেন্ডগি মোটেই সাধারণ একটা খচ্চর নয়। আমরা অনেকেই বেড়াল, কুকুর, ঘোড়া, হাতি ইত্যাদি পশুর আনুগত্যের গল্প এবং উপকথা শুনেছি। শুনেছি ক্রাইম বিভাগে কুকুরের ভূমিকার কথাও। কিন্তু এই তালিকাতে কোথায় পেডঙ্গি? পেডঙ্গি একা নয় ভারতীয় সেনাবাহিনীটে সারাজীবন নিরলস সেবা করে চলেছে এমন অনেক খচ্চর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India China conflict : অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিন সংঘর্ষ! জখম দু’পক্ষই
সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের খচ্চর ব্যবহার করা হয়, যেমন ভার বহনকারী খচ্চর, মাউন্টেন আর্টি খচ্চর যা ভারী কামান ও শেল বহন করে এবং তারপরে রাইডিং খচ্চর, যাদের পিঠে চেপে সংকীর্ণ জায়গায় পৌঁছতে পারে সেনারা। এটা প্রত্যেকেই এক একজন পরিনত সৈনিকের মতোই থাকে টিমে। আহত সৈনিকদের দুর্গম এলাকা থেকে কাঁধে চাপিয়ে ফিরিয়ে আনে শিবিরে। যেন প্রকৃত বন্ধু এরাই।খচ্চররা সাধারণত ১৮ বছর ধরে সেনাবাহিনীর সেবা করে।
খচ্চর বোবা, নম্র এবং অনুগত প্রাণী। খ্রিস্টান পৌরাণিক কাহিনীতেও খচ্চরের মানুষের প্রতি আনুগত্য এবং নিঃস্বার্থ সেবার কথা রয়েছে। শোনা যায়, যীশু খ্রীষ্টের জন্মের সময় যীশুর মা একটি খচ্চরে চড়েই ভ্রমণ করেছিলেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতেও রয়েছে এমন নজির। ১৯৭১ সাল। ভারত চীনের যুদ্ধ। ভারতের খচ্চর বাহিনীর ওপর আক্রমণ হানে চিন। সেই দলেই ছিল ‘পেডঙ্গি’। সেই আক্রমণে কিছু খচ্চর ও খচ্চর চালক নিহত এবং অনেকেই আহত হয়। পেডঙ্গিসহ কিছু খচ্চর পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ে। তারপর শুরু হয় মুখোমুখি সংঘাত। অবশেষে আক্রমণ প্রতিহত করা গেলেও পলাতক পাকিস্তানিরা পেডঙ্গি এবং আরও কয়েকটি খচ্চরকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু শত্রুর হাতে এমন ধরা পড়াকে বোধ করি মেনে নাইট পারেনি পেডঙ্গি। ভিতরে ভিতরে পুষে রেখেছিল জেদ। জিইয়ে রেখেছিল প্রতিশোধ স্পৃহা এবং নিজের দেশের প্রতি আনুগত্যকে।
তাই প্রায় সপ্তাহ দুয়েক কেটে যাওয়ার পর যখন সবাই ধরে নিয়েছিল আর ফিরবে না তারা তখন সবাইকে চমকে দিয়ে বীর যোদ্ধার মতো ফিরেছিল পেডঙ্গি। পিঠে লোড করা প্রতিপক্ষের দুটি বাক্স গোলাবারুদ এবং একটি মাঝারি মেশিনগান। প্রায় ২৫ কিলোমিটারের পাক দন্ডি পথ পার সে ততক্ষণে ক্লান্ত। অথচ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতায় কোনও ঘাটতি নেই। একজন সাহসী সৈনিকের মতো এসে রিপোর্ট করে ইউনিটকে। এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নাড়িয়ে দেয় গোটা সেনাবাহিনীকে। বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারতের রাষ্ট্রপতি পেডঙ্গিকে ‘বীর চক্র’ পুরস্কার প্রদান করেন। এখনও ব্যাঙ্গালোরের ASC কেন্দ্রের জাদুঘরে সযত্নে রাখা রয়েছে বীর চক্রের পদক সহ পিতলের প্লেটটি। আজ এতটা পথ পেরিয়ে এসে হয়ত বিস্মৃতির অতলে ডুব দিয়েছে পেডঙ্গি। কিন্তু এ দায়ভার নিতে হবে আমাদেরই। সেই বীরত্বের স্মৃতিকে হারাতে দিলে , তা হবে ঘোর অন্যায়।
















