গুহার ভেতর রাশি রাশি সোনা, অধরা সেই গুপ্তধনের সংকেত || বিহারের স্বর্ণভাণ্ডার আজও রহস্যময়
বিহারের এই ‘স্বর্ণভাণ্ডার গুহা’ প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি আর স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু গুহার গভীরে লুকিয়ে আছে কিছু অমীমাংসিত রহস্য।

সেই প্রাচীন যুগ থেকে ভারত রহস্যের আঁতুড়। যেখানেই কিছু খনন করা হোক না কেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই। কিন্তু এছাড়াও ভারতে এমন কিছু স্থান আছে, যা আজও বিজ্ঞানের কাছে ধাঁধাঁর মতো। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও আমাদের কাছে অনেককিছুই অজানা থেকে যায়।
ভারত তার প্রাচীন সভ্যতা এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। ছোটবেলা থেকে কল্পকাহিনি বা রূপকথার কাহিনি মানে, ওই যে যেখানে সোনার কাঠি-রূপোর কাঠি ছুঁইয়ে গুহার দরজা খুলে যায়, আবার কাউকে ঘুমের দেশ থেকেও ফিরিয়ে আনা যায়। আর চোর-ডাকাতের গল্পে তো গুহা থাকবেই থাকবে। কিন্তু যদি জানতে পারেন, বিহারের নালন্দা জেলার রাজগিরে এমন একটি গুহা আছে, যা সোনা-রূপো-হিরে-জহরতে ভর্তি, এবং সেই ভান্ডারের দরজার বাইরে আছে এক পাসওয়ার্ড যা সলভ করতে পারলেই আপনি হয়ে যাবেন আম্বানি, আদানির থেকেও বড়লোক- তাহলে কেমন হয়?
না, এটা কিন্তু কোনও রূপকথার গল্পগাথার গুহা নয়। সত্যিকারের গুহা। বিজ্ঞানের অজানা ধাঁধাঁর মধ্যে অন্যতম এই ‘পহেলি পুত্র ভান্ডার’, যা কিনা বিহারের রাজগিরে অবস্থিত। বলা হয়, হর্য্যঙ্ক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিম্বিসারের স্ত্রী এই গুহায় এত ধনসম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন, যার হদিশ কারও কাছে নেই। ব্রিটিশ রাজও এই সম্পদ উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোথায় এই জায়গা? আর কী-ই বা আছে এই গুহায়? এক নির্জন, নিরালা পাহাড়, তার ওপরে দু'টি রহস্যময় পাহাড়। আপাতদৃষ্টিতে অন্যান্য বৌদ্ধ বা জৈন গুহার সঙ্গে মিল থাকলেও এই গুহার দরজা আর তার গায়ে লেখা লিপি জন্ম দিয়েছে হাজার প্রশ্নের।
বাংলার পড়শি রাজ্য বিহার একসময় মৌর্য এবং মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। সম্রাট অশোকের হাত ধরে এই বিহার থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম একসময় বিশ্বের দরবারে পৌঁছয়। যাই হোক, এই বিহারেই সন্ধান পাওয়া গেছে দু'টি কৃত্রিম গুহার, যা কিনা সম্ভবত তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দীতে খনন করা হয়েছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা। এমনকী, ব্রিটিশ সরকারও তাদের রাজত্বকালে ক্যানিংহ্যাম নামে এক প্রত্নতত্ত্ববিদ আনে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় যে, এই গুহাদু'টি বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে যুক্ত এক ঐতিহাসিক গুপ্তধনের আস্তানা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে এইরকম কুঠুরি সম্পদ লুকিয়ে রাখার জন্য অথবা মানুষকে বন্দি করার জন্য ব্যবহৃত হতো। ২০১২ সালের পর এই কুঠুরি নিয়ে আর কোনও তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বিহারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বৈভব পর্বতের পাদদেশে এই দু'টি গুহা নির্মাণ করেছিলেন এক জৈন সন্ন্যাসী। পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত সেই গুহার দেওয়ালে লেখা আছে এমন এক লিপি, যার পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি, এবং রয়েছে একটি কাঠের দরজার কাঠামো। গুহার গায়ে যে লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার মধ্যে একটি গুপ্তব্রাহ্মী আর অন্যটি শঙ্খলিপি। গুপ্তব্রাহ্মীর পাঠোদ্ধার করা গেলেও শঙ্খলিপির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি। মনে করা হয়, যে ব্যক্তি ওই লিপি পাঠোদ্ধার করতে পারবে, সে-ই হবে ওই ধনসম্পদের মালিক। কিন্তু সে গুড়ে বালি! চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর কথায়, বিহারে অবস্থিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র এই শঙ্খলিপি পড়ানো হতো এবং শঙ্খ লিপি সম্পর্কিত সমস্ত তথ্যও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ইসলামি আক্রমণে এই বিদ্যালয়ের ধ্বংসের পর কিছুই উদ্ধার করা যায়নি।
বিহারের এই ‘স্বর্ণভাণ্ডার গুহা’ প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতি আর স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু গুহার গভীরে লুকিয়ে আছে কিছু অমীমাংসিত রহস্য। রাজা বিম্বিসারের গল্প। দুই রকমের গল্প সম্বন্ধে জানা যায়। এক, বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বিম্বিসার মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার পিতা মহাপদুম কর্তৃক মগধের রাজা হিসেবে নিযুক্ত হন। বিম্বিসারের মায়ের নাম ছিল বিম্ব। প্রাচীন গ্রন্থ অনুযায়ী, বিম্বিসার গৌতম বুদ্ধর থেকে ৫ বছরের ছোট ছিলেন। পরবর্তীকালে দেবদত্তর প্ররোচনায় বিম্বিসারের পুত্র অজাতশত্রু তাঁকে হত্যার চেষ্টা করলে বুদ্ধের মতাদর্শে বিশ্বাসী বিম্বিসার তাঁর পুত্রকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু পরে, অজাতশত্রু আবার তাঁর পিতা এবং তাঁর সহায়কদের গৃহবন্দি করে রেখে নিজেকে মগধের রাজা হিসেবে ঘোষণা করে। রাজা বিম্বিসারের বিশ্রামের জায়গা ছিল গুহাটি। ইতিহাস বলে যে, নিজের ছেলের হাত থেকে বিপুল ধন রক্ষা করতে তিনি এই গুহারই কোনও এক গোপন স্থানে তা লুকিয়ে রাখেন। ৪৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা বিম্বিসারের মৃত্যু হয় কিন্তু কেউ কোনওদিন তার বিপুল ধনসম্পদের হদিশ পায়নি।
অন্য আরেকটি কাহিনি হলো, হর্য্যঙ্ক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিম্বিসারের সোনা এবং রূপোর প্রতি অমোঘ আকর্ষণ ছিল। এজন্য তিনি সোনা এবং রূপোর গয়না সংগ্রহ করতেন। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সমস্যা মেটানোর জন্য তিনি সেই রাজ্যের নারীদের বিবাহ করতে আগ্রহী ছিলেন। সেইভাবেই কোশল-রাজ মহাকোশলের কন্যা কোশল দেবীকে বিবাহ করলে দুই রাজ্যের সমস্যা মিটে যায়। এবং যৌতুক হিসেবে বিম্বিসার কাশী অধিগ্রহণ করেন। তাঁর আরও দুই স্ত্রী ছিলেন– বৈশালীর লিচ্ছবি মহাজনপদের প্রধান চেতকের কন্যা চেল্লনা এবং তৃতীয় পত্নী মদ্র দেশের রাজকন্যা ক্ষেমা। এই বিবাহ যেমন তাঁর সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেছিল, ঠিক সেইভাবে তিনি অনেক সোনাও পেয়েছিলেন।
বলা হয়, বিম্বিসারের স্ত্রী রাজগিরে এক ধনভান্ডার তৈরি করেছিলেন। রাজার সংগ্রহ করা সমস্ত সম্পদ এই গুহায় লুকিয়ে রাখতেন। গুহায় দু'টি কক্ষ ছিল, একটি সৈন্যদের, অন্যটি গুপ্তধনের। গুপ্তধনের ঘরটি একটি বড় পাথর দিয়ে ঢাকা, যা দরজা হিসেবে কাজ করে। আর এই দরজার ওপরে শঙ্খ লিপিতে কিছু লেখা। স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ শাসক সোনার লোভে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন। পাহাড় ফাটিয়ে অনেক খুঁজেছেন, কিন্তু কিছুই তাদের হাতে আসেনি। ব্রিটিশ সরকার কামান দিয়েও দরজা ভাঙার চেষ্টা করেছে, কিন্তু একটা কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই হয়নি। সেই দাগ আজও দরজার গায়ে জাজ্বল্যমান।
এই স্বর্ণগুহাই যে একমাত্র দেখার জিনিস, তা কিন্তু নয়। এই গুহার থেকে ২ কিমি দূরে আছে বৌদ্ধদের ‘সপ্তপর্ণী’ গুহা। আর এই সোনভাণ্ডার গুহার গায়ে খোদিত রয়েছে বহু জৈন এবং বৌদ্ধ স্থাপত্যের চিহ্ন। গুপ্তধন উদ্ধারের লোভে বহু পর্যটক এসেছেন, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। সেই দরজা এখনও বন্ধই রয়েছে। মনে করা হয়, রাজা বিম্বিসার এখনও তাঁর এই সম্পদ রক্ষা করছেন তাঁর শত্রুর হাত থেকে এবং যতদিন না যোগ্য উত্তরসূরি পাচ্ছেন, ততদিন এই দরজা বন্ধই থাকবে।
















