ঠিক যেন স্বর্গ, অথচ জলে ভাসে কঙ্কাল! অভিশপ্ত রূপকুণ্ডর কাহিনি শিহরণ জাগায়

রূপকুণ্ডর মৃত মানুষগুলোর অতীত এবং পরিচয় নিয়ে গবেষণা চললেও তাদের বর্তমান আজ বিপদের মুখে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশ থেকে আসা বহু পর্যটক জলাশয়ের কঙ্কালগুলোর হাড় স্মারক হিসেবে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে চলে যান।

Raktim Dey
৩ মিনিট
ঠিক যেন স্বর্গ, অথচ জলে ভাসে কঙ্কাল! অভিশপ্ত রূপকুণ্ডর কাহিনি শিহরণ জাগায়

নাম তার যতটা সুন্দর, ইতিহাস তার ততটাই রহস্যময়। তার চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে মোহিত করে তোলে কিন্তু বরফ গলে গেলেই তার জলের গভীরে দেখা যায় এক ভয়ংকর দৃশ্য। উত্তরাখণ্ডে ৫০২০ মিটার (১৬৪৭০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত রূপকুণ্ডর বর্ণনা এইভাবেই দেওয়া যেতে পারে। চারদিকে সুউচ্চ পর্বতরাশির মাঝে ছবির মতো একটুকরো জলাশয়। সুন্দর এই প্রাকৃতিক পরিবেশের ছবি এক মুহূর্তে আতঙ্কের ছবিতে পরিণত হতে পারে। কারণ বরফ গলে যাওয়ার পরে জলাশয়ের জলে দেখা যায় শয়ে শয়ে মানুষের কঙ্কাল।

১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকারের অধীনস্থ বন দপ্তরের কর্মচারী হরি কিষান মাধবওয়াল সর্বপ্রথম এই জলাশয়ের কঙ্কালগুলি দেখতে পেয়েছিলেন। সেই সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। ব্রিটিশ সরকার এই কঙ্কাল আবিস্কারের খবর পেয়ে প্রথমে সন্দেহ করেছিল যে, কঙ্কালগুলি হয়তো জাপানি সেনাবাহিনীর। জাপানি সেনাবাহিনীর জওয়ানরা হয়তো এই পথে ব্রিটিশশাসিত ভারতে প্রবেশ করতে গিয়ে কোনওভাবে মারা গিয়েছে। যদিও ব্রিটিশদের পাঠানো তদন্তকারী দল জানিয়ে দেয় যে, কঙ্কালগুলো জাপানি সেনার কঙ্কাল নয়, কারণ সেগুলি বহু পুরনো। ১৯৪২ সাল থেকে আজ অবধি রূপকুণ্ডর কঙ্কাল নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফল এবং কঙ্কালগুলির পরিচয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে। এছাড়া রূপকুণ্ডর সঙ্গে অসংখ্য জনশ্রুতি জড়িয়ে রয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গেলে কেউ ফিরে আসে না, হিমাচলের এই উপত্যকা যেন মৃত্যুফাঁদ

অপরূপ সব স্থানগুলোর মধ্যে একটি উত্তরের হিমাচল প্রদেশের কাসোল। এই গ্রামের অপূর্ব সৌন্দর্য ছাড়াও আরও অনেককিছুই রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম পথে যাঁরা অভিযানে নামতে চান, তাঁদের জন্য স্বর্গরাজ্য কাসোল।

রূপকুণ্ডের জলাশয়ের গভীরে সম্ভবত ৩০০ জন অথবা বেশি মানুষের কঙ্কাল অথবা কঙ্কালের অংশ রয়েছে। এই কঙ্কালগুলোর সঠিক পরিচয় জানা যায় না। ব্রিটিশ সরকার শুরুতেই এই কঙ্কালের সঙ্গে জাপানি সেনার সম্পর্ক নস্যাৎ করে দিয়েছে। কঙ্কাল এবং অংশের ওপর গবেষণা করে বিশেষজ্ঞরা জানতে পেরেছেন যে, এই কঙ্কালগুলির মধ্যে নারী এবং পুরুষ উভয়ের কঙ্কাল রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বয়সের মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে। এই সমস্ত কঙ্কালের হাড়ের পরীক্ষা করে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে, এই সমস্ত মানুষ একইসঙ্গে মারা যায়নি, যদিও তাদের মধ্যে একটা বড় অংশের মানুষের একই সময় মৃত্যু হয়েছিল। বিভিন্ন সময়কাল, বয়স এবং লিঙ্গের মানুষের উপস্থিতি এই তথ্য প্রমাণ করে যে, এইসব কঙ্কাল সেনাবাহিনীর কঙ্কাল হওয়া সম্ভব নয়।

২০০৪ সালে এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে আসে যে, এই সমস্ত মানুষ হয়তো তীর্থযাত্রী ছিলেন। তীর্থযাত্রায় যাওয়ার পথে শিলাবৃষ্টির সময় বড় আকারের শিলের অথবা বরফের টুকরো মাথায় পড়ার কারণেই তাদের মৃত্যু হয়। রূপকুণ্ডর জলাশয় এবং তার আশপাশে কোনও অস্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায় নি। জলাশয়ের কঙ্কালগুলোর মাথার পিছনে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সেই আঘাত ভারী, ভোঁতা এবং গোলাকার কিছুর আঘাতের ফলে হয়েছে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন। যদি মৃত ব্যক্তিরা কোনও মানুষের আক্রমণের সম্মুখীন হতো, তাহলে তাদের শরীরে অন্যত্র আঘাতের চিহ্ন থাকা উচিত ছিল, কিন্তু আঘাতের চিহ্ন ছিল শুধু মাথার পিছনে।

এই তথ্যের সমর্থনে বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে যে, এক রাজা এবং রানি তাদের অনুচর-সহ এই এলাকায় তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। পথেই তাদের সকলেরই মৃত্যু হয়েছিল। যদিও বহু জনশ্রুতিতে রাজা এবং রানি দেবতার রোষের মুখে পড়েছিলেন বলা হয়, কিন্তু বহু জনশ্রুতিতে দেবতাদের রোষের কোনও উল্লেখ নেই। ২০১৯ সালে পাঁচ বছর ধরে চলা এক গবেষণায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। এই গবেষণা জলাশয়ের ৩৮ জন মানুষের জিনের ওপর করা হয়েছিল। এই গবেষণা অনুসারে কিছু মানুষ একই এলাকার হলেও একজন মানুষকে পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া কিছু মানুষকে পূর্ব এশিয়ার আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এই গবেষণার ফলে কঙ্কালের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, কারণ বেশিরভাগ কঙ্কাল একই সময়ে মারা যাওয়া মানুষের হলেও কিছু ক্ষেত্রে এই বিভিন্ন এলাকার মানুষ একই সঙ্গে একই এলাকায় মারা যাওয়ার কারণ জানা যায় না।

রূপকুণ্ডর মৃত মানুষগুলোর অতীত এবং পরিচয় নিয়ে গবেষণা চললেও তাদের বর্তমান আজ বিপদের মুখে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশ থেকে আসা বহু পর্যটক জলাশয়ের কঙ্কালগুলোর হাড় স্মারক হিসেবে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে চলে যান। বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ এবং সরকারি তরফে পর্যটকদের এই অনৈতিক কাজ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। রূপকুণ্ডর গবেষণা ভবিষ্যতে কোন সত্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেই দিকেই কৌতূহলী বিজ্ঞানীরা তাকিয়ে আছেন ।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।