বাঙালির দুর্গাপুজো শুরু হলো কীভাবে, কত খরচ হয়েছিল সেকালের পুজোয়?

দুর্গাপুজো মানেই বাঙালিদের কাছে সারা বছরের প্রতীক্ষার পরে কয়েক দিনের আনন্দ। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, দেবীর বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন কারণে শুরু হওয়া সেই দুর্গোৎসব বছরের পর বছর অতিক্রম করেই আজ আমাদের চেনা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
বাঙালির দুর্গাপুজো শুরু হলো কীভাবে, কত খরচ হয়েছিল সেকালের পুজোয়?

রথের দড়িতে টান পড়লে কলকাতা দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কলকাতায় দুর্গাপুজোর কথা বললে দুই ধরনের পুজোর কথা মাথায় আসে। বাড়ির পুজো এবং সার্বজনীন পুজো। যদিও প্রথমেই দুই ধরনের পুজো, অর্থাৎ সার্বজনীন এবং বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়নি।

আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজো অথবা দেবীর অকালবোধনের কথা প্রথম রামায়ণে পাওয়া গেলেও বঙ্গের দুর্গাপুজোর সূচনার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে অন্য এক রাজার নাম। কথিত আছে যে, বলীপুরের রাজা সুরথ ৫৫০ সাল নাগাদ যুদ্ধে নিজের সাম্রাজ্য হারানোর পরে মেধাস মুনির নির্দেশে দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো করেছিলেন। এই পুজোর ফলস্বরূপ দেবীর আশীর্বাদে তিনি আবার তাঁর সাম্রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন। মার্কণ্ডে‌য় পুরাণে এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুরথের সাম্রাজ্যের কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও দুর্গাপুরের কাছে গড় জঙ্গলে আজও মেধাস মুনির আশ্রম এই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই আশ্রমে বাংলার প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মধ্যাহ্নভোজে ইলিশ, যন্ত্রণায় শিশুর মতো কান্না! কেমন ছিল স্বামীজির শেষের সেই দিন?

Swami Vivekananda Death: দেহ দাহ করার অনুমতি মেলেনি, ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি— এমন নানা অপমান বিবেকানন্দকে সহ্য করতে হয়েছে মৃত্যুর পরেও। কিন্তু তিনি মহামানব।

বাংলায় বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা নিয়ে একটা বিতর্ক থেকেই যায়। যদিও বিভিন্ন নথি এবং জনশ্রুতি তাহেরপুরের জমিদার কংসনারায়ণ অথবা মুর্শিদাবাদের ভবানন্দ মজুমদারের মধ্যেই কাউকে বাংলায় বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনার কৃতিত্ব দিয়ে থাকে। কংসনারায়ণের আয়োজিত প্রথম দুর্গাপুজোর সময় নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কথিত আছে যে, কংসনারায়ণ দুর্গাপুজোতে প্রায় আট লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। কংসনারায়ণ এবং ভবানন্দের দুর্গাপুজোর আয়োজনের আগে বাংলায় বাসন্তী পুজো বেশি প্রচলিত ছিল। কংসনারায়ণ হঠাৎ বাসন্তী পুজোর বদলে দুর্গাপুজোর প্রচলন কেন করেছিলেন, সেই বিষয়ে কোনও সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। বাঙালি অকালবোধনের কথা রামায়ণে পড়ে থাকলেও নিজের চোখে বাড়িতে আয়োজিত দুর্গাপুজো সম্ভবত এই আমলে প্রথম দেখেছিল।

মুর্শিদাবাদের ভবানন্দ মজুমদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বসূরি ছিলেন। ১৬০৮ সালে তিনি দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন এবং এই দুর্গাপুজো প্রায় দেড় শতক পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলে বাংলায় আয়োজিত অন্যতম বড় এক উৎসবে পরিণত হয়েছিল। এই পরিবারের পুজোয় সর্বপ্রথম দেবী দুর্গাকে রাজরাজেশ্বরী রূপে পুজো করা হয়। কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায় প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজনের সঙ্গে বড়িশার রায়চৌধুরীদের নাম জড়িয়ে আছে। লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পূর্বসূরি ছিলেন। তিনি রায়চৌধুরী উপাধি পেয়েছিলেন। ১৬০৮ সালে তিনি আটটা, মতান্তরে নয়টা পরগনার জমিদারি পেয়েছিলেন। লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় ১৬১০ সালে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে এইসব জমিদার এবং রাজবাড়ির পুজোর জাঁকজমক বাড়তে শুরু করে। এই পুজোগুলি বাড়ির ভেতরে আয়োজিত হতো এবং কেবল নিমন্ত্রিতরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দুর্গাপুজো দেখতে পেতেন।

১৭৮৯, মতান্তরে ১৭৯০ সালে গুপ্তিপাড়ার এক বাড়ির দুর্গাপুজোতে এলাকার বেশ কিছু মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, কারণ তাঁরা পুজোতে নিমন্ত্রিত ছিলেন না। সেই ঘটনার ফলে তাঁরা সকলে একসঙ্গে একটি দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। এই দুর্গাপুজোয় সকলের অবাধ প্রবেশ ছিল। এই পুজোর আয়োজক বারো জন বন্ধু ছিলেন বলেই এই জাতীয় দুর্গাপুজোর নাম হয় বারোইয়ারি দুর্গাপুজো। এই বারোইয়ারি পুজো সার্বজনীন পুজো নামেও পরিচিত হয়, কারণ এই পুজোয় সকলেরই নিমন্ত্রণ থাকতো। যদিও অপর এক জনশ্রুতি অনুযায়ী, গুপ্তিপাড়ায় ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় একটি দুর্গাপুজোর আয়োজন হতো। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এই দুর্গাপুজো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে বারো জন মানুষ এই পুজোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। গুপ্তিপাড়ার এই নতুন ধরনের পুজোর কথা সেই সময়ের বিভিন্ন নথি থেকেও জানা যায়। এই দুর্গাপুজোয় দেবীকে বিন্ধ্যবাসিনীরূপে পুজো করা হয়। দেবীর এই রূপে পুজোর কারণে গুপ্তিপাড়ার একটি এলাকার নাম হয় বিন্ধ্যবাসিনীতলা। যদিও বর্তমানে গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা উৎসব দুর্গাপুজোর তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয়। গুপ্তিপাড়ার বারোইয়ারি পুজোর ধারণা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। চুঁচুড়া, শান্তিপুর, কাঁচরাপাড়া এবং পরবর্তীকালে কলকাতায় এই ধরনের পুজো জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

দুর্গাপুজো মানেই বাঙালিদের কাছে সারা বছরের প্রতীক্ষার পরে কয়েক দিনের আনন্দ। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, দেবীর বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন কারণে শুরু হওয়া সেই দুর্গোৎসব বছরের পর বছর অতিক্রম করেই আজ আমাদের চেনা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।