জাতীয় ভোটার দিবসে কি ভোটারদের সত্যি সম্মান দেওয়া হচ্ছে?
National Voters Day: ঐ বিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৩ তারিখ আনার এক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাতে সই করেন। অনেকের হয়তো মনে নেই, ঐ শীতকালীন অধিবেশনেই প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদকে বহিষ্কার করে বিলটি আনা হয়েছিল।
১৯৫০ সালে স্থাপিত হওয়া নির্বাচন কমিশনের আজকে জন্মদিন। তাই আজ দেশ জুড়ে নানান অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। সকাল সকাল প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসকদলের তাবড় নেতারা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ভারতের সমস্ত নির্বাচককে ‘জাতীয় ভোটার দিবস’ উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনেক বড় বড় কথা বলেছেন। কেন ভারতের নির্বাচন একটি সারা বিশ্বে আলোচিত বিষয় তা নিয়ে প্রচুর ভাষণ দিয়েছেন। ভারতের প্রতিটি নির্বাচক কেন ভারতের গণতন্ত্রের জন্য এত দামি, তা নিয়েও অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা শুনিয়েছেন। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রে বড় বড় বিজ্ঞাপনও ছাপা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও একই রকমের বাণী শোনা গেছে।
যাঁরা এই কথা শুনেছেন বা দেখেছেন তাঁদের অনেকেই নিশ্চিত আক্ষরিক অর্থে এই কথাগুলো বিশ্বাস করেছেন, তবে আজকের সময়ে ‘জাতীয় ভোটার দিবস’ সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্য দেশের বেশিরভাগ মানুষই যে বিশ্বাস করেননি, তা নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়। ২০২৫ সালে সিএসডিএস পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই মানুষের এই নির্বাচন কমিশনের উপর অবিশ্বাস ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। এই সমীক্ষা কিন্তু শুধু বিরোধী ভোটারদের মধ্যে করা হয়নি, সাধারণ মানুষের মধ্যেই এই ধারণা তৈরি হয়েছে।
এই অবিশ্বাস কোন সময় থেকে শুরু হয়েছে তা বলতে পারলে কোনও বিশেষ পুরষ্কার নেই। সবাই জানেন যেদিন নরেন্দ্র মোদী সরকার, নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করার জন্য ২০২৩ সালে, The Chief Election Commissioner (CEC) and Other Election Commissioners, (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act, বিলটি এনে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে, সরকারের একজন মন্ত্রীকে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, সেদিন থেকেই কমিশনের কর্মকান্ড নিয়ে মানুষের প্রশ্ন শুরু হয়েছে। আগে ৩জনের ঐ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতি ছিলেন, ফলে একটা সামঞ্জস্য ছিল, কিন্তু এখন ক্যাবিনেট স্তরের একজন মন্ত্রীকে ঐ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করাতে তার ভারসাম্য যে নষ্ট হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ঐ বিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৩ তারিখ আনার এক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাতে সই করেন। অনেকের হয়তো মনে নেই, ঐ শীতকালীন অধিবেশনেই প্রায় সমস্ত বিরোধী সাংসদকে বহিষ্কার করে বিলটি আনা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাংবিধানিকভাবে ঐ বিলটি ভুল হওয়া সত্ত্বেও, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মামলা গ্রহণ করতে রাজি হননি।
ঐ বিলকে সামনে রেখে প্রথম যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরকার নিযুক্ত করেন, তিনিই জ্ঞানেশ কুমার। তাঁকে ফেব্রুয়ারি মাসে বেছে নেওয়া হয়। তারপর যখন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের বিরুদ্ধে তাঁকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখা যায়, তখন থেকেই মানুষ বুঝতে পেরে গেছে যে এই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে শাসক বিজেপির তাবেদারি করার জন্যই বেছে নেওয়া হয়েছে। যে নির্বাচন কমিশনে আমরা সুকুমার সেনকে পেয়েছিলাম, যে কমিশনে আমরা টি এন শেষনকে কাজ করতে দেখেছি সেই স্বশাসিত সংস্থায় যদি জ্ঞানেশ কুমারের মতো পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ থাকে তাহলে কি ঐ সংস্থার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয় না?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AIMIM performance maharashtra: মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের একাধিক শহর— ঔরঙ্গাবাদ, নাগপুর, অমরাবতী, আকোলা এইসব এলাকায় সাম্প্রতিক পুরসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে এক নতুন ধরনের ভোটিং প্রবণতা। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার বিভক্ত না হয়ে কৌশলগতভাবে নির্দিষ্ট প্রার্থী ও দলকে সমর্থন করেছেন।
রাহুল গান্ধী এখনও পর্যন্ত ৩টি সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। ২০২৫ সালের ৭ অগাস্ট, ২৮ সেপ্টেম্বর এবং ৫ নভেম্বর। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনে ‘ভোট চুরি’র যে কয়েকটি প্রমাণ তিনি সবার সামনে দেখিয়েছেন, তার একটিরও কিন্তু সদুত্তর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার দিতে পারেননি। রাহুল গান্ধী পাওয়ার পয়েন্টে যা কিছু দেখিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে একটা কথাই প্রমাণিত হয়, বিজেপি ভোট চুরি করে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছে। ৩টি রাজ্যেই অসংখ্য ভুয়ো ভোটারদের ঢোকানো হয়েছে এবং সঠিক জীবিত ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এই কাজটি করা হয়েছে, ফর্ম ৭ (অভিযোগের ভিত্তিতে বাদ) এবং ফর্ম ৬ (নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি) এর সাহায্যে।
রাহুল গান্ধী এই সাংবাদিক সম্মেলনের আগে এই কথাগুলোই একটি সর্বভারতীয় দৈনিকে লিখেছিলেন। পরবর্তীতে যোগেন্দ্র যাদবের মতো অনেকেই একই কথা বলেছেন। নির্বাচন কমিশন কিন্তু এই পরিষ্কার অভিযোগের কোনও পরিষ্কার জবাব দিতে পারেনি। উল্টে বিহার নির্বাচনের ২ মাস আগে হঠাৎ করে কমিশনের তরফে বিহারের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার ফলে বিহারে ৪৭ লক্ষ ভোটারদের নাম যে বাদ পড়ে, তা পরে দেখা যায় এবং তার মধ্য দিয়ে কীভাবে নীতিশকুমার এবং বিজেপির সুবিধা হয়েছে, তা আমরা আজ সকলেই জানি। রাহুল গান্ধীর সাংবাদিক সম্মেলনে কর্ণাটকের মহাদেবপুরায় কীভাবে ভোট চুরি করা হয়েছে, তার একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। রাহুল অভিযোগ করেন শুধু ঐ আসনেই ১১,৯৬৫টি ডুপ্লিকেট ভোটারের হদিশ পাওয়া গেছে। ৪০,০০৯টি ভুয়ো ঠিকানার ভোটার, ১০,৪৫২টি একই ঠিকানার ভোটার এবং ৪,১৩২টি ভুয়ো ছবি দেওয়া ভোটারের খোঁজ মিলেছে। শুধু তাই নয়, কীভাবে ৩৩,৬৯২টি ভোটকে ফর্ম ৬-এর অপব্যবহার করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেই অভিযোগও ওঠে। ৭০, ৮০ বছরের মানুষদের নাম কীভাবে ঐ ফর্ম ৬ দিয়ে ভোটার তালিকায় তোলা যায়, সেই প্রশ্নও করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
যোগেন্দ্র যাদব বিহারের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর পরে আরও কিছু প্রশ্ন তোলেন, যার উত্তর এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যে প্রশ্নগুলো তিনি তুলেছেন সেগুলোও সবার জানা উচিত।
১। গণহারে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে কী কী সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে? তিনি জানতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন কীভাবে ভুলবশত নাম বাদ পড়া প্রতিরোধ করছে, বিশেষ করে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
MGNREGA: মনরেগার পরিবর্তে যে নতুন আইন আনা হয়েছে তা আদতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপরেও আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। রাজ্যগুলির সঙ্গে পরামর্শ না করেই এবং রাজ্য সরকারগুলির রাজকোষের উপর সীমাবদ্ধতা আছে, এই বিষয়টি পুরোপুরি জানার পরেও, কেন্দ্র একতরফা ভাবে এবং একেবারে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো কর্মসংস্থান প্রকল্পে রাজ্যগুলির প্রদেয় অংশের অনুপাত এখনকার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করেছে।
২। কেন নতুন নাম যোগ করার চেয়ে নাম বাদ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল? তিনি দাবি করেন, এই প্রক্রিয়াটি নতুন ভোটারদের নাম তালিকাভুক্ত করার চেয়ে নাম বাদ দেওয়ার উপর বেশি মনোনিবেশ করেছিল, যা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে খর্ব করেছে।
৩। সরাসরি ভোটারদের যাচাইয়ের কাজ কেন বেসরকারি সংস্থাগুলোকে আউটসোর্স করা হয়েছিল? বেসরকারি পক্ষগুলোকে সংবেদনশীল ভোটার তথ্য পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হলে নির্বাচকদের নিজস্ব গোপনীয়তা যে নষ্ট হয়, তার সম্পর্কে কমিশনের কী উত্তর?
৪। বাদ পড়া ভোটারদের জনসংখ্যাগত প্রোফাইল কেমন? তিনি অভিযোগ করেন যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় দলিত, মুসলিম এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই অভিযোগ যাচাই বা খণ্ডন করার জন্য তথ্য দাবি করেন।
বিহারের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ফলে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় প্রায় ১৫,০০০-২০,০০০ ভোটার কমে গেছে, যার ফলে বিহারের ২৪৩টি বিধানসভা আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৭.৮৯ কোটি থেকে কমে ৭.৪২ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। তার উপর পুরুষ-মহিলার হারও কমে গেছে, সেই নিয়েও নানান কথা আছে, যার উত্তরও নির্বাচন কমিশন দেয়নি।
২০২০ এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনের মধ্যে ৯১টি আসনে দলীয় নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এসেছে। ভোটার কমে যাওয়াতে, আগে যেখানে বিরোধী পক্ষের প্রভাব বেশি ছিল সেখানে এখন শাসকদলের প্রভাব বেশি হয়েছে। ১১টি আসনে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় বাদ দেওয়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে, যা ফলাফলের উপর সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। ৯১টি আসনের মধ্যে বিজেপি এবং জনতা দল (ইউনাইটেড) সহ তাদের সঙ্গী জোটেরা ৭৫টি আসনে জয়লাভ করেছে এবং বিরোধী দলের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় জনতা দল নেতৃত্বাধীন মহাজোট মাত্র ১৫টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং ২০২০ সালে তাদের দখলে থাকা ৭১টি আসনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই কথাগুলো বলার পাশাপাশি যোগেন্দ্র যাদব কিন্তু সাবধান করে দেন, যে বিহার শুধুমাত্র একটা পরীক্ষা, নির্বাচন কমিশনের আসল লক্ষ্য বাংলা।
আজকে যখন বাংলায় ঐ বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর দ্বিতীয় পর্যায়ে যৌক্তিক অসঙ্গতি বা ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র বাহানা দেখিয়ে মানুষের হয়রানি বাড়ানো হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু ও মহিলাদের বাদ দেওয়ার চক্রান্ত পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তখন রাহুল গান্ধী এবং যোগেন্দ্র যাদবের অভিযোগগুলো যে সঠিক তা প্রমাণিত হচ্ছে। এখনও কিন্তু নির্বাচন কমিশন স্বীকার করেনি, তাঁদের প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই এত সমস্যা হচ্ছে আর ওদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এই প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। তাই আজকের ‘জাতীয় ভোটার দিবস’ সত্যিই ভারতের সংবিধান রক্ষার দিন এবং ভারতের প্রজাতন্ত্রকে বাঁচানোর দিন হিসেবে উঠে আসছে। নির্বাচন কমিশন বা প্রধানমন্ত্রী বা শাসকদলের কোনও নেতা-মন্ত্রী যখন ভোটারদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করছেন, তখন তা হাস্যস্পদ হয়ে উঠছে। ভারতবর্ষের গণতন্ত্র তাঁর নাগরিকদের প্রশ্ন করতে শেখায়, এই প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই ভারতের প্রজাতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সেই লড়াই সমস্ত নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়েই করতে হবে। নিজের সমস্যা মিটে গেলেও উচ্চস্বরে সমষ্টির স্বরে, স্বর মিলিয়ে বলতে হবে এই নির্বাচন কমিশন নিজেই অবৈধ, তাই তাঁদের পরিচালিত বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর নামে নাগরিকত্ব পরীক্ষাও অবৈধ। এটাই ভোটার অধিকার দিবসের শপথ।






