স্বৈরতন্ত্র বাধ্য করেছিল নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে, নোবেলের যে ইতিহাস আজও অজানা

Nobel Prize 2022: ১৯০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৫৮ জন মহিলা। নোবেলজয়ীদের মধ্যে কনিষ্ঠতম মালালা ইউসুফজা়ই, যিনি মাত্র সতেরো বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন (নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৪)।

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
স্বৈরতন্ত্র বাধ্য করেছিল নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে, নোবেলের যে ইতিহাস আজও অজানা

দেখতে দেখতে সামনে হাজির বহু প্রতীক্ষিত সেই সপ্তাহ, যার দিকে আবিশ্ব বিজ্ঞানপ্রেমী, সাহিত্যপ্রেমী এবং অর্থনীতিতে আগ্রহী মানুষেরা তাকিয়ে থাকেন। শুরু হল বিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি এবং অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণার মহরৎ। ৩ থেকে ১০ অক্টোবর- এই এক সপ্তাহ জুড়ে চলবে ২০২২ সালের নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা।

নোবেল প্রাইজ কী এবং কেন?

পাঠকদের মধ্যে এ কথা অনেকেরই জানা যে, সুইডিশ রসায়নবিদ অ্যালফ্রেড বার্নহার্ড নোবেলের নামানুসারে এই পুরস্কারটির নামকরণ হয়েছে। অ্যালফ্রেড নোবেল, যিনি ডায়নামাইটের মতো বিধ্বংসী জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন এবং পরবর্তীতে যা মানুষের কল্যাণেই কাজে লাগানো হয়েছিল, বিশ্বাস করতেন মানুষই সমাজের কল্যাণ করতে পারে। মানুষই সভ্যতার চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং মানবতাবাদকে অস্ত্র করে। আর সেই জন্যেই তিনি বিজ্ঞান, সাহিত্য, এবং শান্তিতে সাড়া জাগানো কোনও আবিষ্কার এবং কাজকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করেন। ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর নিজের শেষ উইলটি সাক্ষর করেন অ্যালফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল। সেই উইলে নিজের বিপুল সম্পত্তির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নোবেল পুরস্কার দেওয়ার উদ্দেশ্যে দান করেন তিনি।

ছবিতে অ্যালফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল

আর তখন থেকেই নোবেল পুরস্কারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। নোবেল পুরস্কারের উদ্দেশ্যে দান করা তাঁর বিপুল সম্পত্তির দায়ভার আসে ‘নোবেল ফাউন্ডেশন’-এর কাঁধে এবং অবশ্যই নোবেল পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য যা, সেই লক্ষ্যপূরণের গুরুদায়িত্বও তাদের হাতেই বর্তায়। অ্যালফ্রেড নোবেলের ইচ্ছেপূরণের উদ্দেশ্যে এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির পথ চলা শুরু ১৯০০ সালে। ২০২২ সালে প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের মূল্য দশ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনরের সমান। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে এক সুইডিশ ক্রোনার ভারতীয় মূল্য ছিল সাত টাকা চল্লিশ পয়সা।

ফিরে দেখা নোবেল পুরস্কার

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রথমবার বাবা হওয়ার পর আয়তনে হ্রাস পাচ্ছে মস্তিষ্ক! নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্য বিজ্ঞানমহলে

Brain Plasticity: আপাত দৃষ্টিতে কর্টেক্সের আয়তনে হ্রাস পাওয়ার ঘটনা ক্ষতিকর শুনতে মনে হলেও, এই ঘটনা আদতে সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং তার প্রতি স্নেহের টান স্থাপন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

একশো বছরের বেশি সময় ধরে অগুনতি ঘটনাবহুল সময়ের সাক্ষী। তারই সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে, ১৯০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ‘দ্য নোবেল ফাউন্ডেশন’-ও স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছে ৯৭৫ জন নোবেলজয়ীর (Nobel Laureates) নাম। এবং ১৯০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৬০৯ টি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে কখনও কখনও একটি নোবেল প্রাইজ একজনই পেয়েছেন, সেই সংখ্যাটি ৩৫৩ জন। কখনও বা একটি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন দুই ব্যক্তি (১৪৬ জন), আবার কখনও তিন ব্যক্তি (১১০ জন)।

‘দ্য নোবেল ফাউন্ডেশন’-এর নিয়ম বলছে “A prize amount may be equally divided between two works, each of which is considered to merit a prize. If a work that is being rewarded has been produced by two or three persons, the prize shall be awarded to them jointly. In no case may a prize amount be divided between more than three persons.”

এ যাবৎ, অর্থাৎ ১৯০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৫৮ জন মহিলা। নোবেলজয়ীদের মধ্যে কনিষ্ঠতম মালালা ইউসুফজা়ই, যিনি মাত্র সতেরো বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন (নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৪)।

বামদিক থেকে লরেন্স ব্র্যাগ (ব্রিটিশ পদার্থবিদ) এবং মালালা ইউসুফজা়ই

পদার্থবিদ্যায় সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ। ১৯১৫ সালের ঘটনা। বয়স তখন তার মাত্র পঁচিশ। আর সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পেয়েছিলেন জন গুডেনহ। তখন তাঁর বয়স সাতানব্বই। খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়, ২০১৯ সালেই তিনি আর্থার আশকিনের তৈরি সমস্ত রেকর্ড ভেঙেছিলেন। আর্থার পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান ছিয়ানব্বই বছর বয়সে, ২০১৮ সালেই।

ছবিতে জন গুডেনহ (উৎস: দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো)

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডিম্বাণু আর শুক্রাণু ছাড়াই তৈরি হচ্ছে ভ্রূণ! আশ্চর্য আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের

গবেষকরা ডিম্বাণু ও শুক্রাণু ছাড়াই, কেবল স্টেম সেল থেকে তৈরি করলেন সম্পূর্ণ একটি ভ্রূণ।

কোনও কোনও বছরে নোবেল পাননি একজনও! হ্যাঁ, এমন সময়ও গেছে যখন নোবেল পুরস্কার দেওয়াই হয়নি। এবং সেটা একবার-দু’বার নয়, ঊনপঞ্চাশবার। এবং এই সময়গুলোর বেশিরভাগ বছরগুলো জুড়েই চলেছে বিশ্বযুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ অবধি; এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ অবধি। ‘দ্য নোবেল ফাউন্ডেশন’-এর নিয়ম বলছে, “If none of the works under consideration is found to be of the importance indicated in the first paragraph, the prize money shall be reserved until the following year. If, even then, the prize cannot be awarded, the amount shall be added to the Foundation’s restricted funds.”

নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান

১৯০১ সাল থেকে দুই ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যার করেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন হলেন, জ্যাঁ-পল সাঁত্রে; যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন ১৯৬৪ সালে। সেই সময়ে তিনি রকমের আনুষ্ঠানিক ভাবে দেওয়া সমস্ত পুরষ্কারকেই প্রত্যাখ্যান করছিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন লে ডাক ঠো। ১৯৭৩ সালে লে এবং হেনরি কিসিংগার যুগ্মভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ভিয়েতনাম শান্তি চুক্তির আহ্বান করার জন্য। লে ডাক ঠো ভিয়েতনামের তৎকালীন অবস্থাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

ছবিতে লে ডাক ঠো

তবে স্বেচ্ছায় প্রত্যাখ্যান না করলেও, নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে বাধ্য করা হয়েছিল একাধিক ব্যক্তিত্বকে। হিটলার নিজেই রিচার্ড কুন, অ্যাডল্ফ বুটেনাড, এবং গেরহার্ড ডোম্যাককে নোবেল পুরস্কার নিতে নিষেধ করেছিলেন।

বামদিক থেকে গেরহার্ড ডোম্যাক (জার্মান প্যাথোলজিস্ট এবং ব্যাক্টেরিওলজিস্ট) এবং রিচার্ড কুন (অস্ট্রিয়ান-জার্মান জৈবরসায়নবিদ)

১৯৫৮ সালে রুশ কবি বোরিস প্যাস্টেরনাক সাহিত্যে নোবেল লাভ করেন। প্রাথমিক ভাবে নোবেল পুরস্কার নিলেও, সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের চাপে পড়ে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হন।

বামদিক থেকে অ্যাডল্ফ বুটেনাড (জার্মান জৈবরাসায়নবিদ) এবং বোরিস প্যাস্টেরনাক (রুশ কবি)

চলতি বছরে কবে কোন বিষয়ের নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে?

ইতিমধ্যেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ অক্টোবর অর্থাৎ মঙ্গলবার পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ীদের নাম প্রকাশিত হবে। পদার্থবিদ্যার কোন শাখার গবেষকের (বা গবেষকদের) মাথায় চড়তে চলেছে সেই মুকুট, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা তুঙ্গে। রসায়নে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা হবে ৫ অক্টোবর, বুধবার। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার যথাক্রমে সাহিত্যে নোবেলজয়ী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। সব শেষে ১০ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে চলেছে নোবেল প্রাইজ় কমিটি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।