রাশিয়ার কাছে আজও 'খলনায়ক', কেন সব সময়ে বিতর্কিত মিখাইল গর্বাচভ?

রাশিয়ার নাগরিকের কাছে 'স্বপ্নভঙ্গের খলনায়ক' হলেও ব্যতিক্রমী রাজনীতিক হিসেবে রাশিয়ার ইতিহাসে থেকে যাবেন মিখাইল গর্বাচভ।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
রাশিয়ার কাছে আজও 'খলনায়ক', কেন সব সময়ে বিতর্কিত মিখাইল গর্বাচভ?

অখণ্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ প্রয়াত হয়েছেন বুধবার সকালে। দীর্ঘদিন রোগে ভুগে অবশেষে ৯১ বছর বয়সে মস্কোর এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। গর্বাচভ বরাবরই রাশিয়া তথা বিশ্বের রাজনীতির বর্ণময় চরিত্র। আজীবন কমিউনিজমে বিশ্বাস করেও তিনি ছিলেন স্বাধীন মুক্তচিন্তার সমর্থক। তাঁর হাত ধরেই সোভিয়েতের আদর্শের বজ্র আঁটুনিতে প্রবেশ করেছিল মুক্তচিন্তা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কও কম হয়নি তাঁকে নিয়ে। খোদ নিজের দেশ রাশিয়াতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন খলনায়ক।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১৯৩১-এর ২ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়নের ইয়েগর্লিক নদীর তীরে এক ছোট্ট গ্রাম প্রিভলনোয়ে তাঁর জন্ম হয়। বাবা-মা দু'জনেই খামারে কাজ করতেন।

সেখান থেকে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেই কমিউনিজমের হাতে-খড়ি হয় গর্বাচেভের। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে স্নাতক হন তিনি। সোভিয়েতের নেতা স্টালিনের মৃত্যুর পরেই তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভের হাত ধরে গর্বাচেভ বামপন্থী রাজনীতির পুরোভাগে চলে আসেন। ১৯৭০ সালে প্রথম পার্টির লোকাল কমিটির সেক্রেটারি পদে মনোনীত হন গর্বাচেভ। তারপর থেকে আর তাঁকে পিছনে তাকাতে হয়নি। দক্ষ সংগঠক হিসেবে ১৯৭৮-এ মস্কো কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে মনোনীত হন তিনি। তার কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৭৯-তে সদস্য হন গভর্নিং পলিটব্যুরোর। এরপরেই ক্রুশ্চেভের মৃত্যুর পর সোভিয়েতের প্রেসিডেন্ট পদে কে বসবেন, তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। অবশেষে ১৯৮৫ সালে গর্ভনিং পলিটব্যুরোর সিদ্ধান্তে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন মিখাইল গর্বাচভ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ 'ট্র‍্যাজিক হিরো'

ক্ষমতায় এসেই পূর্বসূরিদের থেকে অনেকখানি অন্যরকম নীতি গ্রহণ করলেন গর্বাচেভ। আটের দশকের শেষ দিক থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার ছোট ছোট দেশগুলি গণতন্ত্রের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রশাসক হিসেবে গর্বাচভ সেই দাবিকে দমন করার কোনও চেষ্টাই করেননি। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই গর্বাচভের বিভিন্ন বিবৃতিতে জনপ্রিয় হয় দু'টি শব্দ। একটি Glasnost এবং অন্যটি Perestrokiya। প্রথম শব্দটির অর্থ হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তা এবং দ্বিতীয়টির অর্থ হলো পরিবর্তন ও পুনর্গঠন। বাস্তবেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পুনর্গঠনের দিকে মন দিয়েছিলেন গর্বাচভ।

অতীতে সোভিয়েতের ভেতর থেকে যখনই কোনও বিরোধী স্বর উঠে এসেছে, তার কন্ঠ রোধ করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট সরকার। ১৯৫৬-তে যখন হাঙ্গেরি কিংবা ১৯৬৮-তে যখন চেকোস্লোভাকিয়া বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, তা প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ করে বন্ধ করেন সোভিয়েতের শাসকরা। এইসব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম গর্বাচেভ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলির পরেই আলাদা হয়ে যায় জার্মানি। পূর্ব জার্মানির দখল থাকে সোভিয়েতের হাতে।

মাঝে ওঠে বার্লিন ওয়াল। অবশেষে গর্বাচেভ জমানার শেষের দিকে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর সংযুক্ত হয় পূর্ব ও পশ্চিম জার্মান। পতন হয় বার্লিন ওয়ালের। প্রশাসক হিসেবে চাইলেই সেনা পাঠিয়ে জার্মানির অধিকারের লড়াই লড়তে পারতেন গর্বাচভ। কিন্তু সেদিন দুই জার্মানির মিলনের বিনা বাধায় মেনে নিয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যে ঠান্ডা যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে সোভিয়েত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলে আসছিল, এই ঘটনা তার ইতি টানে। একফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে ও সেই দিন ঠান্ডা যুদ্ধের যবনিকা টেনেছিলেন গর্বাচভ। কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভালো চোখে নেয়নি সোভিয়েতের মানুষ। ফলে নিজের দেশেই সেদিন কলঙ্কিত হয়েছিলেন তিনি। এই পথ ধরেই আরও ইউক্রেন, পোল্যান্ডের মতো বিভিন্ন দেশ সোভিয়েত থেকে বেরিয়ে আসে। ডিসেম্বর ১৯৯১-এ সোভিয়েতের পতন হয়। দীর্ঘ ৭৪ বছর আগে কমরেড লেনিনের হাত ধরে যাত্রা শুরু করেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৯১-এর ২৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ রাষ্ট্রনায়ক গর্বাচভের হাত দিয়ে শেষ হয় সেই যাত্রা।

হিংসার থেকে শান্তিকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছিলেন গর্বাচভ যে, তাঁর জমানাতেই দুই যুযুধান সোভিয়েত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি সম্পাদিত হয়। শান্তিরক্ষায় তাঁর অবদানের জন্য ১৯৯০ সালে পান নোবেল শান্তি পুরস্কার।

সোভিয়েত ইউনিয়নের উদারীকরণ

ক্ষমতায় এসেই সোভিয়েতের অর্থনীতির অচলায়তন ভাঙতে সচেষ্ট হয়েছিলেন গর্বাচেভ। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাজারকে উন্মুক্ত করতে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগে উৎসাহ দিয়েছিলেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে উদার অর্থনীতি চালু করতে গিয়ে ১৯৯৭-এর দিকে বিদেশি কোম্পানি পিৎজা হাটের বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন স্বয়ং গর্বাচেভ। তাঁর মনে হয়েছিল, সোভিয়েত অর্থনীতির দরজা উন্মুক্ত না করলে একসময় তা ধ্বসিয়ে দেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে।

রাশিয়ার নাগরিকের কাছে তাই 'স্বপ্নভঙ্গের খলনায়ক' হলেও ব্যতিক্রমী রাজনীতিক হিসেবে রাশিয়ার ইতিহাসে থেকে যাবেন মিখাইল গর্বাচভ।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।