প্যালেস্টাইনের সাংবাদিকদের জেলবন্দির যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার তথ্য সামনে এল
Palestinian Journalists Detained Without Charge: নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক সুরক্ষা সংগঠন Committee to Protect Journalists-এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে অন্তত ৯০ জনের বেশি প্যালেস্তাইনের সাংবাদিক এই আইনের আওতায় আটক হয়েছেন। তাঁদের অনেকের অভিযোগ, বন্দিত্বের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ।
কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই, নেই প্রকাশ্য বিচারও— তবু মাসের পর মাস জেলবন্দি। ‘প্রশাসনিক আটক’ নামে পরিচিত এই আইনি ব্যবস্থাকে ঘিরে বহুদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে গাজা-ইজরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। নিউইয়র্কভিত্তিক সাংবাদিক সুরক্ষা সংগঠন Committee to Protect Journalists-এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে অন্তত ৯০ জনের বেশি প্যালেস্টাইনের সাংবাদিক এই আইনের আওতায় আটক হয়েছেন। তাঁদের অনেকের অভিযোগ, বন্দিত্বের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ।
সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। আর যুদ্ধের মধ্যে কাজ করা মানে প্রতিদিন রীতিমত প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়েই মাঠে নামা। তবু গাজার বহু সাংবাদিক নিজেদের জীবন বাজি রেখে বোমাবর্ষণ, ধ্বংসস্তূপ, হাসপাতালের করুণ দৃশ্য, শরণার্থী শিবিরের বাস্তব পরিস্থিতি— সবই তুলে ধরছিলেন বিশ্বের সামনে। সেই মানুষগুলিই যখন আটক হলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই পরিষ্কার করে জানানো হয়নি।
সিপিজের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে অন্তত ৯০-এর বেশি প্যালেস্টাইনের সাংবাদিককে কোনো না কোনো সময়ে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ জন মুক্তি পেয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কেউ বলেছেন, গ্রেফতারের মুহূর্তেই তাঁকে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়। কারও চোখ বেঁধে হাত পিছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ আবার জানিয়েছেন, জেরা চলাকালীন বারবার মাথায় আঘাত করা হয়েছে। অনেকের শরীরেই সেই ক্ষতের চিহ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতন ছিল শুধু তথ্য আদায়ের জন্য নয়; কখনও কখনও তা ছিল ভয় দেখানোর জন্য, কখনও অপমান করার উদ্দেশ্যে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে খাদ্য ও চিকিৎসা বঞ্চনার প্রসঙ্গে। একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, তাঁদের নিয়মিত পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়নি। অনেকে উল্লেখ করেছেন, কয়েক মাসে তাঁদের শরীরের ওজন অনেকটাই কমে যায়। সিপিজের তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকজনের শরীরের ওজন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কিলোগ্রাম পর্যন্ত কমে গিয়েছে। অপুষ্টি, দুর্বলতা ও রক্তাল্পতার লক্ষণ দেখা দিলেও যথাযথ চিকিৎসা মিলেনি, এমন দাবিও করেছেন অনেকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Gaza Conflict : প্রিয় পোষ্য, বাসনপত্র, পরিবার সব একসঙ্গে নিয়ে একটাই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে পালাচ্ছেন। সেই গাড়ির চালকও পালাচ্ছেন।
চিকিৎসা বঞ্চনার অভিযোগও কম নয়। কারও মাথায় চোট লেগেছে, কারও পাঁজরের হাড় ভেঙেছে— তবু প্রয়োজনীয় এক্স-রে বা অস্ত্রোপচার করা হয়নি বলে অভিযোগ। কিছুজনের কথায়, ডাক্তার দেখানো হলেও চিকিৎসা করা হয়েছে খুবই সামান্য এবং প্রয়োজনীয় যত্নের অভাব ছিল। এই অভিযোগগুলি যদি সত্য হয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
আরও ভয়াবহ অভিযোগ এসেছে যৌন সহিংসতার প্রসঙ্গে। কয়েকজন সাংবাদিক দাবি করেছেন, তাঁদের শারীরিকভাবে অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেউ জানিয়েছেন, অপমানজনকভাবে পোশাক খুলিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। আবার কেউ সরাসরি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।
প্রশাসনিক আটক পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এই আইনের আওতায় কাউকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর আটক রাখা সম্ভব। মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, এই ব্যবস্থার অপব্যবহার হলে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগ আরও উদ্বেগজনক, কারণ এতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ অতীতে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজনে আটক করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা হয়। তবে সিপিজে মনে করছে, অভিযোগের সংখ্যা ও ধারাবাহিকতা এত বেশি যে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক তদন্ত এখন অত্যন্ত জরুরি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel-Gaza War: গত সাত দিনে অন্তত পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে গাজায়। বাবা-মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তাঁদের সন্তানকে চারপাশের পরিস্থিতি থেকে, অসংখ্য মৃত্যুমিছিলের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর। কিন্তু তেমনটা ঘটছে না আদপেই।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ শুধু মানবাধিকার প্রশ্ন নয়; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নও। যুদ্ধের সময় তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এখন যেন ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছে। কে কী দেখাবে, কোন ছবি বাইরে যাবে আর কার কথা মানুষকে শোনানো হবে— এসব নিয়েই তৈরি হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধ।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইজরায়েল গাজায় বাইরের দেশের সাংবাদিকদের ঢুকতে দিচ্ছে না। এর ফলে গাজায় সিংহভাগই প্যালেস্টাইনের সাংবাদিকরাই গ্রাউন্ড রিপোর্টিং করতে পারছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে ২০০ জনই প্যালেস্টাইনের।
গাজার নিহত সাংবাদিকদের আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, তা যুদ্ধাপরাধের মধ্যেও পড়তে পারে, যদি প্রমাণিত হয়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না। আটক সাংবাদিকদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হবে কি না। আর ভবিষ্যতে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজায় সাংবাদিকদের হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। প্যালেস্টাইনের এক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ দ্য কনর্ভার্সেশন-কে বলেন, সাংবাদিকদের উপর হামলা ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ইজরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকেই, মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সেন্সরশিপ আনা হয়। ওই বছরেরই অগাস্টে, ইজরায়েলি সেনাবাহিনী ধারা ১০১ জারি করে প্যালেস্টাইনে রাজনৈতিক সমাবেশ এবং প্রচারমূলক প্রকাশনাগুলিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা শুরু করে। সে সময় সমস্ত প্যালেস্টাইন সংবাদমাধ্যমগুলিকে ইজরায়েল কর্তৃপক্ষের কাছে দুটি করে মুদ্রণ কপি জমা দিতে হত। তবে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও, স্থানীয় সাংবাদিকতা টিকে ছিল এবং তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধিও পেয়েছিল।
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে প্যালেস্টাইনবাসী প্রথম ইজরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহের প্রথম বছরেই , ইজরায়েলি বাহিনী ৪৭ জন প্যালেস্টাইন সাংবাদিককে আটক করে, আটটি স্থানীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে, দুটি পত্রিকার লাইসেন্স বাতিল করে এবং চারটি প্রেস সার্ভিস অফিস বন্ধ করে দেয়।
অনেকেই মনে করেছিলেন, ইজরায়েল এবং প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থার মধ্যে হওয়া অসলো চুক্তি হয়তো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু তা হয়নি। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে প্যালেস্টাইনে নতুন কর্তৃপক্ষ আসে, এরা অস্থায়ী ভিত্তিতে প্যালেস্টাইনেকে আংশিকভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরাও আবার নিজস্ব একটি সেন্সরশিপ ব্যবস্থা আনে। যে সংবাদমাধ্যমগুলিকে সমালোচনামূলক বলে মনে করা হতো, তাদের সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হতো, এমনকি কিছু সংবাদমাধ্যমকে বন্ধও করে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৭ সাল থেকে শুরু করে প্রথম ইন্তিফাদা, তারপর অসলো চুক্তির পরবর্তী সময়— প্রতিটি পর্বেই সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি বারবার সামনে এসেছে। তবে নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন Committee to Protect Journalists যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা আবারও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি আরও চিন্তার। গাজায় বাইরের দেশের সাংবাদিকদের প্রবেশ প্রায় বন্ধ। ফলে সেখানকার ঘটনাগুলি বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব এখন মূলত স্থানীয় প্যালেস্তাইনের সাংবাদিকদের উপরেই। গাজার সাংবাদিকদের এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বোমা আর বন্দুকের শব্দের আড়ালে নীরবে চলে আরেকটি লড়াই— সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই, মানুষের সামনে বাস্তব তুলে ধরার লড়াই






