এই মৃত্যু যেন আপনার ঘুম কেড়ে নেয়...

Israel Gaza Conflict : প্রিয় পোষ্য, বাসনপত্র, পরিবার সব একসঙ্গে নিয়ে একটাই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে পালাচ্ছেন। সেই গাড়ির চালকও পালাচ্ছেন।

Noor Alsaqqa
৩ মিনিট
এই মৃত্যু যেন আপনার ঘুম কেড়ে নেয়...

এত অসহায় কখনও লাগেনি! এত হিংস্রও মনে হয়নি নিজেকে কখনও। নিজের চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমাদের জীবনের কোনও মূল্য নেই। এক সপ্তাহ হয়ে গেল। প্রতিটা দিন বোমার আওয়াজে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসছি। ইজরায়েলের থেকে নির্দেশ এসেছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খালি করে দিতে হবে গাজার উত্তর এলাকা। এখানে নাকি সাধারণ মানুষের বাড়ির নীচে নীচে হামাসের জঙ্গিরা আশ্রয় নিয়ে রয়েছে। জঙ্গিদের শেষ করতে হলে ধ্বংস করে দিতে হবে সব। মানুষ পালাচ্ছে, কোথায় যে পালাচ্ছে কে জানে! কীভাবে পালানো সম্ভব সব ছেড়ে? এখানে হাসপাতালগুলো পর্যন্ত বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে! অবশ্য হাসপাতাল থেকেই বা কী? জরুরি কোনও পরিষেবা, ওষুধ, রক্ত কিছুই তো পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে। ওষুধ নেই, জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই। এই নেই রাজ্যে ক'দিনই বা বাঁচবে মানুষ?

আমরা কিছুক্ষণ আগে পৌঁছেছি আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে। এখানে সামান্য খাবার জল এখনও রয়েছে। আমি ২৪ ঘণ্টা কোনও খবর দেখিনি, আমি জানি না আমার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কারা বেঁচে আছেন এখনও। আমাদের কাছে এখন একটাই প্রত্যাদেশ। বাঁচতে হলে গাজা স্ট্রিপ ছাড়তে হবে আর গাজায় থাকলে কোনও অস্তিত্বই রইবে না। আমাদের আশা ক্রমেই নিভে আসছে, ফোনে চার্জও বেশিক্ষণ রইবে না জানি। একটু বাদেই আমি সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। এমন দিন যে আসতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। গোট বিশ্ব দেখুক, আমাদের সঙ্গে কী অন্যায় হচ্ছে। আমাদের কোনও আত্মীয় যদি এখন মরতে বসেন, তাঁকে হাসপাতালেও পাঠানো যাবে না। তিলে তিলে মরতে দেখতে হবে, কারণ হাসপাতালে না আছেন ডাক্তার, না আছেন কোনও কর্মী, না আছে পর্যাপ্ত ওষুধ!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হাসপাতাল থেকে আর কখনও ফিরবে বাবা? গাজায় পথ চেয়ে একরত্তি মেয়ে

Israel-Gaza War: গত সাত দিনে অন্তত পাঁচশো শিশুর মৃত্যু হয়েছে গাজায়। বাবা-মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তাঁদের সন্তানকে চারপাশের পরিস্থিতি থেকে, অসংখ্য মৃত্যুমিছিলের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর। কিন্তু তেমনটা ঘটছে না আদপেই।

অনেকক্ষণ কোনও ইন্টারনেট ছিল না, সামান্যক্ষণ হলো নেটওয়ার্ক পেয়েছি। তাই লিখতে পারছি। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার। আবার নেটওয়ার্ক চলে যাবে জানি। এখানে কী চলছে, গাজার মানুষ কীভাবে দিন কাটাচ্ছে কেউ বুঝতেই পারবেন না হয়তো! মৃত্যুর ভয়, পরিবারের দায়িত্ব, নিজের প্রাণ, সন্তানের যত্ন, সমস্ত মাথায় নিয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটানো কাকে বলে আমরা বুঝছি। আসলে গাজা জুড়ে এথনিক ক্লিনজিং চলছে, সারা বিশ্বের সামনে প্রকাশ্যে নির্মূল করার কাজ চলছে। একটি সভ্য বিশ্বে এই ঘটনা ঘটছে। ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটতে চলেছে বিশ্বের চোখের সামনে। এই হচ্ছে বাস্তবতা, এই হচ্ছে গাজার মানুষদের এই মুহূর্তের অবস্থা। গাজা পৃথিবীর অন্যতম ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চল, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল এটিই। এখানে কী ঘটতে পারে অনুমান করতেও কি পারবেন আপনারা?

সবাই ভাবছেন, ইজরায়েল আগে থেকে জানান দিয়ে, এই মানুষদের উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণে সরে যেতে বলে প্রাণ বাঁচাতে চাইছে নিরস্ত্র মানুষদের। আসলে কী চলছে জানেন? যে সব মানুষদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে, যারা বিদেশি রয়েছেন এখানে, কেবল তাঁদেরই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের মতো বাকিরা, তাঁদের কোনও মূল্য নেই। আমাদের কথা কে ভাববে? আমরা কোথায় যাব? কোথায় নিরাপদে জল পাব, খাবার পাব? কেউ ভাবছেন না। ভাববেনই বা কেন, এভাবেই তো সারা পৃথিবী চলে। গাজা কি কোনও ব্যাতিক্রম নাকি!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হুইলচেয়ারে বসেই পাথর ছুড়ে প্রতিবাদ! বিশ্বকে ধাক্কা দেয় প্যালেস্তাইনের যে লড়াই

Israel Palestine War : গাজা উপত্যকা এবং ইজরায়েলের মধ্যে চলা যুদ্ধে হুইলচেয়ারে বসা এক প্রতিবন্ধী প্যালেস্তিনিয়কে পাথর ছুড়তে দেখা যায়।

গাজা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। একে একে করে সমস্ত পাড়া গুঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখছি, প্রতিবেশীদের চিৎকার, কান্না শুনছি। মনে হচ্ছে, চুপচাপ, সমস্ত আশা জলাঞ্জলি দিয়ে বসে আছি কখন আমার ঠিক পাশে বোমা পড়বে, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাব সবাই। আশ্চর্য দিন কাটছে, আশ্চর্যতম রাত। যাঁদের নিজস্ব গাড়ি আছে তাঁরা সেই গাড়িতে, কেউ ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, যাঁদের সামর্থ্য নেই তাঁরা পায়ে হেঁটেই পালাতে চাইছেন, ছুটছেন রুদ্ধশ্বাস। সকলে শহর ফাঁকা করে প্রাণ বাঁচাতে চাইছেন। প্রিয় পোষ্য, বাসনপত্র, পরিবার সব একসঙ্গে নিয়ে একটাই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে পালাচ্ছেন। সেই গাড়ির চালকও পালাচ্ছেন। তিনিও কিন্তু আর সওয়ারি তুলতে ফিরে আসবেন না। একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল ইরাকের সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে এই অন্যায় করে যাওয়ার মাশুল দিতে হবেই। একদিন গোটা বিশ্বের সামনে নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে।

আমি জানি আমি প্রচণ্ড বিধ্বস্ত হয়ে আছি। মৃত্যুর এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বোধহয় সংযম রাখা যায় না। এত কাছ থেকে মানুষকে নিশ্চিহ্ন হতে দেখলে, শিশুদের শেষ হয়ে যেতে দেখলে, নিজের সমস্ত আশা, ভালোবাসাকে গণকবরে যেতে দেখলে বোধহয় খুব গুছিয়ে কথা বলা যায় না। আমি এই মুহূর্তে চাইছি, এই যে আপনাদের মোবাইলে, টিভির পর্দায় আমাদের মৃত্যুর, আমাদের ধ্বংসের ছবি প্রতিনিয়ত ভেসে উঠছে, তা যেন আজীবন আপনাদের জ্বালিয়ে মারে, আজীবন শান্তিতে জিরোতে না দেয়।

লিখেছেন
Noor Alsaqqa
Noor Alsaqqa
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।