লক্ষকণ্ঠে গীতাপাঠের আয়োজক ঠিক কারা, নেপথ্যে রয়েছে যে রাজনৈতিক ইতিহাস
Geetapath: একদা সংঘ-ত্যাগী তপন ঘোষের সংসার আবার ফিরে এসেছে সংঘের ঘরে।

ত্রিবেণীতে কুম্ভমেলা থেকে বিগ্রেডে লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ, একের পর এক অনুষ্ঠান আয়োজন করে চলেছে কিছু সনাতনী সংস্থা। এই সংগঠনগুলির দীর্ঘ কয়েক বছরের ইতিহাস আছে। বাংলায় এই সংগঠনগুলির সূচনা একরকম তপন ঘোষের হাত ধরেই। ২০০৮ সালে আরএসএস থেকে বেরিয়ে এসে তপন ঘোষ হিন্দু সংহতি তৈরি করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) পঁচিশ বছরের প্রচারক। জরুরী অবস্থার সময় তিনি জেলও খেটেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় কাজ করছেন। কাশ্মীর নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। উত্তর ভারতের অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের দায়িত্বে তখন তিনি।
এহেন তপন ঘোষ হঠাৎ আরএসএস ছাড়লেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, বাংলার আরএসএস বড্ড নরম। বাংলার আরএসএস যথেষ্ট উগ্র নয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় যখন আরএসপি-র সঙ্গে আরএসএসের বিরোধ বাঁধে, তখন তপন ঘোষ সেখানে সংগঠনের দায়িত্বে। একটি ঘটনায় তিন চারজন স্বয়ংসেবক মারা যান। সে সময় তপন ঘোষ যেভাবে আরএসএসকে মাঠে নামানোর চেষ্টা করেছিলেন, ততখানি আগ্রাসী ভূমিকা আরএসএস নেয়নি। এইসব নিয়ে তাঁর ক্ষোভ থেকেই আরএসএস ছেড়ে বেরিয়ে আসা।

হিন্দুত্ববাদী নেতা তপন ঘোষ
তপন ঘোষ আরএসএসের কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা। ২০০৮-এ তিনি নিজের সংগঠনও করলেন তিনি কট্টরপন্থী ধাঁচে। ২০০৯ থেকে প্রতিবছর ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ধর্মতলায় তাঁরা প্রোগ্রাম করতেন এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী বার্তা দিতেন। সেই সময় মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রধান স্বামী প্রদীপ্তানন্দ আসতেন অনুষ্ঠানে। আগুনঝরা বক্তৃতা দিতেন। তখনও বাম আমল। তৃণমূল পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে সেই শাসনে একটা ধাক্কা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তখনও ২০১১-তে কী হবে আমরা কেউ জানিনা। কেন্দ্রে ২০০৯-এ ইউপিএ আবার ফিরে এসেছে, বিজেপি কিছু করতে পারেনি। অথচ সেই সময়ে ধর্মতলায় প্রতিবছর হিন্দু সংহতির সভা হচ্ছে। এমনকি ২০১১-২০১২-তে গোয়া থেকে সনাতন সংস্থা, হিন্দু জন জাগৃতির নেতারাও সেখানে বক্তৃতা দিতে আসছেন।
যে সময় বাংলায় বিজেপি বা সংঘ অনেকখানি সাড়াশব্দহীন, খুব একটা কাজটাজ চোখে পড়ত না তাদের, সে সময় তপন ঘোষ তৃণমূল স্তরে কাজ করেছেন। গ্রামে গ্রামে হিন্দুত্বের হাওয়া তৈরি করেছেন। বাড়িয়েছেন সংগঠন। ২০১৪-র পর থেকে তপন ঘোষ একটু সঙ্কটে পড়লেন। বাংলায় চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটা অভাববোধকে তিনি কাজে লাগাচ্ছিলেন। কিন্দু নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি কেন্দ্র সরকারে আসার পর, সেটাই রাজনীতির মূলস্রোত হয়ে দাঁড়াল। ফলে ২০১৬-২০১৭-তে এসে তপন ঘোষের পক্ষে সংগঠন ধরে রাখাটাই দুরূহ হয়ে দাঁড়াল। লোকে তখন আর কেন হিন্দু সংহতি করবে? সে তো আরএসএসেই সেই উগ্র হিন্দুত্ব পেয়ে যাচ্ছে!

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Socio Political Economy of India: গত ৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার কলকাতার রায়া দেবনাথ মঞ্চে সারা বাংলা কর্পোরেট আগ্রাসন বিরোধী উদ্যোগে বক্তৃতা দেন সুমন কল্যাণ মৌলিক। সেই বক্তৃতার লিখিত সংরূপ ইনস্ক্রিপ্ট-এ ধরা রইল।
আগুনঝরা বক্তৃতা দিতেন তপন ঘোষ
এর ফলস্বরূপ ২০১৮-২০১৯ সালে এসে হিন্দু সংহতির রাজনীতি অনেকখানি তৃণমূল ঘেঁষা হতে শুরু করে। তৃণমূলের প্রচণ্ড দাপট, এমন বহু অঞ্চলে গিয়ে তাঁরা সভা করে বলতে শুরু করলেন, মুসলমানরা তৃণমূলও করে, আবার জামাতের সদস্যপদও ছাড়েনা। আপনারা তৃণমূল করুন, হিন্দু সংহতিও করুন। একই মঞ্চে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা প্রসঙ্গে বিজেপির যারপরনাই সমালোচনা করেতে শুরু করেন।
সেই সময়ে আমাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তপন ঘোষ বলেন, উনি মমতাকে উন্নয়নের ব্যাপারে দশের মধ্যে সাত দিচ্ছেন। কারণ, যে রাজ্যের ৭০% মানুষ হিন্দু, সে রাজ্যের যদি অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, তবে তো লাভ আসলে হিন্দুরই। এ ঘটনাগুলো যখন ঘটছে, ওই ২০১৮-১৯ সাল নাগাদই 'হিন্দু সংহতি' ভেঙে যায়। তপন ঘোষ প্রথমে সংগঠন থেকে বেরিয়ে যান। তার পর হিন্দু সংহতি থেকে 'সিংহবাহিনী' নাম নিয়ে একটি বড় অংশ বেরিয়ে যায়। এরপর তপন ঘোষ ঘোষণা করেন, হিন্দু সংহতি পুরোপুরি বিজেপির হাতে চলে গিয়েছে, তাই তিনি সংগঠনটিই ভেঙে দিচ্ছেন।
দশ বছর ধরে লাগাতার কাজ করে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত জুড়ে যে হিন্দুত্ববাদের জমি তিনি তৈরি করেছিলেন, তার বহর নেহাত কম না। ২০১৯-২০২০ সালে সংগঠনের সঙ্গে সংস্রব না রাখার কারণে, এবং ২০২০-র করোনাকালে তপন ঘোষের মৃত্যুর কারণে এই বিরাট পরিমাণ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরিসরে একটা শূন্যতা তৈরি হল।
এই হিন্দুত্ববাদীরা তখন ক্ষমতাকে সামনে রেখে তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে গেল। একটা অংশ দেবতনু ভট্টাচার্যের সঙ্গেই থেকে গেল হিন্দু সংহতি নামে। অন্যদিকে দেবদত্ত মাজির নেতৃত্বে সিংহবাহিনী, যারা সরাসরি বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখল না। তারা অনেকটা তপন ঘোষের নীতি নিল। কিন্তু ২০২১-এর নির্বাচনের আগে দেবতনু এবং দেবদত্ত দুজনেই বিজেপিতে চলে আসেন এবং বিজেপির টিকিতে নির্বাচনে লড়েন। বিজেপির টিকিট পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় দেবতনু একবার হুমকি দেন হিন্দু সংহতি আলাদা ভাবে নির্বাচনে লড়বে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ক্ষমতাসীন দলের ‘অভিভাবক সংগঠন’-এর তরফে এই উপেক্ষা কি অবমাননাজনক নয়, উঠছে প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতিতে এই সংগঠনগুলির যে অংশ অরাজনৈতিক ভাবে হিন্দুত্ব প্রচার করতে চাইছিল, তারা আবার ভেঙে বেরিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রীয় সংহতি নামে একটি দল তৈরি করে। ত্রিবেণীর কুম্ভমেলা থেকে ব্রিগেডের গীতাপাঠ-এর নেপথ্যে সেই রাষ্ট্রীয় সংহতির সঙ্গে যুক্ত লোকেরাই। এরা হিন্দুত্বের প্রসারের কাজই করছে, কিন্তু নিজেদের অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি সামনে রাখছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ার মাসে ত্রিবেনীতে মানস ভট্টাচার্য একটি প্রেস কনফারেন্স করেন। এবং তাতে দাবি করা হয়, সেখানে ৭০০ বছর আগে নাকি কুম্ভমেলা হত। এটা তাঁরা নাকি একটা অক্সফোর্ডের থিসিস থেকে জেনেছেন। গবেষক অ্যালান মরিনিসের নাম আসে বক্তব্যে। এবং তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় ত্রিবেণীর উজ্জ্বল ইতিহাস। সেই মেলা নাকি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উদ্যোক্তারা তাকেই ফের চালু করছেন। এই ঘোষণার পরে সমাজমাধ্যমে প্রচার শুরু হয়, মুসলিম আগ্রাসনের কারণেই এই মেলা নাকি বন্ধ হয়ে যায়। এই নিয়ে বানানো একটা ইতিহাস লোকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। এমনকি একে বই আকারেও ছেপে ফেলা হয়। ২০২৩-এ সেটা কলেবরে আরও বাড়ে। নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসা আসে। অথচ এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। খোদ গবেষক অ্যালান মরিনিস সে কথা জানান। তাঁর থিসিসে ওই অতীতে ত্রিবেণী কুম্ভ মেলা হওয়া নিয়ে একটি মাত্র বাক্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর সেই মিথ্যেকে ভরকেন্দ্রে রেখে নানা সত্যি ইতিহাস জুড়ে এক অন্য বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়। পরে মিথ্যা রটনা ধরা পড়লে উদ্যোক্তারা বলেন, থিসিস তাদের কেউ বিকৃত অবস্থাতেই দিয়ে গিয়েছিল।

ত্রিবেণীতে কুম্ভমেলা
এর মধ্যেও দলাদলি বেড়ে চলে সনাতনীদের মধ্যে। রাষ্ট্রীয় সংহতি ও বাংলা আবার নামক দুটি হিন্দুত্ববাদী সংস্থার সঙ্গে যুক্তরা যখন ত্রিবেণীর অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে চাঁদা তুলছিল, তখন বিদেশের হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল অংশটির কাছ থেকে তোলা চাঁদা নিয়ে কিছু একটা গণ্ডগোল হয় বলে শোনা যায়। যদিও কারণ খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু তখন মানস ভট্টাচার্য, প্রদীপ্তানন্দরা নদীর ওপারে কল্যাণীতে গিয়ে শুরু করলেন নতুন দল। নাম দিলেন সনাতন সংস্কৃতি সংসদ। সাধু সন্ন্যাসীদের সংগঠন হিসেবেই এটা পরিচিত। ফলে, ২০২৩-এ রাজ্যে দুটি কুম্ভ মেলা হল। একটি ত্রিবেণীতে, যেটায় তৃণমূল পরিচালিত বাঁশবেড়িয়া পুরসভাকে সামনে রেখে আসল পরিচালনা করে ‘বাংলা আবার’ এর সাথে যুক্ত তপন ঘোষের অনুরাগীরা, আরেকটি কল্যাণীতে, সনাতন সংস্কৃতি সংসদের নামে।
এই লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠের আসরের আয়োজক তাঁরাই, যাঁরা প্রথমে ত্রিবেণী কুম্ভ মেলা চালু করে তারপর আবার কল্যাণীর মেলাটি চালু করেন।
এ-বছর ফেব্রুয়ারিতে অবশ্য একটি ফেসবুক পোস্টে মানস ভট্টাচার্য লেখেন, ২০২২ এর ত্রিবেণী কুম্ভ মেলা সফল হয় মাথার ওপর “স্বামী প্রদীপ্তানন্দ, স্বামী নির্গুণানন্দ, বন্ধুগৌরব, সর্বানন্দ ও আরো অনেক মহারাজের” আশীর্বাদ থাকায়। এর পর রাষ্ট্রীয় সংহতির “সনাতনী যোদ্ধাদের হাতে ত্রিবেণীকুম্ভ সুরক্ষিত” মনে হওয়ায় তাঁরা “প্রদীপ্তানন্দ, নির্গুণানন্দের নির্দেশে নতুন একটি জায়গাকে সনাতনী জাগরনের জন্য” বেছে নেন। “কোনও দ্বন্দ্ব কোথাও নেই। অহেতুক কেউ দ্বন্দ্বের কথা রটাবেন না,” মানস বাবু লেখেন, এবং বলেন যে আগামী দুই বছরের মধ্যে “মধ্যযুগের হারিয়ে যাওয়া এমন বহুস্থানেই” নানা আয়োজন হবে প্রদীপ্তানন্দ, নির্গুণানন্দের মত “তেজস্বী” সন্ন্যাসীদের আশীর্বাদে। “হয়তো এর চেয়েও বড় কোন উৎসব হবে মধ্যযুগে ধ্বংসপ্রাপ্ত বা হারিয়ে যাওয়া আপনার জেলার কোন স্থানে।”
২০২২ এ ত্রিবেণীতে আমি এবং আমার কয়েকজন সনাতনী যোদ্ধার সহযোগিতায় ৭০৩ বছর পর ত্রিবেণীতে কুম্ভ শুরু করেছিলাম। কাজটা সহজ ছিল না। সমস্ত তথ্যপ্রমান দেখিয়ে তবে পৌরসভা ও প্রশাসনের অনুমতি মিলেছিল। তা অভূতপূর্ব সফল হবার কারন স্বামী প্রদীপ্তানন্দ, স্বামী নির্গুণানন্দ, বন্ধুগৌরব, সর্বানন্দ ও আরো অনেক মহারাজের হাত আমাদের মাথায় ছিল। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল।
এখন, এই গীতা পাঠের অনুষ্ঠান, যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসার কথা, তার মূল উদ্যোক্তা এই মানস ভট্টাচার্য, প্রদীপ্তানন্দ, বন্ধুগৌরব ব্রহ্মচারী, নির্গুণানন্দরাই। এঁরা সবাই আরএসএস-এর ঘনিষ্ঠও বটে, আর সংঘ পরিবারের সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-ও এই অনুষ্ঠান সফল করতে মাঠে নেমেছে।
এভাবেই একদা সংঘ-ত্যাগী তপন ঘোষের সংসার আবার ফিরে এসেছে সংঘের ঘরে।






