দুই হাত মাথার উপরে তুলে রাখতেন সব সময়! ব্রিটিশদের 'গুপ্তচর' ছিলেন এই সন্ন্যাসী?

Pran Puri The Spy Monk: কোম্পানি নেপালে কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রাণ পুরীকে ব্যবহার করেছিল।

inscript
৩ মিনিট
দুই হাত মাথার উপরে তুলে রাখতেন সব সময়! ব্রিটিশদের 'গুপ্তচর' ছিলেন এই সন্ন্যাসী?

দুই ফকিরের আখ্যান। সাল ১৭৯৭। এশিয়াটিক রিসার্চেসে এই নামেই এক প্রবন্ধ প্রকাশিত হলো। লেখক বম্বের গভর্নর জোনাথন ডানকান। ১৭৮৭ সাল থেকে ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত বেনারসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্ট বা কূটনৈতিক প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলেন এই ডানকান। ১৭৮৪ সালে ডানকান এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিলেন এবং ১৭৯১ সালে বারাণসী সংস্কৃত কলেজ স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। ওই প্রবন্ধটিতে বারাণসীর একজন সাধুর জীবনের কথা লিখে গেছেন ডানকান। প্রাণ পুরী, এই নামেই সাধুকে ডাকতেন মানুষজন। তবে ডানকানেরও আগে কোম্পানির প্রাক্তন আধিকারিক ফ্রান্সিস উইলফোর্ডের কাছ থেকে প্রাণ পুরীর কথা শোনা যায়। ফ্রান্সিস বারাণসীতেই নিজের অবসর জীবন কাটাতেন। তিনি বলেছিলেন, যোগী প্রাণ পুরী এমন একজন তপস্বী ছিলেন, যিনি উর্ধ্ববাহু! অর্থাৎ সবসময় এই সাধু নিজের হাত উপরে তুলে রাখতেন।

ডানকান প্রাণ পুরীর জীবনের অনেকটা অংশই তুলে ধরেছিলেন লেখায়। ১৭৪২ সাল নাগাদ জন্ম হয় প্রাণ পুরীর। নয় বছর বয়সে কনৌজে নিজের পৈতৃক বাড়ি থেকে পালিয়ে বিথুরে যান তিনি। সেখানে তাঁকে একজন স্বামীজি দত্তক নেন। এই স্বামীজির কাছে থাকতে থাকতেই সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রাণ। ১৭৫৩ সালে প্রয়াগের কুম্ভ মেলায় যান তিনি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের তপস্যা দেখে তিনি আজীবন উর্ধ্ববাহু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারপরের প্রায় তিন বছর যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়ায় নিজেকে অভ্যস্ত করাতে থাকেন। বাহু এবং হাত মাথার উপরে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে রাখার অভ্যাস করে যেতে থাকেন তিনি।

ডানকান

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সিনেমাই কি সত্যি! RAW- এর অন্দরে গুপ্তচরদের জীবন আসলে কেমন?

Research and Analysis Wing: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আর. এন. কাও মুজিবুর রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।

উর্ধ্ববাহু হয়েই প্রাণ পুরী ভারতীয় উপমহাদেশের পাশাপাশি পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার অনেক জায়গায় ভ্রমণও করেন। বেনারস থেকে মালয়, কোচিন থেকে বেলুচিস্তান, বাহরাইন থেকে সমরখন্দ, মস্কো থেকে তিব্বত- সাধু প্রাণ পুরী সমস্ত স্থানে ছুটে গিয়েছেন। আফগানিস্তানে আহমেদ শাহ আবদালি এবং পারস্যে করিম খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জগন্নাথ ধাম থেকে শুরু করে রামেশ্বরম, শ্রীপদ থেকে হিংলাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হিন্দু মন্দিরগুলিতে তীর্থযাত্রা করেন। বামিয়ানের বুদ্ধ পরিদর্শন করেন, এমনকী লাসায় দলাই লামা এবং কলকাতায় ওয়ারেন হেস্টিংসের মধ্যে দূত হিসেবেও কাজ করেন প্রাণ পুরী। আর এই সবটাই করেছেন দু' হাত মাথার উপরে তুলে!

তবে ডানকানের এই প্রবন্ধে বিবিধ ত্রুটি উঠে আসে পরবর্তী সময়ে। প্রাণ পুরীর জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এইখানে উল্লিখিত হয়নি। প্রাণ পুরী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এমন এক যুগে ঘটনাটি ঘটে যখন বাবা মায়েরা সন্তানদের বিক্রি করে দিতেন এই আশায় যে, কিনে নেওয়ার পরে মালিকরা বাচ্চাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে। প্রাণ পুরীর সন্ন্যাসী হওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে এই ঘটনাটি অস্বীকার করা যায় না। আরও একটি বিষয় হলো, ডানকান বা উইলফোর্ড যেমন প্রাণ পুরীকে কখনও যোগী কখনও ফকির বলেছেন, তেমন কিন্তু নয়। প্রাণ পুরী ফকির বা সাধু ছিলেন না। ছিলেন সন্ন্যাসী। এই ধরনের সন্ন্যাসীরা প্রায়ই পার্থিব সাধনায় নিযুক্ত থাকেন যার মধ্যেই থাকে বাণিজ্য, ব্যাঙ্কিং এবং সামরিক পরিষেবা।

প্রাণ পুরী

ডানকান খুব ভালো করেই জানতেন যে প্রাণ পুরী একজন সন্ন্যাসী। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে ফকির হিসেবেই বর্ণনা করেছেন, সম্ভবত ফারাক বোঝার মতো জ্ঞানের অভাব ছিল ডানকানের। ডানকান জনসাধারণকে জানাতে চাননি, কোম্পানি নেপালে কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রাণ পুরীকে ব্যবহার করেছিল। নেপালে প্রাণ পুরীকে পাঠিয়ে আসলে কোম্পানি ১৭৯২ সালের মার্চ মাসে হিমালয়ের এই অংশের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করে নেয়। এশিয়াটিক সোসাইটি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তিব্বতের সঙ্গেও বাণিজ্য ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে প্রাণ পুরীকে। তিব্বতিরা ব্রিটিশদের ভরসা না করলেও হিন্দু তীর্থযাত্রীদের এবং বিশেষ করে সন্ন্যাসীদের তো ভরসা করতই। 'বাণিজ্যিক তীর্থযাত্রী' হয়েই কাজ করেছিলেন প্রাণ পুরী। যেহেতু সন্ন্যাসীদের চরিত্রগুলি ভবঘুরে এবং তুলনামূলকভাবে নির্ভীক এবং তাঁদের অনেকেই নেটিভ স্টেটের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন তাই ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা নিজেদের প্রয়োজনে তাঁদের ব্যবহার করে। প্রাণ পুরীকেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করে। প্রাণ পুরী ১৮০০ সালে মারা যান। ব্রিটিশদের লেখা বাদে, তাঁর নিজস্ব কথা কোথাওই কাউকে লিখিত বলে যাননি তিনি।

সূত্র- https://scroll.in/

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।