'বেটি বাঁচাও' আজ মুখে মুখে! নেপথ্যে কন্যাসন্তানদের আসল 'ঈশ্বর' পুনের এই চিকিৎসক

Beti Bachao Janandolan: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এই কন্যাভ্রূণ হত্যা এবং শিশুহত্যার সংস্কৃতিকে জাতীয় লজ্জা বলে বর্ণনা করেছিলেন। মেয়েদের বাঁচাতে এক ‘জিহাদের’ ডাকও দিয়েছিলেন।

tiasa gupta
৪ মিনিট
'বেটি বাঁচাও' আজ মুখে মুখে! নেপথ্যে কন্যাসন্তানদের আসল 'ঈশ্বর' পুনের এই চিকিৎসক

২১ শতকে নারী মুক্তি নিয়ে নানা তর্জন গর্জনই শোনা গেছে। গর্জনই বটে কারণ, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরা ও পরিসংখ্যানে চোখ বুলোলে শিউরে উঠতে হয়। ভ্রূণ অবস্থায় কন্যার হত্যা, মেয়ে সন্তানের কপাল লিখন- এই দেশের বুকে এখনও গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। অকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসা, পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য চাপের মতো সামাজিক ব্যাধির কোনও দাওয়াই এখনও নেই। রোগের কারণ অশিক্ষা। আর এক্ষেত্রে আলোচনাই সার। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে বছরে ৪৬ লক্ষ কন্যাভ্রূণ হত্যা হয়! গত ৫০ বছরে নিখোঁজ সাড়ে ৪ কোটি মেয়ে। খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। ২০২০ সাল। গর্ভের সন্তান ছেলে না কি মেয়ে, তা দেখার জন্য অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেট কেটে ফেলেন উত্তর প্রদেশের বাদাউন জেলার এক ব্যক্তি!

কন্যাভ্রূণ হত্যা দেশে ভয়ঙ্কর চেহারা নিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি তারিখে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পটি শুরু করেন। ২০১৬ সালের ২৬ অগাস্ট, সেবছরের অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ মেডেল বিজেতা সাক্ষী মালিককে এর প্রতিনিধি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এরপরেও সমাজে মেয়েদের অবস্থা সেই একই তিমিরে। তবে এরই মধ্যে এক ব্যতিক্রমী নাম চিকিৎসক গণেশ রাখ।

কন্যা সন্তান হওয়ায় নেন না কোনও পারিশ্রমিক। চিকিৎসকের নাম ডাঃ গণেশ রাখ। পুনেতে নিজেই একটি প্রসূতি-কাম-মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল চালান। গড়ে তুলেছেন ‘বেটি বাঁচাও জন আন্দোলন’। আর এই খবর রাতারাতি ভাইরাল নেটদুনিয়ায়। কেন?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৩৩ বছর ধরে প্রতিদিন ৪০০ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ১০০০ জনকে খাবার! 'ভগবান'কে চিনুন!

Delhi Veerji Ka Dera: কমলজিৎ সিং জানান, প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল সাতটার মধ্যে শীষগঞ্জ গুরুদ্বারার সামনে জড়ো হয়ে যান ডাক্তার এবং ভলেন্টিয়াররা।

যখনই তাঁর হাসপাতালে কোনও শিশুকন্যার জন্ম হয়, তিনি কোনও ফি নেন না। গত ১১ বছরে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি ২ হাজার ৪০০ নবজাতক কন্যার জন্ম দিয়েছেন। এর মাধ্যমেই ভ্রূণ হত্যা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কাজও করে চলেছেন ডঃ গণেশ। তাঁর দাবি, গত ১১ বছর ধরে এই কাজের বিনিময়ে তিনি গর্ভবতী মহিলার স্বামী, পরিবার বা আত্মীয়ের কাছ থেকে একটি পয়সাও নেননি।

সংবাদ সংস্থাকে তিনি জানিয়েছেন, ২০১২ সাল থেকে তিনি কন্যা সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে তাঁদের বাড়ির লোকের থেকে একটি টাকাও নেন না। আজও সমাজে মেয়েদের সর্বত্রই হেনস্থার শিকার হতে হয়। আজও ভ্রূণ হত্যায় লাগাম পড়েনি। এই সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই তিনি কন্যাসন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে একটি টাকাও নেন না।

কন্যাসন্তানের জন্ম হলে তা উদযাপন করা হয় কেক কেটে। মিষ্টি বিতরণ করা হয় হাসপাতালের তরফে, হাসপাতালে ওড়ানো হয় রংবেরঙের বেলুন। আর এই সবের মূলে রয়েছে একটাই উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, জানান এই চিকিৎসক। তাঁর কথায়, “ছেলে হলে মিষ্টি কেনার বহর লেগে যায়। এমন অনেককে দেখেছি, যাঁরা মেয়ে হলে মুখ দেখতে পর্যন্ত আসেন না বরং লজ্জায় পড়ে যান। এই কারণেই আমি সচেতনতার প্রচার চালাই। বিনামূল্যে কন্যা সন্তানের প্রসব করাই।” ডঃ গণেশ রাখ আরও বলেন, “১১ বছর আগে বেটি বাঁচাও আন্দোলন শুরু করি। তারই অংশ হিসেবে হাসপাতাল কন্যাসন্তান প্রসব করাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কন্যার জন্ম উদযাপন করা হয়।” এখানেই শেষ নয়, হাসপাতাল থেকে মা ও সন্তানের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও করা হয় মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের তরফে। ডঃ গণেশ রাখ জানান, এই কাজে বহু মানুষ ও সংস্থা তাঁর হাসপাতালকে সাহায্য করেন, ফলে সবটা নির্বিঘ্নেই হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পিছিয়ে পড়া 'জেনারেল'দের সংরক্ষণ! এই কোটায় কারা, কী কী সুবিধে পাবেন?

EWS Reservation: এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে বার্ষিক আয় (পারিবারিক) ৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে হবে। পরিবারের ৫ একরের বেশি কৃষি জমি থাকা যাবে না। ১০০০ স্কোয়ার ফুটের বেশি জায়গা নিয়ে ফ্ল্যাট হলে চলবে না।

এই চিকিৎসক যে আলোকবর্তিকা দেখালেন, তার দিকে নজর রেখেই দেখা যাক কোথায় দাঁড়িয়ে এই দেশের মেয়েরা?

রাষ্ট্রসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বা ইউএনএফপিএর ২০২০-এর জুন মাসে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ৫০ বছরে ভারতে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মেয়ে ‘নিখোঁজ’ হয়ে গেছে। প্রতি বছর এই দেশে গর্ভপাত ঘটিয়ে ৪৬ লাখ কন্যা ভ্রূণ নষ্ট করে ফেলা হয় এবং জন্মের পর কন্যা শিশুরা অবহেলার শিকার হয়। অকালে পড়াশুনো শিকেয় ওঠে। পরিবারের ইচ্ছায় অপরিণত বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। এই দেশে জন্মের পর কন্যাশিশুর মৃত্যুর হারও খুবই বেশি।

ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রকের প্রকাশ করা এক রিপোর্টে দেখা যায়, বহু দম্পতি একটি ছেলে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত বাচ্চা নিতেই থাকে। দিল্লিতে বিবিসির ভারতীয় নারী ও সমাজ বিষয়ক সম্পাদক গীতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, ভারতীয় সমাজে পুত্র সন্তানের প্রতি পক্ষপাত দীর্ঘদিনের একটা সংস্কৃতি। আর নারীর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় এবং ছেলে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা সমাজে এত প্রবল হওয়ার কারণে ভারতে গত কয়েক বছরে নারী-পুরুষ সংখ্যার অনুপাতও ব্যাপকভাবে ওলট-পালট হয়ে গেছে। কয়েক কোটি কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়! গর্ভে থাকা অবস্থাতেই গর্ভপাত করে ভ্রূণ হত্যা করা হয়, নয়তো জন্মের পরই মেয়েদের ইচ্ছা করে অবহেলা করে মেরে ফেলা হয়। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এই কন্যাভ্রূণ হত্যা এবং শিশুহত্যার সংস্কৃতিকে জাতীয় লজ্জা বলে বর্ণনা করেছিলেন। মেয়েদের বাঁচাতে এক ‘জিহাদের’ ডাকও দিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে নরেন্দ্র মোদিও ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পের ঘোষণা করেন। বেশ কিছু পদক্ষেপ করাও হয়। অশিক্ষাই হয়তো এই অবিচার, অযুক্তির পাহাড়ের জন্য দায়ী। আজকে এই দেশ উন্নয়নের ফানুস ওড়ায়। মহাকাশে ইসরো স্বাধীনতা দিবসেরর মাহেন্দ্রক্ষণে গর্বের পতাকা ওড়ায়। তারপরেও কত মা তাঁদের সন্তানকে মেরে ফেলার পর কান্না চাপা দেয় রাতের অন্ধকারে বালিশে মুখ লুকিয়ে! এদের সামনে এই চিকিৎসকের বিবেকবোধ কি সমাজের রোগ নিরাময়ে যথেষ্ট ওষুধ?

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।