নাবালিকাদের নিয়তি যৌনপল্লি! ভারতের এই বাস্তবতা লজ্জায় ফেলবেই
Reality of sex workers: ভারতে বর্তমানে যৌনকর্মীর সংখ্যা ১০ লক্ষর মতো। তবে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যাটা ৩০ লক্ষ। এদের মধ্যে রয়েছে নাবালিকারাও।

দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে যৌনকর্মীদের কাজের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যৌনকর্মীদের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করছে এমন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলি যৌনকর্মকে কাজ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার যে দাবি জানিয়ে আসছিল, তাও পূরণ হয়েছে। কিন্তু এতে যৌনকর্মীদের অবস্থার আদৌ কোনও উন্নতি হবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে কেউই বলতে পারবেন না।
যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন যে মহিলারা, তাঁদের অনেকেই জীবনে প্রতারিত হয়েছেন। এঁদের একাংশ প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে ঠকেছেন। অনেকেই যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিতান্তই সংসারের ঘানি টানার জন্য।
সরকারি হিসেবে ভারতে বর্তমানে যৌনকর্মীর সংখ্যা ১০ লক্ষর মতো। তবে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যাটা ৩০ লক্ষ। এদের মধ্যে রয়েছে নাবালিকারাও। এই মেয়েদের অনেককেই গ্রাম থেকে শহরের যৌনপল্লিগুলিতে পাচার করা হয়েছে বলে স্বেচ্ছাসেবীদের দাবি।
যদিও এদেশে নারীপাচার বেআইনি। ১৯৫৬ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে 'ইমমরাল ট্র্যাফিক প্রিভেনশন অ্যাক্ট'। এসত্ত্বেও নারীপাচার বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা বরং বহু মেয়ে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছে।
যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন যে মহিলারা বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প কোনও অবলম্বন না থাকাতেই ওঁরা এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। বলা যায়, দারিদ্র্য ওঁদের মহান না করে শোষণ-বঞ্চনার মুখে ঠেলে দিয়ে শেষপর্যন্ত যৌনকর্মীতে পরিণত করেছে।
সর্বভারতীয় স্তরে যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছে যে সংস্থাগুলি, এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্কার' এবং 'অল ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক অব সেক্স ওয়ার্কার'। এছাড়াও যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করছে আরও বেশ কিছু সংস্থা। বাংলায় যেমন 'দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি' অথবা 'সংলাপ'।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Human Sacrifice: কেরলের নব়বলির ঘটনা চমকে দিয়েছে গোটা দেশকে। দেশজুড়ে কি একই পরিস্থিতি
স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, গত তিন দশকে যৌনকর্মীদের জীবন সম্পর্কে সচেতনতা কিছুটা হলেও বাড়ানো গিয়েছে। যৌনকর্মীরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য পুরো রোজগারটা নেশার পিছনে না উড়িয়ে দিয়ে একাংশ সঞ্চয়ও করছেন।
একই সঙ্গে কলকাতায় গড়ে উঠেছে যৌনকর্মীদের সমবায় ব্যাঙ্ক। এই ব্যাঙ্কে নিয়মিতভাবে কিছু কিছু করে টাকাপয়সা জমাচ্ছেন ওঁরা। সেই টাকায় ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ কষ্টেসৃষ্টে হলেও যেমন উঠে আসছে, তেমনই আপদে-বিপদে কাজে লাগছে জমানো টাকাটা।
যৌনকর্মীদের সন্তানদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতার সোনাগাছির বাসিন্দা যৌনকর্মীর ছেলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এক যুবক বললেন, "আমাদের মধ্যে অনেকে এমএ পাশ করে চাকরি-বাকরি করছে। সমাজের মূলস্রোতে ফিরতে হলে আমাদের কাছে লেখাপড়ার কোনও বিকল্প নেই। আমি এখন চাকরি করি একটি বেসরকারি সংস্থায়। সেখানে সহকর্মীরা জানে আমার মা একজন যৌনকর্মী। এসত্ত্বেও এপর্যন্ত অফিসে কোনওধরনের মানসিক হেনস্থার শিকার হইনি। সমাজটা ক্রমশ এগোচ্ছে বলেই মনে হয়।"
২০২০ সাল থেকে টানা দু'বছর ভারতে যৌনকর্মীরা যে জীবন কাটিয়েছে তা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকার মতো। করোনা পরিস্থিতিতে বিপন্ন কোটি কোটি নাগরিক যাঁরা সমাজের মূলস্রোতের অন্তর্গত তাঁদেরও আর্থিক টানাটানির সীমা-পরিসীমা ছিল না। আর যৌনকর্মীরা আজও সমাজের প্রান্তসীমায় বসবাসকারী সম্প্রদায়। তাঁরা যে অবহেলিত হবেন তা বলাই বাহুল্য। করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি সাহায্য যৌনকর্মীরা যেটুকু পেয়েছেন তা দিয়ে দিন চলেনি। মরতে মরতে বেঁচেছেন এদেশের লক্ষ লক্ষ যৌনকর্মী। স্বেচ্ছাসেবীরা কিছুটা হলেও সুরাহা জুগিয়েছেন।
ভারতে যে মেয়েরা পেশায় যৌনকর্মী, তাঁদের বয়স ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। দেশজুড়ে যৌনকর্মীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নাবালিকা যৌনকর্মীর চাহিদা বরাবরই বেশি ছিল। সেই চাহিদা গত দু'বছরে আরও বেড়েছে। কার্যত যৌন পেশাকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ মেয়ের কর্মসংস্থানের ফলে যৌনকর্ম কার্যত শিল্প হয়ে উঠেছে।
কলকাতা ও মুম্বইতেই সারা দেশের অন্য শহরগুলির তুলনায় বেশি যৌনকর্মী বসবাস করেন। কেবলমাত্র মুম্বইতেই রয়েছে এক লক্ষাধিক যৌনকর্মী। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি যৌনকর্মীদের বৃত্তে কল্যাণমূলক কাজে লিপ্ত থাকলেও তা এদেশের যৌনপল্লির মেয়েদের মধ্যে সামান্য সংখ্যককেই অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেখাতে পেরেছে। এসম্পর্কে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে তামিলনাড়ুর 'করুণা ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি'। সংস্থার তরফে অধ্যাপক বি শেখর জানিয়েছেন, যৌনকর্মীদের মধ্যে একটা বড় অংশের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। ঋণের জালে ডুবে রয়েছেন ওঁরা। করোনা দেখা দেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি করুণতর হয়েছে।
এই গবেষণাটি চালানো হয়েছে দেশের যে পাঁচ শহরের যৌনপল্লিগুলিতে, তার মধ্যে রয়েছে দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই, পুনে এবং নাগপুরের বাসিন্দা যৌনকর্মীরা। 'ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন'-এর সমীক্ষা অনুসারে, সারা দেশে সরকারি হিসেবে মোট ১০ লক্ষের কাছাকাছি যৌনকর্মীদের মধ্যে দিল্লি, মহারাষ্ট্র এবং বাংলাতে বসবাসকারী যৌনকর্মীর সংখ্যা ১ লক্ষ ৩০ হাজারের চেয়ে বেশি। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই আবার পাচার হওয়া মেয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাঁদের যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে। 'করুণা ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি'র গবেষণায় পাশাপাশি 'ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো'র তথ্যানুসারে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে পাচার হওয়া ৯৫ শতাংশ মেয়েকেই।
যৌনপল্লিগুলিতে যে মেয়েরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশেরই কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগও ওঁদের নেই। এই পরিস্থিতিতে ওঁরা ঋণের জন্য হাত পাততে বাধ্য হচ্ছেন মহাজনের কাছে। চড়া সুদে একবার ঋণ নিলে সেই ঋণের বোঝা ক্রমশ ভারী হচ্ছে। ফলে ফেঁসে যাচ্ছেন মেয়েরা।
মুম্বইয়ে নারীপাচার প্রতিরোধে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রেরণার অধিকর্তা প্রীতি পাটকার জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্ট মহারাষ্ট্র সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল করোনা পরিস্থিতিতে যেন যৌনকর্মীদের প্রতিমাসে ৫ কেজি খাদ্যশস্য রেশন হিসেবে দেয়। এছাড়া আর্থিক সহায়তা বাবদ মাসিক ৫ হাজার টাকার দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। রেশন হিসেবে খাদ্যশস্য নেওয়ার জন্য পরিচয়পত্র জরুরি না হলেও প্রতিমাসে ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা পেতে অত্যাবশ্যক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকাটাও। কিন্তু যৌনকর্মীদের প্রায় কারোরই নেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট।
বাংলায় 'দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি' যৌনকর্মীদের জন্য সমবায় ব্যাঙ্ক গঠন করায় ওঁদের মধ্যে রোজগারের খানিক অংশ সঞ্চয়ের বন্দোবস্ত করলেও দেশে অন্যত্র যৌনকর্মীরা এই সুবিধা পান না। ফলে আপদে-বিপদে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ঋণই ভরসা।
যৌনকর্মীরা নারকীয় জীবন থেকে আদৌ নিস্তার পাবেন, এমন আশা এখনও দেখা যাচ্ছে না। কেননা ওঁদের বিকল্প জীবন উপহার দেওয়ার কাজটা কেবল স্বেচ্ছাসেবীদেরই নয়, একইসঙ্গে সরকারেরও। এই জরুরি কাজটা বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত থাকার কারণে লক্ষ লক্ষ যৌনকর্মী কার্যত পচে মরছেন যৌনপল্লির ক্লেদাক্ত পরিবেশে।
















