জল পর্যন্ত ছুঁতেন না, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যতীন দাসের অনশনের কাহিনি চোখে জল আনবেই

Jatin Das: যতীন্দ্রনাথ দাসের মৃতদেহ কলকাতায় ট্রেনে করে নিয়ে আসা হয়েছিল। ট্রেন যেসব স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল, সেইসব স্টেশনে বহু মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিল।

Raktim Dey
৩ মিনিট
জল পর্যন্ত ছুঁতেন না, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যতীন দাসের অনশনের কাহিনি চোখে জল আনবেই

আমরণ অনশন। এই দু'টি শব্দের সঙ্গে কম-বেশি আমরা সকলেই পরিচিত। আমরণ অনশনকে বহু ক্ষেত্রেই নিজেদের মত সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বা দাবি আদায়ের একটি পথ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগে বহু বিপ্লবী আমরণ অনশনের পন্থা অবলম্বন করলেও একজন বিপ্লবী তাঁর অনশন সততই নিজের মৃত্যু অবধি বজায় রেখেছিলেন। কথিত আছে যে, তাঁর এই আত্মত্যাগের কারণে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই বিপ্লবীকে দধীচি মুনির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের অধ্যায়ে প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এই বিপ্লবীর নাম ছিল যতীন্দ্রনাথ দাস।

যতীন্দ্রনাথ দাস ১৯০৪ সালের ২৭ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রবস্থায় যতীন্দ্রনাথ দাস বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অনুশীলন সমিতি-তে যোগদান থেকে মহাত্মা গান্ধীর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন- সর্বত্রই যতীন্দ্রনাথ দাসের উপস্থিতির কথা জানা যায়। যতীন্দ্রনাথ দাস বন্দি অবস্থায় দু'বার অনশন করেছিলেন। লাহোর জেলে বন্দি অবস্থায় তাঁর ৬৩ দিনের আমরণ অনশনের কথা বহু মানুষ জানলেও এটিই তাঁর প্রথম অনশন ছিল না। ১৯২৫ সালে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ময়মনসিংহের জেলে বন্দি থাকাকালীন ভারতীয় রাজবন্দিদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের অব্যবস্থার প্রতিবাদ জানাতে তিনি প্রথমবার অনশন শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে তাঁর অনশনকে ব্রিটিশ সরকার গুরুত্ব দেয়নি। ধীরে ধীরে তাঁর হার না-মানা মনোভাব ব্রিটিশ সরকারের কপালে চিন্তার ভ্রুকুটি নিয়ে এসেছিল। কুড়ি দিন অনশনের পর জেল সুপারিনটেনডেন্ট তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তাঁর দাবি পূরণ করার আশ্বাস দিলে তিনি অনশন তুলে নিয়েছিলেন। ২১ বছর বয়সি এই বিপ্লবী তাঁর মাথা না নোয়ানোর মনোভাব বজায় রেখে ব্রিটিশ সরকারকে প্রথমবার তাঁর সামনে নিচু হতে বাধ্য করেছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রিটিশদের ভারতছাড়া করতে বাধ্য করেছিল সেই বিদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতকতার বিষ পালটে দিল ইতিহাস

১৭৫৭ সালে পলাশির আমবাগানে বাংলার স্বাধীনতা হরণের পর ভারতে ব্রিটিশরাজ মূলত দু'টি সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। প্রথমটি ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালের সেনা বিদ্রোহ এবং দ্বিতীয়টি তার ঠিক ৮৯ বছর পর নৌ বিদ্রোহ।

শচীন্দ্রনাথ সান্যালের থেকে বোমা বানানোর পদ্ধতি শিখেছিলেন যতীন্দ্রনাথ দাস। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তিনি ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের বিপ্লবী উদ‍্যোগে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই সময়ে তাঁর বানানো বোমা অ্যাসেম্বলিতে নিক্ষেপ করা হয়। ১৪ জুন, ১৯২৯ সালে বিপ্লবী সক্রিয়তায় জড়িত থাকার ফলে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে গ্রেফতার করে লাহোর জেলে বন্দি করা হয়েছিল। লাহোর জেলে ভারতীয় রাজবন্দিদের সাধারণ দাবি মানা হতো না। তাঁদের জন্য বরাদ্দ পোশাক অপরিষ্কার এবং পড়ার অযোগ্য ছিল। ভারতীয় রাজবন্দিদের খাবার অপরিচ্ছন্নভাবে এক জায়গায় ডাঁই করে রাখা থাকত। শোনা যায় যে, অনেক বিপ্লবী দেখতে পেতেন, তাঁদের জন্য বরাদ্দ খাবার তাঁদের পাতে পৌঁছনোর আগেই আরশোলা, ইঁদুর সেই খাবারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একই জেলে সাধারণ ইউরোপীয় বন্দিদের জন্য সবরকম ব্যবস্থা ছিল। তাদের জন্য পরিষ্কার পোষাক, পরিচ্ছন্নভাবে রাখা খাবার, এমনকী, পড়ার জন্য খবরের কাগজ বরাদ্দ ছিল। ভগৎ সিং, যতীন্দ্রনাথ দাস-সহ কয়েকজন বিপ্লবী এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন।

১৩ জুলাই, ১৯২৯ সালে যতীন্দ্রনাথ দাস আমরন অনশন শুরু করেন। তাঁর বয়স তখন ২৫ বছর। কথিত আছে যে, যতীন্দ্রনাথ দাস জানতে পেরেছিলেন, ইংরেজ সরকার তাঁর জলের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছে যাতে তার শরীরে জরুরি পুষ্টি উপাদানের অভাব না হয়। সেই কারণে তিনি জল পান করার ক্ষেত্রেও সাবধান হয়েছিলেন। কিছু তথ্য এটাও বলে যে, তিনি কিছুদিন জল পান করাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ইংরেজ সরকার প্রথমে এই অনশনকে পাত্তা না দিলেও পরবর্তীকালে অনশনকে বন্ধ করার বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন শুরু করে। যতীন্দ্রনাথ দাসের নাকে নল দিয়ে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টার সময়ে ধস্তাধস্তিতে কিছুটা দুধ তাঁর শ্বাসনালীতে চলে গিয়েছিল। সেই কারণে তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যদিও এই কষ্ট তাঁকে অনশন পালন করা থেকে বিরত করতে পারেনি। ক্রমে ক্রমে দীর্ঘ অনশনের ফলে তাঁর শরীরে পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। কথিত আছে যে, এই সময়ে জেল কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ আধিকারিকদের কাছে যতীন্দ্রনাথ দাসের মুক্তির আবেদন জানিয়েছিল। যদিও তাঁদের আবেদনে কর্ণপাত করা হয়নি। যতীন্দ্রনাথ দাস তাঁর অনশন আত্মত্যাগের মাধ্যমে শেষ করেছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ আজকের দিনে, ১৯২৯ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর লাহোরে এক বিশাল শোকমিছিল বের হয়েছিল। যতীন্দ্রনাথ দাসের মৃতদেহ কলকাতায় ট্রেনে করে নিয়ে আসা হয়েছিল। ট্রেন যেসব স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল, সেইসব স্টেশনে বহু মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিল। কলকাতায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর শোকযাত্রায় হেঁটেছিলেন। কথিত আছে যে, প্রায় দুই মাইল লম্বা সেই মিছিলে প্রায় সাত লক্ষ মানুষ তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিল। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ভয় না পেয়ে হার না মেনে এগিয়ে যাওয়া এই বিপ্লবী নিজের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়ার বদলে ইতিহাসের পাতায় কয়েকটা লাইন হয়ে রয়ে গিয়েছেন।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।