কাঁটার নাম রেপো রেট, ফের হু হু করে বাড়বে ইএমআই? কোন ঋণে কত মাশুল
Repo Rate: সুদের হার বাড়িয়ে রেপো রেটের বোঝা সম্পূর্ণ আমজনতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয় কেন?

ফের বাড়তে চলেছে আপনার ইএমআই। গাড়ি, বাড়ির ঋণ হতে চলেছে অনেকটা মহার্ঘ। ৭ ডিসেম্বর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার পর সিলমোহর পড়ল এই বিষয়ের ওপর। এই দিন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডিসেম্বর মাসের মুদ্রানীতি ঘোষণা করলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস। তাঁর বক্তৃতায় এদিন বারবার উঠে এল মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির প্রসঙ্গ। শক্তিকান্ত দাস এদিন জানালেন, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে ভারতের রেপো রেট আরও ০.৩৫ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী রেপো রেট এই মুহূর্তে বেড়ে হচ্ছে ৬.২৫ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর আরও জানালেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রেপো রেট বৃদ্ধির বিষয়ে সায় দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের মনিটরি পলিসি কমিটির ছ'জনের মধ্যে পাঁচ জন সদস্য। সংখ্যাগরিষ্ঠরা রেপো রেট বৃদ্ধির কথা বলেছেন এবং সেই কারণেই আরবিআই রেপো রেট বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই নিয়ে এই বছর টানা পঞ্চমবার সুদের হার বৃদ্ধি করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
কী প্রভাব পড়বে আপনার ওপর
আরবিআই-এর এই সিদ্ধান্তের পরে বেসরকারি ব্যাঙ্ক এবং হাউজিং ফিন্যান্স সংস্থাগুলি তাদের হোম লোনের সুদের হার বৃদ্ধি করবে এবং যার ফলে আপনার ইএমআই ভবিষ্যতে হবে আরও ব্যয়বহুল। রেপো রেট বৃদ্ধির কারণে ব্যাঙ্কগুলির ঋণের হার অনেকটা বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রাহকদের ওপর। ফলে ঋণের সুদ মেটাতে গিয়ে পকেটে আরও টান পড়বে গ্রাহকদের। রেপো রেট লিঙ্ক করা হোম লোনে বর্তমান সুদের হার ০.৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে এই বিষয়টা।
২০ লক্ষ টাকার হোম লোনে কত বাড়ল ইএমআই?
ধরুন, আপনি দেশের বৃহত্তম ব্যাংক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকে ২৫ লক্ষ টাকার হোম লোনের জন্য প্রতি মাসে ২১,৫৩৮ টাকা ইএমআই দিচ্ছেন। ২০ বছরের জন্য ৮.৪০ শতাংশ হারে এই সুদ আপনাকে দিতে হচ্ছে। তবে এখন যদি রেপো রেট ৩৫ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি করা হয় তাহলে আপনার সুদের হার বেড়ে হবে ৮.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে আপনার ইএমআই দিতে হবে ২২,০৯৩ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে আপনার ৫৫৫ টাকা বেশি ইএমআই দিতে হবে। এই পরিমাণটা বছরের হিসেবে হবে ৬,৬৬০ টাকা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Fixed Deposit: চলুন জেনে নেওয়া যাক, এসবিআই থেকে শুরু করে অন্যান্য সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাঙ্ক কত শতাংশ সুদ দেয় মেয়াদি আমানতের ওপর।
৪০ লক্ষ টাকার হোম লোনে ইএমআই কত
আপনি যদি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকে কুড়ি বছরের জন্য ৮.৪০ শতাংশ হারে ৪০ লক্ষ টাকার হোম লোন নিয়ে থাকেন, তাহলে বর্তমানে আপনাকে ৩৪,৪৬০ টাকার ইএমআই দিতে হচ্ছে। তবে রেপো রেট বৃদ্ধি করার পর এখন আপনাকে ৮.৭৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রতি মাসে ৩৫,৩৪৮ টাকা ইএমআই দিতে হবে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে আপনাকে ৮৮৮ টাকা বেশি খরচ করতে হবে এবং এক বছরে আপনাকে ১০,৬৫৬ টাকা বেশি খরচ করতে হবে।
কী বলছেন গভর্নর শক্তিকান্ত দাস?
৭ ডিসেম্বরের বৈঠক নিয়ে আরবিআই গভর্নর শক্তিকান্ত দাস বলছেন, আমরা আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বছরের শেষের দিকে চলে এসেছি। এই মুহূর্তে শুধু ভারত নয়, বিশ্বের অনেক দেশ মুদ্রাস্ফীতির মার খাচ্ছে। বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের সাপ্লাই চেন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং সেই কারণে ব্যাঙ্ক নিজেদের ক্রেডিট পলিসি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে দুই অঙ্কের ওপরে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতির হার।
দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার বলছে, এই বছরের শুরুর দিকে তুলনায় অনেকটা কম হয়েছে মূল্যবৃদ্ধি এবং সেই কারণে রেপোরেট ০.৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার কথা চিন্তা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। এই মুহূর্তে ভারতের বাজারে অনেকটা স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভারতের তুলনায় অন্যান্য অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ এবং মুদ্রাস্ফীতির সবথেকে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি কিছুটা হলেও ভঙ্গুর হয়েছে, তবে খুব শীঘ্রই তা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ অন্যান্য উন্নত দেশের অর্থনীতি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমেরিকার শেয়ার বাজার। সেই তুলনায় ভারতীয় শেয়ার বাজার অনেকটাই বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। চলতি সপ্তাহে সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে ইন্ডিয়ান স্টক এক্সচেঞ্জ। বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, দু'টি বেশ ভালো জায়গাতে ব্যবসা করছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে চলতি মাসে ১৯,০০০ পয়েন্ট ছুঁতে পারে ভারতীয় শেয়ার সূচক নিফটি।
কী বলছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা?
সাধারণ মানুষের সমস্যা বাড়লেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের বাজার বিশেষজ্ঞরা। বেক্সলে বুটিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ফার্মের উপদেষ্টা উৎকর্ষ সিনহা বলছেন, এই বিষয়ে আরবিআই একেবারে ঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সময় যত এগোবে, রেপোরেট অনেক সময় সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণ মানুষের ওপর সুদের বোঝা কিছুটা হলেও বাড়বে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি নিয়ন্ত্রিতভাবে রেপো রেট বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যথায় আবারও মুদ্রাস্ফীতি হাতের বাইরে চলে যাবে।
মানিকন্ট্রোলের সঙ্গে কথা বলার সময় কোটাক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ভিপি অনিন্দ্য ব্যানার্জি বললেন, আরবিআই-এর মুদ্রানীতি অনুসারে রেপো রেট ৩৫ বিপিএস বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল আগে থেকেই। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। আগের মন্তব্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আজকের মন্তব্যের বেশ কিছু সামঞ্জস্য মিলেছে। আগের তুলনায় বাজার এখন অনেকটা স্থিতিশীল। সেই কারণে যদি এই মুহূর্তে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কিছুটা হলেও নিজেদের রেপো রেট বৃদ্ধি করে, তাতে সাধারণ মানুষের ওপর খুব একটা প্রভাব পড়ার কথা নয়।
তবে হ্যাঁ, বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক ক্ষেত্রের ওপর অবশ্যই এই রেপো রেটের প্রভাব পড়বে। যাঁরা গৃহঋণ নিচ্ছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে হয়তো বিষয়টা খুব একটা সুখকর নয়। রেপো রেট বৃদ্ধি করা হলে ডিপোজিটের সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়টি বিলম্বিত করে দেয় ব্যাংকিং ক্ষেত্র। তবে ফিক্স ডিপোজিটে সুবিধা পাওয়া যায়। এর আগেও স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া রেপো রেট বৃদ্ধির পরে ফিক্সড ডিপোজিটের ওপর সুদের হার বৃদ্ধি করেছিল। তবে সব ব্যাঙ্ক মেয়াদি আমানতের ওপর সুদের হার বৃদ্ধি করে না। পরিবর্তে ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়িয়ে রেপো রেটের বোঝা সম্পূর্ণ আমজনতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। তাই শুধুমাত্র রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নয়, ব্যাঙ্কগুলিকেও জনসাধারণের কথা একটু ভাবা উচিত।
















