বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর রয়েছে ভারতেই! কুম্ভলগড় দুর্গর ইতিহাস আজও অনেকের অজানা
রাণা কুম্ভর তৈরি এই স্থাপত্য ২০১৩ সালে ইউনেসকো ‘হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা পায় এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর হিসেবেও স্বীকৃতি মেলে কুম্ভলগড়ের।

ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম ‘দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না’-র কথা। ছোট থেকে ইতিহাসের বইতে সকলেই পড়েছি এই প্রাচীরের কথা। এই প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ৬৪০০ কিমি। আর এতটাই বড় যে, মহাকাশ থেকেও নাকি তা দেখা যায়। কিন্তু খোদ ভারতেই যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর লুকিয়ে আছে, তার খবর অনেকেরই অজানা। রাজস্থানের আরাবল্লি পর্বতমালার ওপর অবস্থিত ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দুর্গ কুম্ভলগড়কে ঘিরে রয়েছে এই প্রাচীর। এই প্রাচীরের দৈর্ঘ্য হয়তো চিনের প্রাচীরের মতো অত বেশি নয়, কিন্তু ৩৬ কিমি দীর্ঘ এই প্রাচীর বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মানবসৃষ্ট প্রাচীর।
এবার আসা যাক ইতিহাসে। উদয়পুর থেকে ৮২ কিমি উত্তর-পশ্চিমে, মেওয়ার ও মারওয়াড়ের সীমান্তে পঞ্চদশ শতকে একটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন মহারাণা কুম্ভ। মৌর্যরাজ আর সম্রাট অশোকের পুত্র সাম্প্রতির বানানো একটি দুর্গের ভগ্নাবশেষের ওপরেই এই দুর্গ তৈরি করেন রাণা কুম্ভ। এই কুম্ভ রাজবংশের তৈরি মোট ৮৪টি দুর্গের মধ্যে ৩২টি তৈরি করেছিলেন রাণা কুম্ভ। তাঁর নামেই এই দুর্গের নাম রাখা হয় কুম্ভলগড় দুর্গ। এই দুর্গকে ঘিরেই রয়েছে সুবিশাল প্রাচীর, যার আড়াআড়ি বিস্তারও তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।
কিন্তু এই সুবিশাল প্রাচীর তৈরির পিছনেও আছে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। শোনা যায়, ১৪৩৩ সালে যখন মহারাণা কুম্ভ প্রথম এই দুর্গ তৈরির কাজ শুরু করেন, তখন প্রথম ৭ কিমি প্রাচীর তৈরি করার পরই বারবার পাথরের গাঁথনি ভেঙে পড়তে থাকে। কিছুতেই নির্মাণকাজ এগোচ্ছিল না, বারবার বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল এই দুর্গ। চিন্তায় পড়ে যান রাণা কুম্ভ। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে এক সাধুর শরণাপন্ন হন তিনি। সেই সাধু রাণা কুম্ভর থেকে সব কথা শুনে বললেন, দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ করার রাস্তা তিনি খুঁজে পেয়েছেন। সাধুর মতে, যদি কোনও ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজেকে বলিদান করে, তবেই এই কাজ সম্পূর্ণ হবে। রাণা কুম্ভর তখন মাথার চুল ছেঁড়ার জোগাড়। তিনি এমন লোক কোথায় পাবেন, যে দুর্গের জন্য নিজের জীবন বলিদান দেবে? এই সমস্যা থেকে মুক্তির পথও সাধুই দেখিয়েছিলেন। সাধু বলেছিলেন, এই দুর্গের জন্য তিনি নিজের জীবন বলিদান দিতে রাজি। কিন্তু শর্ত আছে। তাঁর কথা অনুযায়ী, সাধুকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে এবং যেখানে তিনি ক্লান্ত হবেন, সেখানেই তাকে হত্যা করে দেবীর মন্দির তৈরি করতে হবে। প্রথমে রাজি না হলেও পরে আর অন্য উপায় না দেখে রাণা কুম্ভ রাজি হয়ে যান। এরপর একদিন সাধু পাহাড়ের ওপর দিয়ে হাঁটা শুরু করলেন এবং সাধুর পিছনে কুম্ভের সৈন্য। হাঁটতে হাঁটতে যখন তিনি ক্লান্ত হয়ে থামলেন, সেখানেই তার দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়া হলো এবং সেখানেই মন্দির তৈরি করা হল। যেখানে ওই সাধুর মাথা পড়েছিল, সেখানে একটি ফটক বানানো হয়, তার নাম ‘হনুমান পোল’। এইভাবে এক ব্যক্তির আত্মবলিদানের দ্বারা তৈরি হয়েছিল এই দুর্গ।
কুম্ভলগড় দুর্গ তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ১৫ বছর (১৪৩৪-১৪৪৮)। দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর রাণা কুম্ভ মুদ্রা তৈরি করেছিলেন, যার ওপর দুর্গের ছবি ও তার নাম লেখা ছিল। কুম্ভলগড় দুর্গের প্রাচীরে রয়েছে ৭টি বিশাল দরজা, যার সাহায্যে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করা হত।
দুর্গের ৭টি ফটক
রাম পোল: রাম পোলকে প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ধরা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ডাকবাংলোর ভূতের গল্পে স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সেগুলি ঘিরে অসংখ্য রহস্যমৃত্যু। আত্মহত্যা থেকে খুন- সবকিছুই ডাকবাংলোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
অ্যারেত পোল: দুর্গের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এই পোলের কাছেই সেই সাধু ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই পোলে কিছু মিরর সিগন্যাল রয়েছে যা এমারজেন্সি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হতো সতর্ক করার জন্য।
হুল্লা পোল: এই সেই পোল যেখানে ১৫৬৭ সালে মোগলরা তাঁদের আস্তানা গেড়েছিল।
হনুমান পোল: হুল্লা পোলের পরেই আসে হনুমান পোল, এই পোলে ভগবান হনুমানের একটি ছবি রয়েছে, যা রাণা কুম্ভ এনেছিলেন।
পাগড়া পোল: এই পোল অশ্বারোহীদের জন্য ব্যবহৃত হতো।
ক্যানন পোল: মনে করা হয়, এই পোলের কাছাকাছি কোথাও একটা গুপ্ত দরজা আছে।
নিম্বো পোল: বলা হয়, এই পোলের কাছেই আছে দেবী চামুণ্ডির মন্দির এবং এখানেই পৃথ্বীরাজ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। আর এই স্থানেই পান্না ধাই রাজা উদয় সিংহকে বাঁচিয়ে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। দুর্গের সর্বশেষ গেট হলো এই নিম্বো পোল।
এই দুর্গের সবথেকে উঁচুতে রয়েছে বাদল মহল, যা কুম্ভ মহল নামেও পরিচিত। শোনা যায়, দুর্গকে স্বাবলম্বী বানানোর জন্য এই দুর্গের ভেতরেই চাষবাস আর জলাশয়ের ব্যবস্থাও ছিল। কৃষকদের কাজ করতে যাতে অসুবিধে না হয়, সেইজন্য রাণা কুম্ভ প্রতিদিনের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন ১০০ কেজি তুলা এবং ৫০ কেজি ঘিয়ের। তা দিয়েই প্রাচীরের গায়ে বিশাল বিশাল মশাল জ্বালানো হতো। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ত কয়েক মাইল অবধি। সেসময় রাতের বেলায় স্বর্গীয় রূপ নিত এই প্রাচীর। এই প্রাচীরের প্রস্থ প্রায় ১৫ মিটার। বলা হয়, এটিতে একসঙ্গে ১০টিরও বেশি ঘোড়া চালানো যায়।
দুর্গে প্রবেশ করার জন্য রয়েছে পোল বা ফটক। দক্ষিণে অ্যারেত পোল পেরিয়ে কেল্লায় ওঠা শুরু হয়। কালচে হলুদ বেলেপাথর দিয়ে তৈরি এই দুর্গ দেখে মন ভরে যায়। ৩৬০টির বেশি মন্দির, ঘরবাড়ি, পাথর দিয়ে বাঁধানো উঁচু-নিচু রাস্তা, প্রাসাদ, মহল নিয়ে এই দুর্গের চত্বরের আনাচকানাচে ইতিহাস ঘোরাফেরা করে। রাম পোলের ডানদিকে অষ্টভূজাকৃতি তিনতলা দেবী মন্দির দাঁড়িয়ে আছে একটি উঁচু বেদির ওপরে। তার পাশেই রয়েছে নীলকণ্ঠের মন্দির। মন্দিরের বিশাল ছাদ, গম্বুজ আর স্তম্ভ নজরকাড়া। এই মন্দিরের ৬ ফুট লম্বা শিবলিঙ্গটিকে প্রতিদিন পুজো করতেন রাণা কুম্ভ। রাম পোলের বাঁ দিকে আছে গণেশ মন্দির, যা সম্ভবত এই দুর্গের প্রাচীনতম মন্দির। এই গণেশ মন্দির থেকে একটি সরু পথ ওপরের দিকে উঠে গেছে। সেই পথের শেষে ভৈরব পোল, পাগড়া পোল পেরোলেই কুম্ভলগড়ের রাজপ্রাসাদ বাদল মহল বা কুম্ভ মহল।
রাণা ফতেহ সিংহের তৈরি এই বাদল মহলে সত্যিই মেঘেদের আনাগোনা। এই মহল রাজপুত স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। দোতলা এই প্রাসাদের দু'টি ভাগ– একটি মহিলা মহল আর অন্যটি পুরুষদের জন্য, আর মাঝে বিশাল একটি খোলা জায়গা। মহিলা মহলের দেওয়ালে রয়েছে অপূর্ব জালির কাজ। সেই ঝরোখার আড়াল থেকেই রাজসভার কাজকর্ম দেখতেন রানিরা। এই কেল্লাতেই ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয় মহারাণা প্রতাপের।
প্রাচীর তৈরির পর থেকেই আক্রমণ শুরু হয়ে যায় দুর্গ জয়ের জন্য। কিন্তু সাতটি ফটক এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর পেরিয়ে আক্রমণ করা যে প্রায় অসম্ভব ছিল, তা বলাই বাহুল্য। এই কারণে একে ‘অজেয়গড় দুর্গ’ বলেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। ১৪৫৭ সালে গুজরাতের শাসক আহমদ শাহ দুর্গ আক্রমণ করে ব্যর্থ হন। এরপর ১৪৫৮-'৬৭ সালের মধ্যে মাহমুদের আক্রমণকেও প্রতিহত করে এই প্রাচীর। তবে ইতিহাস সাক্ষী, কেবলমাত্র একবারই নাকি এই দুর্গ জয় করা সম্ভব হয়েছিল। তবে তা একজন রাজার আক্রমণ নয়, ছিল ৪ জন রাজার যৌথ প্রয়াস। ১৫৭৬ সালে দুর্গ ঘিরে ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর, আমেরের রাজা মান সিংহ, মেবারের রাজা উদয় সিংহ আর গুজরাটের সুলতান। তাঁদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন রাজা। কিন্তু পরে ১৫৮৫ সালে মহারাণা প্রতাপ পুনরায় এই দুর্গ নিজের দখলে নিয়ে নেন। উনিশ শতকে এই দুর্গ ব্রিটিশ শাসকের হাতে চলে যায়।
রাণা কুম্ভর তৈরি এই স্থাপত্য ২০১৩ সালে ইউনেসকো ‘হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা পায় এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর হিসেবেও স্বীকৃতি মেলে কুম্ভলগড়ের। রাজস্থান পর্যটন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আজও আলোর উৎসব হয় কুম্ভলগড় দুর্গে। টানা তিনদিন ধরে চলে এই উৎসব। সাজিয়ে তোলা হয় দুর্গ ও প্রাচীরকে। প্রত্যেক বছর বহু পর্যটক ভিড় জমায় এই আলোর খেলা দেখার জন্য। এইভাবেই দীর্ঘ ৫০০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলছে এই দুর্গ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েও আজও অক্ষতভাবে নিজের গরিমা বজায় রেখে চলেছে সে। বিপদের দিনে মেবারের রাজপরিবারকে যে প্রাচীর নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করেছিল, আজও সে এক অতন্দ্র প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা ভারতের এক ঐতিহ্যও বটে।
















