রহস্যমৃত্যুর ডিপো! ডাকবাংলো মানেই অলৌকিকের হাতছানি

ডাকবাংলোর ভূতের গল্পে স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সেগুলি ঘিরে অসংখ্য রহস্যমৃত্যু। আত্মহত্যা থেকে খুন- সবকিছুই ডাকবাংলোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
রহস্যমৃত্যুর ডিপো! ডাকবাংলো মানেই অলৌকিকের হাতছানি

ইতিহাসের কয়েকটা হারিয়ে যাওয়া পাতা থেকে বিভিন্ন ভূতের গল্পে আমাদের খুব পরিচিত একটা শব্দ ফিরে ফিরে আসে, ডাকবাংলো। এই ডাকবাংলোর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস খুঁজলে আমরা বহু অজানা গল্প এবং তথ্য জানতে পারি।

১৮৪০ সালে লর্ড অকল্যান্ড ডাকবাংলোর নির্মাণ-সংক্রান্ত এক ডিক্রি জারি করেছিলেন। সেই সঙ্গে তার অজান্তেই শুরু হয়েছিল ডাকবাংলোর এক বিচিত্র এবং রহস্যময় অধ্যায়। লর্ড অকল্যান্ডের ডিক্রি অনুযায়ী ভারত-সহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বিভিন্ন দেশে ডাকবাংলোর নির্মাণ শুরু হয়। সেই সময় নির্দেশ অনুযায়ী কোনও এলাকায় দু'টি ডাকবাংলোর মধ্যে দূরত্ব থাকত বারো থেকে পনেরো মাইল। ব্রিটিশদের শাসনকালে কোনও আধিকারিকের ঘোড়া ছুটিয়ে সন্ধেবেলা ডাকবাংলোয় পৌঁছনো থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পথ হারিয়ে জনমানবশূন্য এলাকায় ডাকবাংলো খুঁজে পাওয়া অবধি বিভিন্ন পরিস্থিতি বিভিন্ন ভূতের গল্পে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। শহরের বাইরে নির্জন এলাকায় অবস্থিত ডাকবাংলো ভূতের গল্পের এক একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাংস-ডিমের মিশেলে সাহেবদের জন্য তৈরি এই পদের স্বাদ আজও অটুট

ডাকবাংলোর চৌহদ্দির মধ্যে দিশি মুরগির দেওয়া অপর্যাপ্ত ডিমও থাকত। প্রথমে চড়া আঁচে বসিয়ে তারপর ঢিমে আঁচে অনেকটা সময় ধরে রান্না হতো বলেই বুঝি এত সুস্বাদু ছিল সেই রান্না। এভাবেই ডাকবাংলোর কর্মীদের তৈরি মাংসের একটি সাধারণ পদই বাঙালির পাতে হয়ে উঠল অসাধারণ, এবং এই নামেই নামকরণ হল চিকেন ডাকবাংলো।

'নীল আতঙ্ক'-র অলংকরণ, শিল্পী: সত্যজিৎ রায়

ডাকবাংলো শুধুমাত্র ডাকব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সেগুলি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। যাত্রীদের আশ্রয়, প্রজাদের থেকে তোলা খাজনা রাখার অস্থায়ী ঠিকানা থেকে প্রত্যন্ত এলাকায় সাময়িক আদালত হিসেবেও ডাকবাংলো ব্যবহার করা হতো। সেই সময় কম খরচে থাকার ব্যবস্থা হিসেবে ডাকবাংলোর নাম ছিল। বিভিন্ন নথি থেকে ডাকবাংলোতে এক রাত থাকার খরচের হিসেব পাওয়া যায়। সেই খরচ আট আনা থেকে শুরু হতো এবং তার মধ্যে ঘোড়ার খাওয়ার জন্য ঘাস, আগুন জ্বালানোর কাঠ থেকে যাত্রীদের খাবার জন্য ডিম, মাংসের দাম ধরা থাকত। ডাকবাংলোতে অনেক ক্ষেত্রেই খাটের ব্যবস্থা থাকলেও তোষক, বালিশ অথবা চাদরের কোনও ব্যবস্থা থাকত না। ব্রিটিশ সরকার এটাই আশা করত যে, আধিকারিকরা ঘোড়ার পিঠে নিজের বিছানা সঙ্গে করেই নিয়ে আসবেন। সত্যজিৎ রায়ের লেখা 'নীল আতঙ্ক' গল্পে আমরা সেই তথ্যের সমর্থন পাই। সেই গল্পে অনিরুদ্ধকে ডাকবাংলোর চৌকিদার সুখনরাম বলেছিল যে, ডাকবাংলোতে খাট রয়েছে, কিন্তু বিছানা পাওয়া যাবে না।

বিভিন্ন পুরনো নথি থেকে ডাকবাংলোর অস্থায়ী আদালতের বিভিন্ন ঘটনা জানা যায়। তার মধ্যে একটি বিচিত্র ঘটনা লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্ট্যানফোর্ডের লেখা থেকে জানা যায়। তার লেখা অনুযায়ী, এক প্রত্যন্ত এলাকার ডাকবাংলোকে একটা অস্থায়ী আদালতে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। একজন বিচারক সেখানে বেশ কিছুদিন থাকবেন বলে ঠিক করেছিলেন। বিচারক বিচার-সংক্রান্ত সমস্ত কাজ একতলায় করতেন। একদিন বিচারকের কাজের সময় তাঁর স্ত্রী দোতলায় বন্ধুদের সাথে জুয়া খেলছিলেন। জুয়া খেলার হইহট্টগোলের ফলে বিচারকের কাজে অসুবিধে হচ্ছিল। তিনি বিরক্ত হয়ে তার স্ত্রীকে হইহট্টগোল কম করতে অথবা জুয়া খেলতে বারণ করায় তার স্ত্রী একতলায় এসে সবার সামনেই বিচারককে জুতোপেটা করেন। বিচারক অপমানিত হয়ে সেইদিন কাজ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বিভিন্ন নথি ঘেঁটে এই তথ্যও পাওয়া যায় যে, সিপাহী বিদ্রোহের শুরুতে বহু ব্রিটিশরা ডাকবাংলোগুলিকে তাদের নিরাপদ আশ্রয় এবং পালানোর পথ হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

ডাকবাংলোর ইতিহাসের শুরুতে বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন লোক নিয়োগ করা হলেও পরবর্তীকালে একমাত্র চৌকিদারের ওপর ডাকবাংলোর সমস্ত কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা একাধারে রান্নার ঠাকুর অন্যদিকে পাহারাদার আবার কখনও সমস্ত ফাইফরমাশ খাটার লোকের কাজ করতে শুরু করেছিলেন। সাহেবের উগ্র 'চৌকিদার' ডাক থেকে সাধারণ মানুষের 'কেউ আছেন' ডাক শুনলেই তারা হাজির হয়ে যেত। ডাকবাংলোর মতোই তাদের চৌকিদাররা আমাদের পড়া অথবা শোনা বিভিন্ন ভূতের গল্পের এক-একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। ডাকবাংলোর চৌকিদার বললেই আমাদের মনে হয়, একমাথা পাকা চুল, শীর্ণকায় এক বৃদ্ধ হাতে লন্ঠন অথবা হ্যারিকেন নিয়ে এসে বলে, এখানে বহু বছর কেউ আসেনি। তারা চমৎকার রান্না করতে পারে। বিভিন্ন গল্পে তাদের তৈরি মাংসের খিচুড়ি থেকে মুরগির মাংসের ঝোল অথবা ডিমের পরোটার কথা পাঠকের মনে সেই খাবার খাওয়ার ইচ্ছা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ভূতের গল্প পড়ে মনে হয়, এই লোকগুলো যেন ডাকবাংলোর অংশ হয়ে থেকে গিয়েছিল। তাদের যেন অন্য কারও সঙ্গেই সেইরকম যোগাযোগ নেই। গল্পে এতটা গুরুত্ব পাওয়া ডাকবাংলোর চৌকিদারদের নিয়ে ইতিহাসের পাতায় সেইরকম কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো সেই সময় নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে করা এই লোকগুলো পরবর্তীকালে যে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, সেই কথা কেউ মনে করেননি।

ডাকবাংলোর ভূতের গল্পে স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সেগুলি ঘিরে অসংখ্য রহস্যমৃত্যু। আত্মহত্যা থেকে খুন- সবকিছুই ডাকবাংলোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কখনও একাকীত্ব, আবার কখনও প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মহত্যার বহু ঘটনা বিভিন্ন ডাকবাংলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে লোভ এবং প্রতিহিংসা থেকে খুন। বিভিন্ন নির্জন এলাকার ডাকবাংলোয় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো বিভিন্ন ভূতের গল্পের আদর্শ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।

বর্তমানে ভারতে খুব অল্পসংখ্যক ডাকবাংলোর সন্ধান পাওয়া যায়। আজ তাদের পরিচয় বদলে গিয়েছে। তারা আজ বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়, অধিকারিকের বাড়ি আবার কখনও হোটেলে পরিণত হয়েছে। ডাকবাংলো এবং তার পরিচয়ের থেকে দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে তার ইতিহাস। বেঁচে থাকা ডাকবাংলোগুলোই সেই বিচিত্র ইতিহাসের কিছুটা নিজের সঙ্গে লুকিয়ে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।