সন্তান দত্তক থেকে হাসপাতালে হাজিরা, সমপ্রেমীদের যে যে এক্তিয়ার রুখল আদালত
Same-sex marriage verdict: আজ থেকে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই সমকামী বিবাহের আইনি স্বীকৃতির জন্য লড়াই চালাচ্ছেন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই মামলায় রায়দান ছিল মঙ্গলবার।

বহু লড়াই, বহু সংগ্রামের পর সমপ্রেমে বৈধতা মিলেছিল। কিন্তু শুধু প্রেমের স্বীকৃতিই তো যথেষ্ট নয়। দু'জন ভালোবাসার মানুষকে একসঙ্গে থাকতে হলে সামাজিক স্বীকৃতিটুকুও তো জরুরি। সরকারের সঙ্গে জরুরি সন্তানকে বড় করার অধিকারও। আর সেখানে এসেই বারবার আটকে যাচ্ছে দেশের শীর্ষ আদালত। সমলিঙ্গের প্রেমে স্বীকৃতি দিলেও সমলিঙ্গ বিয়ের পক্ষে রায় দিতে পারল না সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতের রায়ের দিনেও কোনও আশার আলো দেখতে পেলেন না 'এলজিবিটিকিউ' সম্প্রদায়ের মানুষ। এমনকী কাঁটা বিঁধে রইল সন্তান দত্তক নেওয়ার ব্যাপারেও। এদিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চে থাকা তিন বিচারপতিই বিরোধিতা করলেন সন্তান দত্তকের। পক্ষে সায় দিয়েছেন অবশ্য বাকি দুই বিচারপতি।
২০১৮ সালে সমলিঙ্গের প্রেমকে স্বীকৃতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল ভারতীয় দণ্ডবিধিক ৩৭৭ ধারাকে। সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল রামধনু মিছিল। তবে দেশের এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষের লড়াইটা শুরু হয়ে গিয়েছিল সেদিন থেকেই। কারণ শুধু স্বীকৃতিই নয়, স্বপ্নটা ছিল আরও উঁচু এবং বড়। সেই স্বপ্নের পথ ধরেই ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সমপ্রেমী মানুষজন। আর পাঁচটা মানুষের মতো দাম্পত্য ও সন্তান পালনের স্বপ্ন নিয়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Same Sex Marriage Supreme Court Verdict : আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই রায়ের মানে এই নয় যে ক্যুইয়ার ব্যক্তিরা প্রেম বা যৌনতার সম্পর্কে যেতে পারবেন না।
সেই মামলা ওঠে প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে। যেখানে ছিলেন বিচারপতি সঞ্জয় কউল, বিচারপতি রবীন্দ্র ভাট, বিচারপতি হিমা কোহলি ও বিচারপতি পিএস নরসিমহা। সমলিঙ্গের বিয়ের রায়ের বৈধতা নিয়ে কথা বলার প্রসঙ্গেই উঠেছিল সন্তান দত্তকের প্রসঙ্গ। সমকামী যুগলেরা সন্তান দত্তক নেওয়া নিয়ে পক্ষে মতামত জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় ও বিচারপতি কউল। তাঁরা মনে করেছেন, সমপ্রেমী যুগলদেরও সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন বিচারপতি রবীন্দ্র ভাট, বিচারপতি হিমা কোহলি ও বিচারপতি পিএস নরসিমহা। ফলে রায় ৩:২ অনুপাতে বিভক্ত হয়েছে। বিচারপতি রবীন্দ্র ভাট, বিচারপতি হিমা কোহলি ও বিচারপতি পিএস নরসিমহা প্রধান বিচারপতির মতামতের সরাসরি বিরোধিতা করেন। যার উত্তরে প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় বলেন, " শুধুমাত্র বিষমকামী যুগলেরাই ভালো অভিভাবক হতে পারেন, এমন অনুমান আইন বা আদালত করতে পারে না। পাশাপাশি তিনি আরও জানান, সমলিঙ্গের যুগলদের সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি, যা সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করে।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Same Sex Marriage: নেদারল্যান্ডস ২০০০ সালে প্রথম দেশ হিসেবে সমকামী বিয়েকে বৈধতা দেয়। এশিয়ায়, তাইওয়ান প্রথম দেশ যারা ২০১৯ সালে এই ধরনের বিয়েকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজ থেকে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই সমকামী বিবাহের আইনি স্বীকৃতির জন্য লড়াই চালাচ্ছেন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই মামলায় রায়দান ছিল মঙ্গলবার। গতবার আদালত নিয়ে হাসিমুখে ফিরতে পারলেও এদিনের রায়ের পর ম্লানমুখেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে এলজিবিটিকিউ-দের। আদালত বিবাহের স্বীকৃতি নিয়ে কোনও একক সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। তাই এ ব্যাপারটি কেন্দ্রীয় কমিটির হাতেই ছেড়েছে তারা। এর আগেও এই মামলায় বারবারই কেন্দ্রের হাতেই সিদ্ধান্ত ছাড়ার দিকে হেলে থেকেছে সুপ্রিম কোর্ট। এ বারেও তার ব্যতিক্রম হল না। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় কমিটিকে পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালতের সাংবিধানিক বেঞ্চ।
এ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় জানান, সমলিঙ্গ সম্পর্কের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য কেন্দ্রের একটি বিশেষ কমিটি গড়া প্রয়োজন। ওই সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষিত করার দায়িত্বটি পালন করবে ওই কমিটি। তবে এ কথাও বারবার মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি প্রধান বিচারপতি যে বিবাহ কোনও অনড়, অটল বিষয় নয়। তাতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য, "ব্যাক্তিগত স্তরে যে কোনও কাজকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। সামাজিক যে বিবাহ আজকে সমাজে স্বীকৃত, তা কিন্তু আইন না থাকলে সম্ভব হত না।" একই সঙ্গে সমকাম যে কোনও শহুরে বিষয় নয়, তা-ও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
২০১৮-র সেই যুগান্তকারী কার্যত পাল্টে দিয়েছিল এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থান। যে সমাজ একদিন দুষ্কৃতির চোখে দেখে এসেছে সমকামী বা সমপ্রেমীদের, সেই দৃষ্টিভঙ্গির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে আজ। সমকামীতা যে কোনও অপরাধ নয়, আদালতের রায়ে সেই জায়গাটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কার্যত সমপ্রেমী মানুষের কাছে সেটা ছিল স্বাধীনতার দিন। তার পর থেকে তথাকথিত সমাজের কাছে অনেকটাই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ওই সম্প্রদায়ের মানুষ। আর তার পরেই স্বাভাবিক ভাবে সামনে এসেছিল সমপ্রেমী বিবাহ ও সন্তান দত্তকের দাবি। বিবাহ স্বীকৃত না হলে, বিমা থেকে শুরু করে হাসপাতালে অসুস্থতার সময় সঙ্গী হিসেবে বন্ডে সই করার সুবিধার মতো অজস্র সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হবেন সমপ্রেমীরা। যা মঙ্গলবারের সুপ্রিম রায়ে এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের নানা শহর থেকে প্রায়শই সমপ্রেমী বিবাহের খবর সামনে আসে। তবে সেই পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অজস্র কাঁটা। বহু ক্ষেত্রেই আজও সমপ্রেমী মানুষদের একঘরে করে রাখা হয়, মেলে না অনেক সুযোগসুবিধা এবং অধিকারও। তবে কখনও না কখনও সেই অধিকারও যে আদায় করে নেবেনই সমপ্রেমীরা, সেই আশা তাঁরা ছাড়ছেন না মোটেই। আর সেই সঙ্গেই মিলবে সন্তানকে বড় করার অধিকারও।







