NISAR: ভূমিকম্প থেকে জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানাবে স্যাটেলাইট! ‘নিসার’-র থেকে কী কী জানা যাবে?

NISAR satellite : মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সমগ্র ভূখণ্ড, এমনকি তুষারাবৃত অঞ্চলের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করে ফেলবে।

Shamim Haque Mondal
৪ মিনিট
NISAR: ভূমিকম্প থেকে জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানাবে স্যাটেলাইট! ‘নিসার’-র থেকে কী কী জানা যাবে?

শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে বুধবার বিকেল ৫ টা ৪০ মিনিটে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে নাসা ও ইসরোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ, ‘নাসা-ইসরো সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার’ বা ‘নিসার’। প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার খরচা করে নির্মিত ২,৩৯২ কেজির এই স্যাটেলাইটটি জিএসএলভি-এমকে২ রকেটে চেপে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে। মিশন সফল হলে আগামী পাঁচ বছর ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪২ কিলোমিটার উপর দিয়ে নীল গ্রহকে পর্যবেক্ষণ করবে এবং আমাদের উন্নত মানের ছবি ও তথ্য পাঠাবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এতে দুটো আলাদা আলাদা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট অ্যাপারচার রেডার রয়েছে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে কয়েক মিলিমিটারের মধ্যেও যদি কোনো পরিবর্তন হয়, তাও ধরা পড়বে এই কৃত্রিম উপগ্রহের রেডারে।

স্যাটেলাইটের কথা বললেই রেডারের প্রসঙ্গ চলে আসে, তখন আমাদের চোখের সামনে ভাসে বড় বড় অ্যান্টেনার ছবি, যেগুলো থেকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সংকেত (মাইক্রো ওয়েভ, রেডিও ওয়েভ) পাঠানো হয়, আবার বিভিন্ন বস্তু থেকে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা সংকেতগুলোকে সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। সেখান থেকে জানা যায় তাদের দূরত্ব, গতিবিধি, আকার ইত্যাদি।

‘সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার’ এক বিশেষ ধরণের উন্নত প্রযুক্তির ইমেজিং রেডার, যেটিতে বিশাল আকারের অ্যান্টেনার ব্যবহার না করেও উন্নত মানের ছবি তোলা সম্ভব। সাধারণত মহাকাশে ব্যবহারের জন্যই এটি বানানো। নিসারে স্থাপিত অ্যান্টেনার ব্যাস ১২ মিটার, যেটি থেকে প্রাপ্ত ছবি পৃথিবী পৃষ্ঠে অবস্থিত ২০ কিমি ব্যাস বিশিষ্ট অ্যান্টেনার সাথে পাল্লা দেওয়ার মতোও ক্ষমতা রাখে।

বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে কাজ করা এই স্যারের সুবিধা কি?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একটি তারার দু-বার মৃত্যু! বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন তথ্য কী বলছে?

Death of a Star : সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন যা একবার নয়, দু-বার বিস্ফোরিত হয়েছে, অর্থাৎ একটি নক্ষত্রের দু-বার মৃত্যু!

সাধারণত L-ব্যাণ্ড ও S-ব্যাণ্ড দুই ধরনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের জন্য কাজ করে নিসার। উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট মাইক্রো ওয়েভ ব্যবহার করে L-ব্যাণ্ড রেডার- ধোঁয়া, মেঘ, ঘন জঙ্গল ভেদ করে ছবি তুলতে সক্ষম। অপরদিকে ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যাবহার করায় S-ব্যাণ্ড রেডার শস্য ক্ষেত, জলাশয় ইত্যাদির ছবিও তোলে। এমনকি শস্যের বৃদ্ধি কেমন হচ্ছে সে তথ্যও আমাদের সামনে হাজির করে দিতে পারে। নিসারে এই দুই ব্যাণ্ডের রেডার একসঙ্গে কাজ করায় কোনো অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের ছবি একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়, যেটি আলাদা আলাদাভাবে কখনো সম্ভব হতো না। কারণ সেক্ষেত্রে একই সময়ে একই জায়গা পর্যবেক্ষণ করা যেত না।

ইসরো ও নাসার যৌথ উদ্যোগে তৈরি স্যাটেলাইট 'নিসার' উৎক্ষেপণ

দুটো ভিন্ন স্যারকে একত্রে স্থাপন করা প্রযুক্তিবিদদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ কাজ করতে প্রায় এক দশক লেগে যায় বিজ্ঞানীদের। কোভিডের সময় নাসার জেট প্রপালশান ল‍্যাবরেটরি ও ইসরোর স্পেস অ‍্যাপ্লিকেশন সেন্টারের বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও প্রোকৌশলীদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল এই নিসার। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর মার্কিন সফরের পর নাসার তৎকালীন প্রশাসক চার্লস বোল্ডেন ও ইসরোর চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণানের মধ্যে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারি স্যাটেলাইট মিশন পরিচালনার জন্য চূক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ছিল দুটি মহাকাশ জয়ী দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আলোর রং পরিবর্তন হয়ে যাবে! পদার্থ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা মেটালেন্স কী?

Meta-lens: ৮০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত আলোক রশ্মি (IR rays) মেটালেন্সের মাধ্যমে প্রেরণ করা হলে, ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো উদ্ভূত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মিলিত হয়।

এই মিশনে L-ব্যান্ড সিনথেটিক অ্যাপারচার রেডার, অ্যান্টেনা, উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস রিসিভার, সলিড স্টেট রেকর্ডার, পেলোড সিস্টেম প্রভৃতি সরবরাহ করেছে নাসা।আবার ইসরো জোগান দিচ্ছে S-ব্যান্ড রেডার, লঞ্চ ভিকেলের, সেই সঙ্গে উৎক্ষেপণের ব্যবস্থাও করেছে। এই মিশনে মোট খরচের বেশীরভাগটাই (প্রায় ১.১৬ বিলিয়ন ডলার) করেছে নাসা। ইসরো খরচা করেছে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার। দুটি সংস্থাই স্বতন্ত্র ভাবে নিজেদের জায়গা থেকেই পরিচালনা করতে পারবে।

নিসার যা তথ্য আমাদের দিতে পারবে

পৃথিবী পৃষ্ঠে ভূমিরূপের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, গাছপালার পরিবর্তনের পাশাপাশি কোন হিমবাহ কত দ্রুত গলে যাচ্ছে সে-সব তথ্য পৃথিবীতে পাঠাবে এই উপগ্রহ। ভূমিকম্পের আগে ফল্ট-লাইনের পরিবর্তন, জলবায়ুর হঠাৎ কোনো পরিবর্তন হলে, এই যে বছর বছর আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন‍্যা হয়, পাহাড়ে ধস নামে, এসব ক্ষেত্রে বন্যার আগাম হদিশ দিতে পারবে নিসার। এর পাশাপাশি, সমুদ্রের বরফের শ্রেণিবিন্যাস, জাহাজ শনাক্তকরণ, উপকূলরেখা পর্যবেক্ষণ, ঝড়ের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ, মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও ভূপৃষ্ঠের জল সম্পদের ম্যাপিং করতে পারবে এই উপগ্রহ। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, এই স‍্যাটেলাইট প্রতি ৯৭ মিনিটে পৃথিবীকে একবার চক্কর দেবে; এবং মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সমগ্র ভূখণ্ড, এমনকি তুষারাবৃত অঞ্চলের বিস্তৃত মানচিত্র তৈরি করে ফেলবে।

আমাদের ইসরো যেখানে মহাকাশ অভিযানে একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি করছে, সেখানে এই যৌথ অভিযানের কি খুব দরকার ছিল?

এর উত্তর দেওয়ার আগে আমরা একটু পিছিয়ে যাই। ২০১৪ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও নিসারের মতো যৌথ মিশনের ধারণার জন্ম হয়েছে আরও ৭ বছর আগে। ২০০৭ সালে একটি মার্কিন কমিটি গঠন করা হয়, যারা ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, মেঘাচ্ছন্ন ভূমিরূপের পরিবর্তন, হিমবাহের প্রবাহ, ভূগর্ভস্থ জলস্তর, হাইড্রোকার্বন ভাঁড়ারের মতো বিষয়ের উপরে বিরামহীন নজরদারি চালানোর জন্য একটা উপগ্রহ ভিত্তিক মিশনের পরিকল্পনা করে। পরের বছর থেকে সেই মতো কার্যক্রমও শুরু করে নাসা। চার বছর পরে ইসরো এই মিশনে সামিল হয়। যদিও এটিই প্রথম নয়, এর আগে, চন্দ্রযান-১ মিশনেও পেলোড সরবরাহ করেছিল নাসা, কিন্তু একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিযান এই প্রথমবার।

এই মিশন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থা গুলি একে অপরের প্রতিযোগী না হয়ে পরিপূরক হতে পারে। এর ফলে শুধু যে মিশনের খরচের বোঝা ভাগাভাগি হয়ে যাবে তা নয়, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত খামতি মিটবে। দরকার কেবল একটা সমন্বিত লক্ষ্য, তবেই প্রস্তুত করা সম্ভব পারস্পারিক সহযোগিতা পূর্ণ মহাকাশ অভিযানের নীলনকশা ।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।