একটি তারার দু-বার মৃত্যু! বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন তথ্য কী বলছে?

Death of a Star : সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন যা একবার নয়, দু-বার বিস্ফোরিত হয়েছে, অর্থাৎ একটি নক্ষত্রের দু-বার মৃত্যু!

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
একটি তারার দু-বার মৃত্যু! বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন তথ্য কী বলছে?

কোনো নক্ষত্রের জীবন কত নান্দনিক হবে, তা নির্ভর করে তাদের ভরের ওপর। যার আকার যত বেশি, সে তত তাড়াতাড়ি জ্বালানি খরচা করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, আমাদের সূর্য বেশ ছোট আকারের নক্ষত্র। তাই তার মৃত্যুও বিশাল-বিশাল তারকাদের মতো অত জাঁকজমকপূর্ণ নয়। আমাদের সূর্যের চেয়ে দশ গুণ ভরের তারাদের জীবনকাল প্রায় দশ মিলিয়ন বছর! আবার সূর্যের ভরের অর্ধেক ভরের তারারাও প্রায় বিশ মিলিয়ন বছর টিকে থাকে।

বড়ো-বড়ো তারাদের মৃত্যুর সময় এক বর্ণময় বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়, যাকে বলে সুপারনোভা। এতদিন ধারণা ছিল বড়ো-বড়ো নক্ষত্রের জীবনে এই সুপারনোভা একবারই দেখা যায়। অর্থাৎ নক্ষত্ররাও একবার মারা যায়। সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন যা একবার নয়, দু-বার বিস্ফোরিত হয়েছে, অর্থাৎ একটি নক্ষত্রের দু-বার মৃত্যু! গত ২ জুলাই নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-তে প্রকাশিত একটি পেপারে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো সুপারনোভার নতুন এক চিত্র তুলে ধরেছেন একদল গবেষক, যেটা থেকে প্রমাণ মিলেছে যে কিছু মৃতপ্রায় নক্ষত্রের বেলায় এই দ্বৈত বিস্ফোরণ দেখতে পাওয়া যায়।

কৃষ্ণগহ্বর

দক্ষিণ আফ্রিকার চিলিতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান স্পেস অর্গানাইজেশন, ESO-এর ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (VLT) এবং মাল্টি ইউনিট স্পেকট্রোস্কোপিক এক্সপ্লোরারের (MUSE) সাহায্যে সুপারনোভার অবশিষ্টাংশ, SNR ০৫০৯-৬৭.৫-এর যে ছবি তুলেছেন বিজ্ঞানীরা, তাতে দুটি ক্যালসিয়ামের খোলসেরই দেখা পাওয়া গেছে। দুটি খোলস দুটি আলাদা-আলাদা বিস্ফোরণের গল্প বলে। দু-বছরের মধ্যে ৩৯ টি নিখুঁত রাত্রি খুঁজে বার করা হয়েছিল, ছবিটি তোলার জন্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সূর্যের চেয়ে ১০ হাজার গুণ বড় নক্ষত্র! উঠে এল যে ছবি...

celestial monster : সূর্যের চেয়েও ১০ হাজার গুণ বড় তারা রয়েছে মহাকাশে! সামনে এল বিরল দৃশ্য...

নক্ষত্রের মৃত্যুদৃশ্য

কীভাবে ঘটল এই দ্বৈত বিস্ফোরণ?

আমাদের থেকে ১৬০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে, Large Magellanic Cloud নামের এক ক্ষুদ্র গ্যালাক্সির গভীরে একটি শ্বেত বামন নক্ষত্র অবস্থান করছিল, তার পাশে ছিল আর একটি নক্ষত্র, যেটির হিলিয়াম ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এর ফলে শ্বেত বামনটি হিলিয়ামের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। হিলিয়ামের এই পরিমণ্ডল ক্রমশ অস্থির হয়ে পড়ে, এর ফলে ঘটে বিস্ফোরণ; সেই সঙ্গে জন্ম নেয় উচ্চ শক্তি বিশিষ্ট শকওয়েভ (শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী অ-সরলরৈখিক তরঙ্গ, যেটি মাধ্যমের মধ‍্য দিয়ে যাওয়ার সময় মাধ‍্যমের চাপ, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটাতে পারে)। যেটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত করে, ফলে দেখা যায় চুড়ান্ত ও শেষ সুপারনোভা বিস্ফোরণ। উভয় বিস্ফোরণেই ক্যালসিয়াম তৈরি হয়, আর সে-ছাপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে ছবিতে। পৃথিবীতে কোনো বিস্ফোরণের ছবি দেখে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা যেমন অনুমান করার চেস্টা করেন ঠিক কী ঘটেছিল সেই সময়, তেমনই এই দ্বৈত বিস্ফোরণের ছবি মহাজাগতিক গোয়েন্দাদের সামনে অনেক রহস্য উন্মোচিত করে। এতদিন জ‍্যোতিরবিজ্ঞানীদের কাছে তাত্বিক ব্যপার ছিল এই দ্বৈত বিস্ফোরণ, সবে তার প্রমাণ মিলল। কিন্তু এই মহাজাগতিক ঘটনার ফলে চন্দ্রশেখর সীমা (Chandrasekhar Limit)-র ওপর একটা প্রশ্ন চিহ্ন চলে আসে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহাবিশ্ব মোটা হচ্ছে! এর বয়স কত? যেভাবে মেপেছিলেন এই বিজ্ঞানী

Hubble's law: হলভর্তি দর্শকের সামনে হাবল প্রমাণ করেন, আমাদের চেনা শাশ্বত মহাবিশ্ব আর আগের মতো চিরন্তন নয়, এ সতত পরিবর্তনশীল!

সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর

চন্দ্রশেখর সীমা কি ?

ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী, সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৩০ সালে জাহাজে করে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে ‘দ‍্যা ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়াল হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ নামের একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি দেখান যে একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভর ১.৪৪ সৌর ভরের (M☉) বেশি হলে নক্ষত্রটি তার নিজস্ব মহাকর্ষের কারণে চুপসে যায়। ইলেকট্রন অবক্ষয় চাপ নক্ষত্রটিকে চুপসে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে না, এবং ক্রমশ নক্ষত্রটি আরও সংকুচিত হতে শুরু করে, অবশেষে সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়। এক কথায় চন্দ্রশেখর সীমা নির্ধারণ করে যে একটি নক্ষত্র শেষ পর্যন্ত কি একটি ধোঁয়াটে শ্বেত বামনে পরিণত হবে, নাকি সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে নিউট্রন তারকা বা কৃষ্ণগহ্বরে রূপ নেবে।

এক্ষেত্রে শ্বেত বামনটির ভর চন্দ্রশেখর সীমা ছোঁয়ার আগেই বিস্ফোরণ হতে দেখা যায়। হাইডেলবার্গ ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল স্টাডিজের বিজ্ঞানী, গবেষকদলের একজন সদস্য সেইটেনজা বলেন,

এই অনুসন্ধানগুলি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে সাদা বামনরা বিখ্যাত চন্দ্রশেখর ভর সীমাতে পৌঁছানোর আগেই বিস্ফোরিত হতে পারে এবং 'ডাবল-ডিটোনেশন' প্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিতে ঘটে।

আমরা জানি যে আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। ফলে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। আর সে-দূরত্ব মাপতে টাইপ ১এ সুপারনোভা মহাজাগতিক ফিতার মতো কাজ করে। কারণ এগুলো থেকে সুষম আলো বেরিয়ে আসে। জ‍্যোতিরবিদদের কাছে এ যেন এক আদর্শ মোমবাতি। নক্ষত্রের মৃত্যুর পাশাপাশি, তাঁদের এই গবেষণা টাইপ ১এ সুপারনোভার উৎপত্তির কারণ ও তারা কীভাবে বিস্ফোরিত হয় জানতে পারলে, হদিশ পাওয়া যাবে তাদের সুষম আলোর রহস্য। এই মহাজাগতিক দ্বৈত বিস্ফোরণ অদূর ভবিষ্যতে সে-সবের রহস্য উন্মোচিত করবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।