কবর থেকে চুরি গিয়েছিল মাথার খুলি: শেক্সপিয়রের সেই রহস্যময় করোটির খোঁজ আজও চলছে

Sindhu Som
৪ মিনিট
কবর থেকে চুরি গিয়েছিল মাথার খুলি: শেক্সপিয়রের সেই রহস্যময় করোটির খোঁজ আজও চলছে

সেই রাতে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। হোলি ট্রিনিটি চার্চের পূর্ব দিকটায় হঠাৎ পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। এক নয়, একাধিক মানুষের পদচারণার শব্দ। পাথুরে দেওয়াল শেষ হতেই রাতের সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা ছায়ামূর্তিগুলো নজরের আওতায় এল। হাতে লণ্ঠন। আঁচ অত্যন্ত কমানো। আলো-আঁধারির ষড়যন্ত্রে হাতের অস্ত্রগুলোও খানিক ফুটে উঠেছে। এদিক ওদিক কী একটা খুঁজছে লোকগুলো। কয়েকটা মুহূর্ত। মৃদু আলো পড়ল একটা হেডস্টোনে। এই তো। 'কার্সড্‌ বি হি দ্যট মুভস্‌ মাই বোন'--আমার অস্থি যে স্থানচ্যুত করবে, তার কপালে নেমে আসুক ভয়ঙ্কর অভিশাপ। এই কবরের খোঁজেই এসেছে তারা। কয়েকজন মিলে হাতাহাতি কবরের ওপরের ভারি পাথরটা সরিয়ে ফেলা গেল। এইবার মাটি খোঁড়ার অপেক্ষা। বেশ কিছুটা খোঁড়ার পর অবশেষে ওদের একজন অতি সাবধানে মাটি থেকে তুলে নিল জিনিসটা। বাকিরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল দেখার জন্য। লোকটার হাতে একটা মানুষের মাথার খুলি। খুলিটা বেশ পুরনো। নর-করোটিটা হাতে নিয়ে দলপতির চোখ চকচক করে উঠল। এই সেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মাথাদের একটি এখন তার হাতের মুঠোয়। খুলিটা শেক্সপিয়রের।

হাতে খুলি নিয়ে একটি লোক অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে সবাইকে–ব্যাপারটা নতুন নয়, বেশ পুরনো। বহুবার বহুরকম ভাবে অভিনীত হয়েছে মঞ্চে হ্যামলেট নাটকের এই বিখ্যাত দৃশ্য। কাজেই শেক্সপিয়রের অস্তিত্ব এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তা যদি নাটকের ক্ষেত্র থেকে বাস্তবের রঙ্গমঞ্চে চলে আসে? কবর থেকে মৃতদেহ তুলে কাটাছেঁড়ায় শেক্সপিয়রের নাটকের জুড়ি মেলা ভার, অন্তত তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে। কিন্তু কালচক্রে এমন ঘটনা ঘটেছিল খোদ তাঁর সঙ্গেও।

শেক্সপিয়রকে নিয়ে বা তাঁর কবর নিয়ে নানা কিংবদন্তি চলে আসছে শতকের পর শতক। এমনকী একবার তাঁর গাঁজা খাওয়ার গল্পে উৎসাহিত হয়ে কবরের ভিতরে থাকা কঙ্কাল পরীক্ষা করতে চেয়েছিল এক যুবক। হাড়ে যদি তার চিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু হোলি ট্রিনিটি চার্চ অনুমতি দেয়নি। চার্চের নিষেধের এই কড়াকড়ি দিনের পর দিন বাড়িয়ে দিয়েছে শেক্সপিয়রপ্রেমীদের আগ্রহ, উৎকণ্ঠা। প্রায় দেড়শো বছর আগে, ১৮৭৯ সালে 'দ্য আর্গোসি' ম্যাগাজিনে ছাপা হয় একটি চমকপ্রদ ঘটনা। যার খানিকটা ইতিমধ্যে পাঠক পড়ে ফেলেছেন শুরুতেই।

আর্গোসি-তে ছাপা ওই প্রবন্ধে লেখক বলেন, তাঁর বন্ধুর (মিঃ এম) কাকা ফ্র্যাঙ্ক চেম্বারস্‌ খোদ ছিলেন সেই গ্রেভ-রবারদের দলপতি। সেকালের বিখ্যাত লেখক এবং পার্লামেণ্টের সদস্য হোরেস ওয়ালপোল ৩০০ গিনির একটা পুরস্কার ঘোষণা করেন। যে বা যারা তাঁকে শেক্সপিয়রের মাথার খুলি এনে দিতে পারবে, পুরস্কার পাবে। অবাক হচ্ছেন? সে সময়ে এ জিনিস আকছার দেখা যেত। বিজ্ঞানের নাম ভাঁড়িয়ে ফ্রেনোলজি তখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মাথার খুলির মাপজোখেই নাকি যে কোনও ব্যক্তির বুদ্ধির দৌড় বোঝা যায় জলবৎ তরলং—এবং তারই ফল সেই খুলি অভিযান। ফ্র্যাঙ্ক তখন স্ট্র্যাটফোর্ডের ডাক্তার। পুরস্কারের আশায় দলবল নিয়ে ফ্র্যাঙ্ক চুরি করে আনেন শেক্সপিয়রের করোটি। এরপরই শুরু হয় নানা অদ্ভুত কাণ্ড কারখানা।

করোটির অভিশাপ

নিজের কবরফলকে নিজেরই সনেট লেখা খোদাইয়ের চল কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে দেখাই যায়। শেক্সপিয়র থেকে কিটস কেউই তার ব্যতিক্রম নন। তবে এপিটাফের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে শেক্সপিয়রকে ব্যতিক্রমী বলতেই হয়। এপিটাফে অভিশাপও সে কালে খুব প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেই সব কবরফলক মূলত পাপীতাপী অবিশ্বাসীদের স্বর্গীয় অভিশাপ দিত। সেখানে শেক্সপিয়র অভিশাপ দিলেন চার্চেরই একটি পদকে, যাদের লোকে সেক্সটন বলে চেনে। এরা সাধারণত পুরনো কবর খুঁড়ে নতুন কবরের জন্য জায়গা তৈরি করত।

সে যাই হোক, করোটি হাতিয়ে চেম্বারস্‌ চিঠি দিলেন ওয়ালপোলকে। কিন্তু ওয়ালপোল পুরস্কার দিতে অস্বীকার করলেন। এই শুরু হল বিশ্বাসঘাতকতার পালা। হতাশ হয়ে ক্রেতার খোঁজ করতে শুরু করলেন ফ্র্যাঙ্ক। তালেগোলে এক বন্ধু ব্যাপারটা জেনে ফেলেন তাঁর। সেই বন্ধু বারংবার চেম্বারস্‌কে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন যে খুলিটি চেম্বারস্‌ যথাস্থানে রেখে আসবে। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চেম্বারস্‌ তার ডাকাতির সহকারী টম ডায়ারের হাতে খুলিটা আবার ফেরত পাঠালেন। হপ্তা খানেক পরে চার্চে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন কবর ঢাকার জন্য ব্যবহৃত স্ল্যাবটিতে কিঞ্চিৎ চিড় ধরেছে। ব্যাপার কী? ডায়ারকে চাপাচাপি করতে সে জানায় স্ল্যাবটা কতটা ভারি সে ঠিক আন্দাজ করতে পারেনি। খুলিখানা সে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু চেম্বারস্‌ ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারেন না।

কবির খুলি নিয়ে আধুনিক পরীক্ষানিরীক্ষা

স্ট্যাফোর্ডশয়র ইউনিভার্সিটির যে পুরাতত্ত্ববিদ গোটা ব্যাপারটা দেখাশোনা করছিলেন, তিনি কেভিন কলস্‌। বিবিসির একটি সাক্ষাৎকারে কেভিন জানান, রেডার স্ক্যানের ফলাফল ইত্যাদি সমস্ত তথ্য ইঙ্গিত করছে ১৮৭৯-র সেই রিপোর্টেরই দিকে। নিছক গল্প নয়, বরং সত্যিই। এমনকী কবরের স্ল্যাবটা মেরামত করার চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। কবরটিও অগভীর। মাত্র তিন ফুট গর্ত সেখানে। কেভিন নিশ্চিত করোটি সে কবরে নেই।

তবে একটি খুলি বাজারে শেক্সপিয়রের খুলি বলে ঘুরছিল। ওরকেস্টার থেকে মাইল ১৫ দূরে পাওয়া গিয়েছিল সেটা। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে খুলিটা ৭০ বছর বয়সি এক মহিলার মাথার খুলি।

শেক্সপিয়রকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষত এত ধরনের গল্প তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে যে বাস্তবে তাঁর করোটি কোথায় রয়েছে জানার উপায় নেই। পবিত্র সে কবর খুঁড়তেও দেবে না হোলি ট্রিনিটি চার্চ। অন্তত এমনটাই জানিয়েছেন রেভারেণ্ড প্যাট্রিক টেইলর। ফলে আগামীর আরও নানা তত্ত্বের গর্ভে নিহিত থাকুক সে অভিশপ্ত খোঁজ। ততদিন কবরের নীচে শুয়ে একটু শান্তি উপভোগ করুন বরং শেক্সপিয়র। বলা যায় না, আবার কে কখন তাঁকে মাটি খুঁড়ে টেনে আনে।

চিত্রঋণ—চ্যানেল 4

তথ্যঋণ—

BBC News. 2016. “Shakespeare’s Skull: New Chapter in Hunt for Missing Head,” March 27, 2016, sec. Coventry & Warwickshire.

Geggel,LiveScience, Laura. n.d. “Shakespeare’s Skull May Have Been Stolen by Grave Robbers.” Scientific American. Accessed December 27, 2021.

Schwyzer, Philip. n.d. “Shakespeare, Skulls and Tombstone Curses – Thoughts on the Bard’s Deathday.” The Conversation. Accessed December 27, 2021.

“Shakespeare’s Skull Probably Isn’t in His Grave - The Washington Post.” n.d. Accessed December 27, 2021.

“What Happened to Shakespeare’s Skull?” n.d. ThoughtCo. Accessed December 27, 2021.

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।