'সা রে গা মা পা ধা নি, বোম ফেলেছে জাপানি', কী ঘটেছিল ৭৮ বছর আগের সেই দিনটায়

rudranjan
৩ মিনিট
'সা রে গা মা পা ধা নি, বোম ফেলেছে জাপানি', কী ঘটেছিল ৭৮ বছর আগের সেই দিনটায়

‘সা রে গা মা পা ধা নি/বোম ফেলেছে জাপানি’। চলতি প্রবাদ। বাঙালি মাত্রেই এই প্রবাদের সঙ্গে পরিচিত। সে অনেককাল আগের কথা। দেশে দেশে তখন লড়াই, দাঙ্গা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ। হঠাৎ করে আকাশ থেকে একদল উড়োজাহাজ কলকাতার উপর ফেলল গোটাকতক বোমা। বাকিটা সময়ের গর্ভে। আর সময় তো বহতা নদীর স্রোত। এই বহমানতার নিয়ম মেনেই এককালে যে ঘটনা শহর কলকাতার বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, তা বিবর্তিত হয়েছে বেদম ইয়ার্কির চটুল কবিতায়। এভাবেই তো মানুষ এগিয়ে চলে, চ্যাপলিনের সিনেমার মতো জীবন যাপনের সকল বেদনার দিকে বাঁকা হাসির ব্যঙ্গ ছুঁড়ে দিয়ে। নবারুণ ভট্টাচার্যের মতে, আমাদের বিগত শতাব্দী ছিল মানবতার ইতিহাসের হিংস্রতম শতক। খুব ভুল কিছু বোধহয় বলেননি প্রয়াত নবারুণ। এ শতাব্দীর উপর দিয়েই তো ঝড়ের মতো বয়ে গিয়েছিল, দুটো বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, মন্বন্তর, একাধিক দাঙ্গা, আর, কলকাতার আকাশে জাপানি বোমার আতঙ্ক, 'সে বড় সুখের সময় নয়'। অন্ধকার ঘনালেই শহরের 'সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি' বাতিস্তম্ভগুলোর চোখে নেমে আসে শীতল ঢাকনা। নৈঃশব্দ্য চিড়ে 'মিলিটারি লরির ঘর্ঘর...ধাবমান মোটরের ক্ল্যাকসন হর্ন, আর মেঘে মেঘে এরোপ্লেনের' শব্দ ঘোষণা করে কলকাতার কঠিন অসুখ। ঠিক কী ঘটেছিল সে সময়ে? কেনই বা এক ভয়াবহ আতঙ্কে দিন গুজরান করতে বাধ্য় হয়েছিল কলকাতাবাসী? সে গল্পই বুনতে চাইছি।

আজ থেকে ঠিক আটাত্তর বছর আগে, ডিসেম্বরের এক মধ্যরাতে, কলকাতা কেঁপে উঠেছিল জাপানি বোমার বিস্ফোরণে । ক্যালেন্ডারে সালটা ১৯৪২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। সর্বত্র চলছে মিত্র আর অক্ষশক্তির ধুন্ধুমার কোন্দল। এমতাবস্থায় ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে জর্জরিত ভারতবর্ষকে ব্রিটেনের হয়েই নামতে হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। তার বিরুদ্ধে তখন জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের মতো শক্তিরা। বলে রাখা ভালো, এ সময় খোদ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিসরটাও ছিল অসম্ভব ঘোরালো, ঘোর তর্ক-বিতর্ক চলছিল শিবিরে শিবিরে। একদল ইংরেজদের বিরুদ্ধে রণকৌশলগত অবস্থান থেকে মদত দিতে চাইছিল জার্মানিকে। বিপ্রতীপ অবস্থানে ছিল বামপন্থীরা।

এমন সময়ে ভারতের ভৌগোলিক মধ্যমণি কলকাতা পড়ল জাপান দেশের নজরে। ইংরেজ অধ্যুষিত ভারতবর্ষ আর তার প্রতিবেশী দেশ চিনের তখন ছিল মৈত্রেয়ীর সম্পর্ক। জাপান বিরোধী যুদ্ধে, ইংরেজদের নেতৃত্বে, চিনের কাছে স্থলপথে এবং আকাশপথে সমস্ত রকম মদত পৌঁছে যেত ভারতবর্ষ থেকে। এ অবস্থায় জাপানীর বুঝেছিল, এই মদতচুক্তির প্রাণকেন্দ্র কলকাতাকে ধ্বসিয়ে দিতে পারলেই তাদের যুদ্ধজয়ের পথে একটা বাধা কমবে। মোদ্দা ব্যাপার, ভারতের সাথে চিনের সমস্তরকম যোগাযোগ ছেঁটে ফেলতে চাইছিল তারা। অতএব, 'লাগাও হুজ্জুত, চালাও চাকতি'।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঙালির ইয়েতি অভিযান, সিনেমা নয়, এই গল্পটা সত্যিই...

ইয়েতির সন্ধান নিয়ে গোটা একটা সিনেমা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ষাট বছর আগেকার সেই রোমহর্ষক ঘটনায় কোনও আলো পড়েনি আজও!

-

শহরের বুকে আকাশপথে প্রথম বোমাবর্ষণ হল ২০ ডিসেম্বর, ১৯৪২। বিস্ফোরণ ঘটাল ‘ইম্পেরিয়াল আর্মি জাপানিজ এয়ারফোর্স’, বা ইজেএএফ। প্রথমে তাদের লক্ষ্য ছিল হাওড়া ব্রিজ এবং নৌ-বন্দরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে করে কলকাতাকে পরিণত করা যায় সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটা শহরে। পুরোপুরি সফল তারা হয়নি, কিন্তু কলকাতাবাসীর জীবনে নেমে এসছিল ঘোরতর বিপর্যয়। আকাশে তখন বিমানের হানাদারি। একদিকে জাপান, অন্যদিকে ব্রিটেন। সন্ধে হলেই কমে আসে আলোর ওজন। ঘরের বাতিতে লেগে যায় কাগজের ঢাকনা। রাস্তাঘাটে ব্ল্যাক আউট। ভৌতিক অন্ধকারে ডুবে থাকে আনন্দনগরী। ফস্কা গেরো রুখতেই ইংরেজ প্রশাসনকে সেদিন এই বজ্রআঁটুনির ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

এরোপ্লেন থেকে অন্ধকার শহরের রাস্তাঘাট চিহ্নিত করা সম্ভব নয় জাপানি পাইলটদের পক্ষে, এভাবেই হয়ত রোখা যাবে বিস্ফোরণ। এমনটাই হয়ত ভেবেছিল তারা। এমনকী জাপানি বিমানকে প্রতিহত করতে আকাশে হিলিয়াম বেলুন ওড়ানোর ব্যবস্থাও তারা করেছিল। শোনা যায় কিন্তু শেষরক্ষা সব ক্ষেত্রে হয়নি। বোমার আঘাতে ধ্বসে পড়েছিল খিদিরপুর ডক, ময়দান, প্রাণ যায় বহু মানুষের। ১৯৪২ সালের ৫ ডিসেম্বর দিন দুপুরে ঢালাও বোমাবর্ষণ হয়েছিল হাতিবাগানে। ৪২ জনের মৃত্যুর খবর নথিভুক্ত হয়েছে সেই সময়ের নানা জার্নালে।

এভাবেই চলেছে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত। তারপর, মৃতদেহের স্তুপের উপর শান্তির বার্তা নিয়ে ছেদ পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, বোমাবর্ষণ থামল । শহরের বুকের ক্ষতচিহ্নটা আজ বিস্মৃতপ্রায়। প্রবাদ প্রবচনের অনেক গভীরে জেগে আছে এই ত্রস্তদিনগুলির দলিল। সা রে গা মা পা ধা নি মানে যেন প্রতিদিনের ভয়, বোমা পড়ার ভয় ভয়।

আমাদের স্মৃতি-বিস্মৃতির অতল কোঠাঘরে লুকিয়ে থাকা সেই ভয়ের প্রচ্ছায়া হানা দিয়েছিল বছর তিনেক আগে, কলকাতা বন্দর থেকে যখন উদ্ধার করা হয়েছিল ৪৫০ কেজির একটি বোমা। বিশেষজ্ঞরা রায় দিয়েছিলেন, এ বোমা খোদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। তার অকেজো খোলসে নাকি রয়েছে ব্রিটেন, জাপান, আমেরিকার যুদ্ধকথার সম্মিলিত স্মৃতি। এভাবেই তো ইতিহাস ফসিল নির্মাণ করে। কালের অলাতচক্রে তার ক্ষতচিহ্নের উপর লেগে থাকে বিস্মৃতির প্রলেপ। এক সভ্যতা ফুরিয়ে আসে, তার জঠর থেকে জন্ম নেয় আরেক সভ্যতা।

'তবুও মানব থেকে যায়।'

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই কেন পেলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার?

Navi Pillay Nobel Peace Prize 2026: ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক দরিদ্র ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। তাঁর ঠকুমা-ঠাকুরদা ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার নাতাল প্রদেশের চিনি বাগানে কাজ করতে এসেছিলেন।

বাড়িতে এক নারীর আগমন, তারপর স্বপ্নাদেশ: যেভাবে শুরু হয়েছিল দে বাড়ির দুর্গাপুজো

Dey Bari Durga Puja Bhawanipur: কথিত আছে, একবার ২৬ নম্বর চন্দ্রনাথ স্ট্রিটের বাড়িতে লালপাড়-সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন সধবা নারী তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলেন চাল-ডাল ভিক্ষা করতে। বাড়িরই এক সদস্যা অন্দরমহল থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসার পর আর সেই সধবা মহিলাকে দেখতে পাননি।

শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ির দুর্গাপুজো: পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্য যেভাবে এল কুমারটুলিতে

Gangaprasad Sen Bari Durga Puja: গঙ্গাপ্রসাদ সেন ছিলেন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসতেন। তাঁর বাবা নীলাম্বর সেন অবিভক্ত বাংলার এক নামকরা কবিরাজ ছিলেন। কলকাতায় আসার পর সেন পরিবার কুমারটুলিতে বসতি গড়ে এবং সেখানেই ১৮৫৭ সালে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা।

১৩ বছর বয়সে ফুটপাথে থাকা, কার্গিলে জওয়ানদের পাশে, ‘পরিন্দা’য় আগুনে পুড়ে যাওয়া: নানা পাটেকর আসলে কেমন মানুষ ছিলেন?

Nana Patekar unknown facts: প্রকাশ রাজের ভাষায়, নানা কেবল একজন প্রবীণ সহকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক অভিভাবক-বন্ধু, যাঁর সঙ্গে তীব্র তর্কে জড়িয়ে পড়া যেত, আবার একই টেবিলে বসে তাঁর হাতের রান্না করা খাবার ভাগ করে নেওয়া যেত। মদ বা মুম্বইয়ের তথাকথিত হাই-প্রোফাইল পার্টি কালচারের প্রতি তাঁর চিরকালই ছিল তীব্র অনীহা।

নানা পাটেকর: ফিরে দেখা অনন্য জীবন

Nana Patekar: ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বোম্বে রাজ্যের রায়গড় জেলার মুরুদ-জানজিরায় এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। পরে সিনেমার দুনিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’।

মাছ-ভাত খেয়েই বোধন, দশমীতে মৎস্যমুখ! বাগবাজার হালদার বাড়ির সাড়ে চারশো বছরের পরম্পরা

Bagbazar Haldar Bari Durga Puja: পুজোর ইতিহাসের সূত্রপাত ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে সাহেবপুর বা রহনপুরে। হালদার পরিবারের পূর্বপুরুষরা চন্দননগরের নোয়াপাড়ার জমিদার ছিলেন। তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ কৃষ্ণপ্রসাদ হালদার প্রমোদভ্রমণে ওড়িশার ওই এলাকায় গেলে স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে সত্যিই উদ্ধার হয় মহিষমর্দিনীর কষ্টিপাথরের মূর্তি।

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।