চার্চের অন্দরে যৌন বিকৃতি ঢাকতে নৃশংস হত্যা, কেন বিচার পেলেন না সিস্টার অভয়া?
কেরলের কোট্টায়ামের নানায়া ক্যাথলিক চার্চের তরফ থেকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিষয়টিকে বিলম্বিত ন্যায়বিচারের আখ্যা দেওয়া হলেও, এই রায় সরাসরি প্রশ্ন তুলল ভারতীয় শাসনব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়ে।

১৯৯২ থেকে ২০২২, ৩০টা বছর কেটে গেলেও এখনও সিস্টার অভয়া হত্যাকাণ্ডে সঠিক বিচার পেল না অভয়ার পরিবার। বছরদুয়েক আগে সিবিআই আদালতে শাস্তি হলেও কেরল হাই কোর্টের ২০২২-এর ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের পর আবারও মুক্তির স্বাদ পেতে চলেছেন এই হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তরা। অন্তর্বর্তী জামিনের পর মহিলা কারাবাস থেকে মুক্তি পেয়েছেন ২৭ মার্চ, ১৯৯২-এর সেই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত সিস্টার সেফি। তার সঙ্গেই মুক্তি পেতে চলেছেন সেন্ট পিয়াস এক্স কনভেন্টের তৎকালীন ফাদার টমাস কোট্টুর। ৫ লক্ষ টাকার বন্ডে তাদের অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেরল আদালত। বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রন এবং বিচারপতি সি. জয়াচন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, এই ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সাজাতে ব্যর্থ সিবিআই। ঘটনার মূল সাক্ষীরাও এই ৩০ বছরে অধিকাংশই মারা গিয়েছেন এবং নিজের মত বদলে ফেলেছেন। তাই এই অবস্থায়, তাদের শুধুমাত্র সন্দেহের বশে হত্যাকারী বলে ধরে নেওয়া যায় না।
কেরলের কোট্টায়ামের নানায়া ক্যাথলিক চার্চের তরফ থেকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বিষয়টিকে বিলম্বিত ন্যায়বিচারের আখ্যা দেওয়া হলেও, এই রায় সরাসরি প্রশ্ন তুলল ভারতীয় শাসনব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়ে। কেরল হাইকোর্টের এই রায় ব্যর্থ করে দিল সিবিআইয়ের আপ্রাণ প্রচেষ্টাকে, ব্যর্থ করল ক্যাথলিক চার্চের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে করা ৩০ বছরের একটা আন্দোলনকে, সমাজকর্মী যোমান পুথেনপুরুকাল ও এদায়াদিয়িলের সিস্টেমের বিরুদ্ধে করা আন্দোলনটাকে। সর্বোপরি, মিথ্যা বলে প্রমাণ করল আদেক্কা রাজু নামের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানকেও, যিনি দীর্ঘ ৩০ বছর নিজের বয়ানে স্থায়ী থেকে কন্যাসম অভয়াকে বিচার দিতে চেয়েছিলেন।
গণমাধ্যমের সমালোচক এবং বর্ষীয়ান আইনজীবী এ. জয়শংকরের কথায়, "এইভাবেই ভারতে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত এবং বিচারব্যবস্থার শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেছেন দেশের বড় বড় নেতা-মন্ত্রীরা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতদিন পর্যন্ত উত্তর ভারত এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু জায়গায় এরকমটা দেখা যেত। কিন্তু এবার কেরলের মতো শিক্ষার গর্ব করা একটি রাজ্যেও ঘটল এরকম একটি ঘটনা। এই রায় প্রমাণ করে ভারতের আইন ও বিচার আজ অনেকটাই বিক্রিত এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে। গরিব মানুষের বিচারের আশা করাটা যেন আজও অপরাধ!"
কে ছিলেন এই সিস্টার অভয়া, কীভাবে তিনি খুন হয়েছিলেন?
কেরলের কোট্টায়াম অঞ্চলের সেন্ট পিয়াস এক্স কনভেন্ট চার্চের একজন সন্ন্যাসিনী ছিলেন ২১ বছর বয়সি সিস্টার অভয়া। ২৭ মার্চ, ১৯৯২, তারিখে সেই চার্চের একটি পরিত্যক্ত কুয়ো থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ওঠে, চার্চের ফাদার এবং সিস্টারকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলার অপরাধে তাঁকে খুন হতে হয়েছিল। অভিযুক্ত ফাদার টমাস সেখানকার বিসিএম কলেজে সাইকোলজি পড়াতেন এবং তাঁর ছাত্রী ছিলেন সিস্টার অভয়া। তৎকালীন সময় তিনি বিশপের সচিব ছিল এবং পরে কোট্টায়ামের ক্যাথলিক ডায়োসেসের আচার্য পদে বসেছিলেন। অন্যদিকে সেফি ছিলেন সেই সময় ওই হোস্টেলের কার্যনির্বাহী ইনচার্জ।
সেই সময় অভয়া নিজের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর সহপাঠী সিস্টার শার্লির সঙ্গেই তিনি রাত্রে পরীক্ষার পড়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ঠিক সেই সময়, ভোর ৪টে ১৫ মিনিট নাগাদ ঠান্ডা জল নিতে এবং মুখে জল দিতে হোস্টেল থেকে রান্নাঘরের দিকে যান সিস্টার অভয়া। ঠিক সেই সময় অভয়া সিস্টার সেফির সঙ্গে ফাদার টমাস এবং অন্য আরেক ফাদার জোসে পুত্রিকাইলকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেন। ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে, তাঁকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হন দুই ফাদার এবং সিস্টার সেফি। প্রথমে তাঁর মাথায় কুঠারজাতীয় কোনও একটি বস্তু দিয়ে আঘাত করেন সিস্টার। তারপর তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন ফাদার টমাস। এরপর তিনজন মিলে তাঁর মৃতদেহ টেনে নিয়ে গিয়ে ওই পরিত্যক্ত কুয়োতে ফেলে দেন।
সেই সময় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল শোরগোল পড়ে যায় কেরলজুড়ে। ঘটনার তদন্তে নামে কেরলের স্থানীয় পুলিশ। ক্রাইম সিনে পৌঁছে দেহটিকে উদ্ধার করে ঘটনা তদন্ত শুরু করে কেরল পুলিশ। কিন্তু সেই সময় এই ঘটনাকে তারা স্রেফ এটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু, সমস্যা হয়ে যায়, যখন কেরলজুড়ে এই ঘটনা নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়।
আত্মহত্যা সাজানোর চেষ্টা
হত্যাকাণ্ডটির ব্যাপারে জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় কেরল পুলিশ ঘটনার তদন্ত করতে নামে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি মামলা দায়ের করার পরেও তেমনভাবে তদন্ত করা হয় না। সিস্টার লিসু এবং মাদার সুপিরিয়র অফ দ্য কনভেন্টের নির্দেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ভালো করে তদন্ত করা হয়নি এই মামলায়। তদন্ত সম্পন্ন না করেই আত্মহত্যার তকমা দিয়ে কেস ক্লোজ করে দেয় পুলিশ। কিন্তু এই মামলার জেরে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। রাজ্য এবং রাজ্যের বাইরে মুখ পুড়তে শুরু করে কেরল পুলিশের। অবশেষে, ১৩ মে এই মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় কেরল ক্রাইম ব্রাঞ্চকে। তারাও প্রথম থেকেই আত্মহত্যার দিকে ইঙ্গিত করতে শুরু করে। ৩০ জানুয়ারি, ১৯৯৩ তারিখে ক্রাইম ব্রাঞ্চের তরফ থেকে একটি ফাইনাল রিপোর্ট দায়ের করা হয় সিস্টার অভয়া মামলায়। সেই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, সিস্টার ওইদিন আত্মহত্যাই করেছিলেন।
সিবিআই তদন্ত
ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তের পর যে রিপোর্ট দায়ের করা হয়েছিল, তাতে খুব একটা চিঁড়ে ভেজেনি। তখনও কিন্তু সকলেই দাবি রাখছিলেন সিবিআই তদন্তের। সমাজকর্মীদের দাবি ছিল, কেরলের ওই ক্ষমতাশীল চার্চ কমিটি পুরো ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই নিয়ে কেরল হাই কোর্টে মামলা পর্যন্ত করা হয়। তারপরেই এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিবিআই। ১৯৯৩ সালের ২৯ মার্চ, নতুন করে আবার ফাইল খোলা হয় এই কেসের। তবে এবার তদন্তে সিবিআই। এই দিন থেকে শুরু হয় কেরালার ইতিহাসের দীর্ঘতম মামলার তদন্ত, যা চলে ছিল দীর্ঘ ২৭ বছর।
১৯৯৩ সালে তদন্তভার গ্রহণ করার পরে সিবিআইও প্রথমে আত্মহত্যার দিকে ইঙ্গিত করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মামলার সম্পূর্ণ জট খুলতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা নিশ্চিত করে, ঠান্ডা মাথায় খুন করে প্রমাণ লোপাট করা হয়েছিল।
সিস্টার বেনিকাসিয়া, মাদার সুপিরিয়র এবং ৬৫ জন সিস্টার একইসঙ্গে কেরালার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কে করুনাকারনের কাছে সিবিআই তদন্তের আর্জি রেখে চিঠি দিয়েছিলেন। তাঁরা অভিযোগ জানিয়েছিলেন, পুলিশ এবং সিআইডি ভালোভাবে এই মামলার তদন্ত করেনি। অভয়াকে হত্যা করা হয়েছে। তাই সিবিআই তদন্তের প্রয়োজন।
তদন্তভার গ্রহণের পরে সিবিআই প্রথমেই একটি এফআইআর দায়ের করে। সেই এফআইআর-এ সিবিআই জানায়, শুধুমাত্র মেডিকেল প্রমাণাদির ওপর ভরসা করে এই মামলাকে খুন অথবা আত্মহত্যার তকমা দেওয়া যায় না। সঠিকভাবে তদন্ত প্রয়োজন। তবে, ১৯৯৬ সালে আদালতের কাছে একটি রিপোর্ট জমা পড়ে, যেখানে সিবিআই জানায়, "এই মামলাটিকে একটি হত্যার মামলা ধরে নিয়ে তদন্ত করার পরেও আমরা হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে পারিনি। বলতে গেলে, তাদের ব্যাপারে কোনওরকম প্রমাণ আমাদের হাতে আসেনি। যদি এই মামলায় কোনও হত্যাকারী জড়িত থাকেন, তাহলেও তার বিরুদ্ধে আমরা সঠিক প্রমাণ জোগাড় করতে পারিনি। তাই আমাদের এই তদন্ত সফল নয়।"
তবে, কেরলের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এই বয়ান ধোপে টেকে না এবং সিবিআই এসপি একে ওহরিকে মামলা থেকে সরিয়ে দিয়ে এই মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় ডেপুটি এসপি সুরিন্দার পলকে। সেই তদন্তেও তেমন কিছু উঠে আসে না। ১৯৯৯ এবং ২০০৫-এর সিবিআই ফাইনাল রিপোর্টে এই মামলাকে খুনের মামলা বলে স্বীকার করা হলেও, এই মামলার মূল হত্যাকারী কারা ছিলেন, তা কিন্তু কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারেনি। ২০০৫-এর রিপোর্টে সরাসরি জানানো হয়, সিস্টার অভয়ার মৃত্যুতে সঠিকভাবে কে জড়িত রয়েছেন, সেই ব্যাপারে জানা সম্ভব নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বের কনিষ্ঠতম সিরিয়াল কিলারের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ হকচকিয়ে গিয়েছিল। বাড়ির লোক জানিয়েছিলেন, তাঁরা সবটাই জানতেন। অমরজিৎ সবটাই স্বীকার করেছিল।
যদিও কেরল হাই কোর্ট এই তিনটি ফাইনাল রিপোর্টকেই খারিজ করে ২০০৮ সালে এই মামলার তদন্তভার দেয় কোচিতে অবস্থিত সিবিআইয়ের কেরল ইউনিটের হাতে।
তবে এইবারের তদন্তে সিবিআইয়ের হাত একেবারে ফাঁকা নয়। এই তদন্তের পর সিবিআই এই মামলায় একই চার্জশিট ফাইল করে। এই চার্জশিটে দু'জন পাদ্রী এবং একজন সন্ন্যাসিনীর নাম উল্লেখ করা হয়। ফাদার টমাস কোট্টুর, ফাদার পুথিকাইল ও সিস্টার সেফির বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ইন্ডিয়ান পেনাল কোড সেকশন ৩০২ (হত্যা) ও ২০১ (প্রমাণ লোপাট) অনুযায়ী মামলা।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারি
২০০৮-এর নভেম্বরের শুরুর দিকে হাই কোর্ট এই মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারির নির্দেশ দেয়। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই মামলায় সম্পূর্ণ তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয় সিবিআইকে। ডেপুটি নন্দকুমারান নায়ারে নেতৃত্বে একটি নতুন টিম বেশ কয়েকজনের বয়ান রেকর্ড করে, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সঞ্জু পি ম্যাথিউ। সঞ্জু এই কনভেন্ট চার্চের একেবারে পাশেই থাকতেন সেই সময়। তার বয়ানে সঞ্জু জানায়, সে ২৬ তারিখ রাত্রে, অর্থাৎ অভয়ার মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার ঠিক একদিন আগের রাত্রে ফাদার টমাসকে ওই পরিত্যক্ত কুয়োটির আশপাশে দেখেছিল। তার বয়ানের ওপর ভিত্তি করে ১৯ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে সিবিআই গ্রেফতার করে এই দুই পাদ্রী এবং এক সিস্টারকে।
চোর যখন সাধুর ভূমিকায়
সিবিআই যতই তদন্ত করুক এবং যাদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করুক না কেন, এই খুনের মামলার কিনারা করার পিছনে যে মানুষটির অবদান সবথেকে বেশি, তিনি হলেন আদক্কা রাজু। তিনি পেশায় একজন ছিঁচকে চোর। অভয়াকে যেদিন খুন করা হয়েছিল, সেই দিন রাত্রে তিনি চার্চে ঢুকেছিলেন চুরি করতে। আর সেই একটি বয়ান মামলাটাকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। গভীর রাতে কেরলের ওই সেন্ট পাইয়াস কনভেন্টের পাঁচিল টপকে নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকেছিলেন রাজু। তিনি দেখেছিলেন, অত রাত্রিবেলাও দু'জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘুরছেন কনভেন্ট চত্বরে, যা কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না।
চার্জশিট ও কোর্ট ট্রায়াল
আদালতের কাছে জমা দেওয়া চার্জশিটে সিবিআই জানিয়ে দেয়, ঘটনার দিন রাত্রে, ১৯৯২ সালের ২৭ মার্চ প্রি-ডিগ্রী কোর্স পাঠরতা সন্ন্যাসিনী অভয়া ভোর চারটের সময় নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ঘুম থেকে উঠেছিলেন। জল খাওয়ার জন্য তিনি যখন রান্নাঘরের দিকে যান, সেই সময় তিনি ফাদার টমাস, ফাদার পুথরিকাইল, এবং সন্ন্যাসিনী সেফিকে অত্যন্ত আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন।
তিনি হয়তো সকলকে এই বিষয়টার ব্যাপারে জানিয়ে দেবেন, এই ভীতি থেকে ফাদার টমাস তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। প্রথমেই তাঁর মাথায় কুঠারজাতীয় কোনও একটি ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করেন সিস্টার সেফি। তারপরে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন ফাদার টমাস। তারপর তিনজন মিলে তাঁর দেহ পরিত্যক্ত কুয়োতে ফেলে দেন। যখন তাঁর দেহটাকে কুয়োতে ফেলা হয়, সেই সময় পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। জলে ডুবে গিয়ে অভয়ার মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছরের বিভিন্ন জায়গায় অভয়ার জুতোর ছাপ পাওয়া যায়। তার মাথার ঘোমটা পাওয়া গিয়েছিল সদর দরজার বাইরে এবং তার দেহে আঘাতের চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। এই সমস্ত প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায়, এই ঘটনার সঙ্গে ফাদার টমাস এবং সিস্টার সেফি সরাসরি জড়িত রয়েছেন।
২০১৮ সালে এই চার্জশিটে যুক্ত হয় কেরল ক্রাইম ব্রাঞ্চের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ, কেটি মাইকেলের নাম। তিনি এই ঘটনাকে আত্মহত্যা প্রমাণ করার জন্য বেশ কিছু প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ জানায় সিবিআই। তাদের অভিযোগ ছিল, কেটি মাইকেল এবং তৎকালীন সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট এস জি কে কিশোর অভয়ার ঘর থেকে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করে দিয়েছিলেন এবং তার দেহ থেকে যে পোশাকটি উদ্ধার হয়েছিল, সেই পোশাকটিকেও গায়েব করে দিয়েছিলেন তাঁরা দু'জনে। যদিও এই মামলার দায়িত্ব সিবিআই গ্রহণ করার পর কিশোর কেরল ক্যাডার থেকে ইস্তফা দেন এবং কোনওমতে সেই মামলা থেকে বেরিয়ে আসেন। তবে কেটি মাইকেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে সক্ষম হয় সিবিআই।
২০০৯ সালে সিবিআই-এর তরফ থেকে ১৭৭ জনের একটি সাক্ষীর দল গঠন করা হয় কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় এই সাক্ষীদের মধ্যে সিংহভাগ নিজেদের বক্তব্য থেকে সরে যান অথবা মারা যান। এই তালিকায় অন্যতম ছিলেন সিস্টার অভয়ার মা এবং বাবা, যাঁরা কোর্ট ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগেই ২০১৬ সালে মারা গিয়েছিলেন। তালিকায় ছিলেন প্রাক্তন মাদার সুপিরিয়র অফ দ্য কনভেন্ট, যিনিও এই মামলা শুরু হওয়ার আগে মারা গিয়েছিলেন।
২০১৮ সালে চার্জশিটে কেটি মাইকেলের নাম যুক্ত হলেও ওই একই বছর প্রমাণের অভাবে ফাদার জোসে পুথরিকাইলকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় কেরল আদালত। সমস্ত বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে ২০১৯ সালে কেরলের সিবিআই আদালতে এই মামলার বিচার শুরু হয়। যদিও, ২০০৯-এর জানুয়ারি মাসে এই মামলায় জামিন পেয়েছিলেন সিস্টার সেফি। সেই সময় বিচারপতি কে. হেমা মনে করেছিলেন, সিস্টারের বিরুদ্ধে সিবিআই-এর তরফ থেকে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা খুব একটা যুক্তিগ্রাহ্য নয় এবং সিবিআইয়ের সাজানো যুক্তি অত্যন্ত ঠুনকো। পাশাপাশি কেরল পুলিশের বিরুদ্ধে সিবিআই যে প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ এনেছিল, তারও কোনও সারবত্তা খুঁজে পাননি বিচারপতি। তিনি বরং ঘোষণা করেছিলেন, চার্চ এবং ওই কনভেন্ট সিস্টার অভয়া হত্যাকাণ্ডে কোনওরকম ভূমিকাই নাকি গ্রহণ করেননি। যদিও তাঁর এই ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করেই পরবর্তীতে নতুন করে চার্জশিট দায়ের করেছিল সিবিআই।
সিবিআই আদালতের রায়
২৩ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে এই বিতর্কিত মামলায় প্রথম রায় ঘোষণা করে তিরুবনন্তপুরমের বিশেষ সিবিআই আদালত। অপরাধীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ৭ বছরের কারাবাসের রায় শোনানো হয় প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে। তার সঙ্গে সঙ্গেই ৫ লক্ষ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল অভিযুক্তদের।
যদিও আদালতের রায় ঘোষণার সময় প্রধান অভিযুক্ত ফাদার টমাস আদালতকে জানিয়েছিলেন, তাঁর নাকি ক্যানসার হয়েছে এবং এই অবস্থায় তাঁকে যেন কম শাস্তি দেওয়া হয়। এই একই আর্জি রেখেছিলেন সিস্টার সেফি। কিন্তু আদালত জানিয়ে দিয়েছিল, যে অপরাধ তাঁরা করেছেন তাতে তাঁদের প্রতি কোনওরকম সহানুভূতি দেখানো হবে না। ২০১৬ সালে অভয়ার মা-বাবা মারা যাওয়ার সময় পর্যন্ত মেয়ের খুনের বিচার চেয়ে লড়াই করেছিলেন। সিবিআই আদালতের রায় তাঁদের পরিবারকে খানিক স্বস্তি দিলেও, এই রায়কে সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে কেরল হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।
ডিভিশন বেঞ্চের রায় ও অভিযুক্তদের জামিন
২০২০ সালের সিবিআই আদালত অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেও সেই রায়কে খারিজ করে দেয় কেরল হাই কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ। ফাদার টমাস এবং সিস্টার সেফিকে অন্তর্বর্তী জামিন দিয়ে তাদের শাস্তির আদেশ বরখাস্ত করে আদালত। কেরল হাই কোর্টে ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি কে বিজয় চন্দ্রন এবং বিচারপতি সি জয়াচন্দ্রন প্রথমেই এই মামলার প্রমাণাদির মধ্যে কিছু অসংগতি লক্ষ করেন।
আদালত জানায়, "এই মামলার অভিযুক্তরা প্রথম থেকেই চার্চের নিযুক্ত সদস্য ছিলেন এবং তাঁরা এই মামলায় কখনওই নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করেননি। এমনকী, জনগণের রোষ তাঁদের বিরুদ্ধে থাকলেও, তাঁদের মধ্যে কোনও ভীতি কাজ করেনি।" তার পাশাপাশি, যে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ তাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই জোগাড় করেছে, তাতে এই মামলায় তাঁদের যুক্ত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হয় না। মূলত ছয়টি বিষয় নিয়ে আদালত তাদের বক্তব্য সামনে রাখে।
১. আদেক্কা রাজু, যে ব্যক্তিকে সিবিআই তাঁদের প্রথম এবং সবথেকে বড় সাক্ষী হিসেবে সামনে রেখেছিল, সেই সাক্ষীর বয়ান অনেকটাই অস্পষ্ট। আদালতের বক্তব্য ছিল, "ঘটনার দিন রাত্রে যখন রাজু গির্জার চত্বরে প্রবেশ করে, তখন ছিল একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাজুর বক্তব্য অনুযায়ী, সেইদিন রাত্রিবেলা ফাদার টমাসকে তিনি গির্জার চত্বরে দেখেছিলেন। কিন্তু সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কোনও এক ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে দেখা কার্যত অসম্ভব। আদালতের পক্ষে এরকম একটি প্রমাণকে গ্রাহ্য বলে ধরে নেওয়া সম্ভব নয়।" তার পাশাপাশি, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী, এই ঘটনাটি ঘটার দীর্ঘ ১৫ বছর পরে রাজুর বক্তব্য রেকর্ড করেছিল সিবিআই। তাই আদৌ সেই দিনের ঘটনা তার স্পষ্ট মনে আছে কি না এবং সেই সময় তিনি ভালোভাবে ফাদার টমাসকে চিনতেন কি না, সেই নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
২. সিবিআই-এর পরবর্তী প্রধান সাক্ষী ছিলেন একজন সমাজকর্মী, কালারকোড বেনুগোপালন নায়ার, যাঁর কাছে নাকি কোর্ট ট্রায়ালের পরবর্তীতে ফাদার টমাস নিজের সিস্টার সেফির সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। যদিও সিবিআই দ্বারা জারি করা চার্জশিটে ফাদারের যৌন সম্পর্কে জড়ানোর বিষয়টির উল্লেখ থাকলেও সিস্টারের নাম কিন্তু ছিল না। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, "এই ধরনের স্বীকারোক্তিকে বিচার-বহির্ভূত স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরনের স্বীকারোক্তিকে কখনওই মামলার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া চলে না। তবে যদি ধরেও নেওয়া হয়, ফাদার সেখানকারই একজন সেবিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, তাহলেও এই মামলার সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার কোন প্রমাণ মেলে না। সেক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে অন্য মামলা জারি করা যেতে পারে, যদি সেই সেবিকা ফাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তবেই।"
৩. সিস্টার সেফিকে নিয়ে ডাক্তারের দল আদালতে জানিয়েছিল, তাঁদের কাছে সিস্টার স্বীকার করেছিলেন, সিস্টার তাঁর কোনও একজন কাছের আত্মীয়ের সঙ্গেই যৌনাচার করেছিলেন বটে, তবে সঠিক অর্থে যৌন মিলন তিনি করেননি। তবে এই ঘটনাটি ওইদিন রাত্রেই ঘটেছিল কি না, তা জানা যায়নি। পাশাপশি, ওই আত্মীয়টির ব্যাপারেও ধোঁয়াশায় রয়েছে সিবিআই। তাই, বেঞ্চের কাছে এই বিষয়টা সরাসরি এই মামলার অংশ বলে মনে হয়নি। সিস্টার সেফির হাইমেন পরীক্ষাতেও বেশ কিছু ইন্টারলুপ মিলেছিল। সেই সময় চার্চের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, এই মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য সিস্টার সেফির হাইমেন প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল অপারেশনের মাধ্যমে। সিবিআইয়ের হাইমেন রাপচারের যুক্তিকে খণ্ডাতেই এরকম করা হয়েছিল বলে উঠেছিল অভিযোগ। তাই সিবিআইয়ের ফাদার টমাস ও ফাদার পুথরিকাইলের সঙ্গে সিস্টারের যৌনাচারের যুক্তিও অনেকটাই ঠুনকো হয়ে যায় ডিভিশন বেঞ্চের কাছে, কারণ হাইমেন পরীক্ষার রিপোর্ট অনেকাংশেই চলে গিয়েছিল সিস্টারের পক্ষেই।
৪. সিস্টার অভয়ার মৃত্যুর সময় কিংবা মৃত্যুর কিছু আগে তাঁর দেহে যে সমস্ত ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছিল, সেগুলি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে কেরল হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। সিবিআই-এর যুক্তি ছিল, কোনও একটি ভারী কুড়ালজাতীয় অস্ত্র দিয়ে সিস্টার অভয়ার দেহে আঘাত করা হয়েছিল। তবে সেই রকম কোনও অস্ত্র আদালতে কখনও পেশ করাই হয়নি প্রমাণ হিসেবে। অন্যদিকে, সিস্টারের দেহ মিলেছিল একটি পরিত্যক্ত কুয়োর ভেতরে। যদি কোনও ব্যক্তি কুয়োর ভেতরে পড়ে যান, তাহলেও তাঁর দেহে এরকম আঘাত আসতে পারে। কোনও কুড়াল দিয়েই তাঁর দেহে আঘাত করা হয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়, তাই সেই যুক্তিকেও সরাসরি খারিজ করে ডিভিশন বেঞ্চ।
৫. সিবিআই কোর্টের কাছে জানিয়েছিল, এই মামলার প্রধান ফোটোগ্রাফার ভার্গিস চাকো অভয়ার দেহে এবং তাঁর গলার কাছে কিছু হাতের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন। এবং তাঁর দেহে ছিল কিছু নখের দাগ। কিন্তু এই ছবি কোনওদিন কোর্ট-এর কাছে প্রমাণ হিসেবে পেশ করাই হয়নি। তাই শুধুমাত্র একজন ফোটোগ্রাফারের কথার ভিত্তিতে একটা প্রমাণ তৈরি করে দেওয়া যায় না। এ বিষয়টি নিয়ে হাই কোর্টের বক্তব্য, "এই মামলার ফোটোগ্রাফার সিস্টার অভয়ার দেহের ওই সমস্ত হাতের ছাপ কিংবা নখের দাগের কোনও ছবি আদালতে পেশ করেননি। ময়নাতদন্তে রিপোর্টে মৃতের শরীরের কিছু ক্ষতের ব্যাপারে তথ্য উঠে এলেও, তা ভোঁতা কোনওকিছু দিয়েই হয়েছে বলে জানিয়েছে রিপোর্ট। এক্ষেত্রে, শুধুমাত্র একজন ফোটোগ্রাফারের বয়ানের থেকে ময়নাতদন্তের ডাক্তারের তৈরি করা রিপোর্টকেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। তাই আদালত এই বয়ানকে যুক্তিগ্রাহ্য মনে করে না।"
৬. ওই সেন্ট পিয়াস চার্চে একটি নির্দিষ্ট সেলার রুম ছিল সিস্টার সেফির প্রধান থাকার জায়গা। তাঁর সঙ্গে যদিও একজন রুমমেট থাকতেন, সিস্টার হেলেন। তবে ঘটনার ৪-৫ দিন আগে থেকেই সিস্টার হেলেন চার্চ ছেড়ে অন্য কোথাও একটা গিয়েছিলেন। তাই সেই দিন সিস্টার সেফির ঘর ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা। কোর্টের বক্তব্য, "যদি সিস্টার সেফিকে সেরকম যৌনাচার করতেই হতো, তবে তিনি নিজের ফাঁকা ঘরেই করতে পারতেন। রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার তেমন একটা প্রয়োজন ছিলনা। পাশাপাশি, রান্নাঘরে আওয়াজের বিষয়টাও তেমন একটা ভালো যুক্তি হিসাবে ধরা যায় না, কারণ, শুধু পড়ে থাকা চটি আর ঘোমটা দিয়ে ওইদিন রান্নাঘরে কী ঘটেছিল তা অনুমান করা যায় না।"
উঠে আসে ক্যাথলিক চার্চের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটাও
সিস্টার অভয়া মামলাটি প্রমাণ করে ভারতের ক্যাথলিক চার্চ কতটা বেশি শক্তিশালী। এই মামলার প্রথম দিন থেকেই বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এসেছে ক্যাথলিক চার্চ। ময়নাতদন্তে শরীরে ক্ষতচিহ্ন থাকলেও শক্তিশালী ক্যাথলিক চার্চ স্থানীয় পুলিশ থেকে শুরু করে প্রশাসন এবং ডাক্তারদের ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল বিষয়টিকে আত্মহত্যা প্রমাণ করার জন্য।
এমনকী, চার্চের তরফ থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে সেফি-র হাইমনোপ্লাস্টি সার্জারি করানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি, তাঁর স্তনকে শক্ত রাখার জন্য করা হয়েছিল অপারেশন। এই সমস্ত অপারেশনের বিষয়গুলি কোনও রিপোর্টে উল্লিখিত ছিল না। এমনকী, হত্যার প্রমাণ লোপাট করতে পুরো কনভেন্টকে পুনর্গঠন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। যারা ঈশ্বরের সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার কথা বলেন, তাদের ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচায়ক ছিল সিস্টার অভয়ার মামলাটি।
বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, এটি ভারতের ক্যাথলিক চার্চের একটি বড় দোষ, যে তাঁরা নিজেদের লোককে রক্ষা করার জন্য এবং হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেন। ভয় এবং লোভের কারণে অনেক সময় ডাক্তার, পুলিশ থেকে শুরু করে সিবিআই পর্যন্ত তাদের শিকার হন। পাশাপাশি শুরু হয় রাজনৈতিক চাপ। ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার পরিবর্তে অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয় এই সমস্ত ক্যাথলিক চার্চের দ্বারা। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের প্রতিটি দেশেই ক্যাথলিক চার্চ এইভাবেই যাজকদের যৌনাচারের সঙ্গীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা প্রদান করে থাকে। এমনকী, এই লম্পট পাদ্রীদের যৌন লালসার শিকার হতে হয় শিশুদেরকেও। ডেভিড ইয়ালোপের ২০১২ সালে রচিত বই, 'Beyond Belief: The Catholic Church and The Child Abuse Scandal'-এও ক্যাথলিক চার্চের এই জঘন্য অপরাধগুলির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এমনকী, ভারতেও ক্যাথলিক চার্চের এই অপরাধগুলি নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। মালায়ালম ইন্ডাস্ট্রির 'অঞ্জাম পথিরা' বা বাংলার 'মুখোশ'- ক্যাথলিক চার্চ এবং তাদের এই অন্ধকারময় দিকগুলি বারবার ফুটে উঠেছে সিনেমার পর্দায়। ক্যাথলিক চার্চের ক্ষেত্রে সবার আগে আসে তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ, তারপর আসে সেই মানুষটি, যে অপরাধী। আর অদূরে, অবহেলাতে কোথাও একটা পড়ে থাকে অপরাধের শিকার। ১৯৯২-এর সিস্টার অভয়া মামলা হোক কিংবা ২০১৪-র বিশপ ফ্রাঙ্কো মুল্লাকালের বিরুদ্ধে ওঠা ক্যাথলিক নান লুসি কাল্লাপুরাকে ধর্ষণের অভিযোগ, বছরের পর বছর কেটে গেলেও ক্যাথলিক চার্চ রয়ে গেল তার নিজের জায়গাতেই।
















