সোশ্যাল জেট ল্যাগ: মনমরা ভাব কি শুধুই ডিপ্রেশনের লক্ষণ?

Social Jet Lag: চিকিৎসকদের মতে, বায়োলজিক্যাল ক্লকের এই ছন্দপতন দীর্ঘমেয়াদী হলেই আপনি সোশ্যাল জেট ল্যাগ দ্বারা আক্রান্ত হবেন। বিঘ্নিত হবে আপনার স্নান-খাওয়া-ঘুম, কাজকর্ম, বিশ্রাম এমনকি ব্যক্তিগত সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহ।

inscript
৫ মিনিট
সোশ্যাল জেট ল্যাগ: মনমরা ভাব কি শুধুই ডিপ্রেশনের লক্ষণ?

সোমবার সকালে অনির্বাণের (কাল্পনিক চরিত্র) মোবাইলে অ্যালার্ম বাজছে। সে ইতিমধ্যেই পাঁচবার 'স্নুজ' বোতাম টিপেছে এবং আবার স্নুজ বোতাম টিপতে ফোন হাতে নিচ্ছে। সে ক্লান্ত বোধ করছে। মনে হচ্ছে এখনও ঘুম প্রয়োজন। এবং উইকেন্ডও চলেই এসেছে।

কিন্তু অন্য দিন তো এরকম হয় না। অনির্বাণ ফোন হাতে নিয়ে ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলি গুগলে খুঁজতে শুরু করল। এবং খোঁজাখুঁজির পর সে জানতে পারল এটি ডিপ্রেশন নয়, 'সোশ্যাল জেট ল্যাগ'।

কিন্তু কী এই সোশ্যাল জেট ল্যাগ ?

জেট ল্যাগ কী কমবেশি সকলেরই জানা। আপনি যখন বিদেশ বিভুঁই’তে পাড়ি দেন তখন আপনি যে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করেন তা কিন্তু নয়, বরং আপনি সময়ের সীমারেখাকেও একই সময় অতিক্রম করছেন। ভূতলে প্রতিটি দেশই সময়ের নিরিখে আগে-পিছে কাজ করে। এমতাবস্থায় আপনি যখন বিদেশে ভ্রমণ করেন, দীর্ঘদিন সেখানে বসবাসের দরুন আপনার শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লকও কিন্তু সেদেশীয় সময়ের ভিত্তিতে স্বপরিচিত ছন্দ বদলে ফেলে। ঠিক সে কারণেই, দেশে ফিরেও বিদেশি রুটিন হঠাৎ বদলে ফেলা আপনার জন্য এতটা সহজ হয় না।

এখানে বায়োলজিক্যাল ক্লক বলতে, সেই ঘড়ি বা অভ্যেসকে ইঙ্গিত করে যা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীর মেনে চলছে। ধরুন, কেউ প্রতিদিন রাত্রে ঠিক দশটার সময় ঘুমিয়ে পড়েন আবার ভোর পাঁচটায় উঠে পড়েন, এক্ষেত্রে তার শরীর কিন্তু এই বায়োলজিক্যাল ক্লকেই কাজ করবে প্রতিদিন। অর্থাৎ যা-ই হোক ঠিক রাত দশটার মধ্যেই তার দু চোখের পাতা এক হয়ে যাবে, আবার ভোর বেলায় ঠিক পাঁচটার দিকেই তার ঘুম আপনা আপনি ভেঙেও যাবে। এবার যদি তিনি কোনো কারণবশত এই অভ্যেসে কিছুটা বদল করেন, যেমন- দশটার বদলে তিনি রাত্রি একটা নাগাদ ঘুমোলেন কিছুদিন, সকালে সাতটা নাগাদ উঠলেন, তাহলে কিছুদিন পর দেখা যাবে ওই ব্যক্তির আর আগের মতো দশটায় ঘুম আসবে না। অর্থাৎ তার শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লকের ছন্দপতন ঘটেছে।

আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে এই বায়োলজিক্যাল ক্লক বা আমাদের শরীরের এই ২৪ ঘণ্টার ঘড়িটি কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ— এটি আপনাকে কখন ঘুমোতে হবে, কখন উঠতে হবে, কখন খেতে হবে কিংবা কখন ধীর হতে বা বিশ্রাম নিতে হবে তা নির্দেশিত করে। তাই এতে ব্যাঘাত ঘটলে আমাদের স্বাভাবিক জীবনের গতিতেও ছন্দপতন ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, বায়োলজিক্যাল ক্লকের এই ছন্দপতন দীর্ঘমেয়াদী হলেই আপনি সোশ্যাল জেট ল্যাগ দ্বারা আক্রান্ত হবেন। বিঘ্নিত হবে আপনার স্নান-খাওয়া-ঘুম, কাজকর্ম, বিশ্রাম এমনকি ব্যক্তিগত সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহ।

অসময়ে কাজের প্রবণতা, অনিয়ন্ত্রিত জীবন এবং সোশ্যাল জেট ল্যাগ একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শরীরের উপর এর প্রভাব নিম্নলিখিত হতে পারে-

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাপ্লিমেন্ট নয়, সুস্থ থাকার অব্যর্থ দাওয়াই একটাই

Immunity: ড. রেড্ডি জানান, দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো, বিশেষ করে সকালের রোদ, মেলাটোনিন-কর্টিসল চক্রকে মজবুত করে এবং রাতের ঘুমের জন্য শরীরের সহায়তা করে।

ক.দিনের বেলায় ক্লান্তি, ঘুম পাওয়া।

খ.কাজে মনোনিবেশে সমস্যা । মনোসংযোগ কমে আসা।

গ.খিটখিটে ভাব। রেগে যাওয়া। মুড সুইং।

ঘ.অন্ত্রের সমস্যা। পাচন ক্ষমতা কমে যাওয়া।

ঙ.ওজন বৃদ্ধি/হ্রাস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি।

চ.ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি।

কেন হয়?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মদের চেয়েও ক্ষতিকর রিলস! নেশায় বুঁদ ‘জেন-জি’র কমছে ধৈর্য, বাড়ছে অবসাদ

Reels Addiction: অতিরিক্ত রিলস দেখার প্রবণতা মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটায়। ফল, অমনোযোগী, ঘুমে সমস্যা, মানসিক অবসাদ, শর্ট টার্ম মেমোরি লস বা স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস।

এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন কারণের সংমিশ্রণ, যেমন কয়েকজন প্রাকৃতিকভাবেই দেরিতে ঘুমোনোর জন্য তৈরি। রাতে তাদের কর্মশক্তি সবচেয়ে বেশি থাকে, কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক বা অফিস সবকিছুই সকালে শুরু হয়। তাই, এক্ষেত্রে একটি গঠনগত অমিল থাকে।

দ্বিতীয় কারণটি হল আপনার মোবাইল ল্যাপটপ, টিভির স্ক্রিন। এই স্ক্রিনগুলির আলো চোখে পড়ার কারণে ঘুম দেরিতে আসে। আপনি যত বেশি স্ক্রিন দেখবেন ততই ঘুমোতে দেরি হবে।

তৃতীয় কারণ হলো, সপ্তাহান্তে সারা সপ্তাহের ঘুমের ক্ষতিপূরণ। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই সপ্তাহের ৫ দিন ঘুম নিয়ন্ত্রণে রাখি। একটু কম ঘুমোই। কিন্তু তারপর ২ দিন আমরা সারা সপ্তাহের ঘুমের ক্ষতিপূরণ দিতে অতিরিক্ত ঘুমোই। এই দুটি রুটিন সম্পূর্ণ আলাদা: সপ্তাহের ৫ দিনের আপনি এবং সপ্তাহান্তের আপনি।

এবং চতুর্থ কারণ হলো আপনার সামাজিক জীবন। সপ্তাহ জুড়ে একরকম সময়সূচীর পর সপ্তাহান্তের পরিকল্পনা আপনার ঘুমকে নষ্ট করে। এটি সোশ্যাল জেট ল্যাগের দিকে নিয়ে যায়।

সমাধান কী?

বর্তমান সময়ে ঘড়ি ধরে একটি নির্দিষ্ট রুটিনে জীবনযাপন কার্যত ‘সোনার পাথর’ বাটি। কিন্তু তবুও, এ ধরনের নাভিশ্বাস তোলা জীবনপ্রবাহ সামলেও, সোশ্যাল জেট ল্যাগের থেকে বাঁচতে নিম্নলিখিত বিষয় গুলিতে জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা:

ক. রাত জাগা, দেরি করে ঘুমোনোর অভ্যেস বদলাতে হবে।

খ. চেষ্টা করুন প্রতিদিন সকালে (৬-৮) অন্তত ১০ মিনিট রোদে থাকার।

গ. শরীরচর্চা ও কার্ডিওভাসকুলারের মতো ব্যায়ামের অভ্যেস তৈরি করা, অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে।

ঘ. খাবারের ক্ষেত্রে পরিমিত-সুষম ব্যালেন্স ডায়েট মেনে চলা।

ঙ. নেশা জাতীয় দ্রব্য বর্জন।

চ. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

ছ. সর্বোপরি, সময়ের কাজ সময়ে করার অভ্যেস তৈরি করুন।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের একটি মেডিক্যাল সার্ভে বলছে ভারতে ৬৭% (১,১৫৪ জনের মধ্যে প্রায় ৭৭৩ জন) 'সোশ্যাল জেট ল্যাগ'-এর শিকার। তার মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি পরিলক্ষিত। তবে শুধু তরুণরাই নয়, যেকোনো বয়সেই নিঃশব্দ থাবা বসাতে পারে সোশ্যাল জেটল্যাগ। অনিয়ম-অনিয়ন্ত্রণ যার মুখ্য কারণ।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।