লক্ষ লক্ষ মানুষ থাকবেন অনাহারে! সোমালিয়ায় কেন ঘনিয়ে এল দুর্ভিক্ষের কালো মেঘ

famine in somalia : সে দেশে আজ শুধুই অনাহার, দুর্ভিক্ষ, এবং খরার মতো প্রতিকূলতা

Shibani
৪ মিনিট
লক্ষ লক্ষ মানুষ থাকবেন অনাহারে! সোমালিয়ায় কেন ঘনিয়ে এল দুর্ভিক্ষের কালো মেঘ

বিধ্বস্ত সোমালিয়া। গত কয়েক শতাব্দী ধরেই প্রবল দুর্ভিক্ষে ভারাক্রান্ত হলেও এই বছর এর প্রভাব সব থেকে বেশি। সারা বিশ্বব্যাপী খাদ্যের যে পরিমাণে দাম বেড়েছে তাতে ভুক্তভোগী এখানকার সাধারণ মানুষ। অনুমান করা যায়, শুধুমাত্র খাবারের অভাবে সবথেকে বেশি পরিমাণে মানুষ মারা যাবে এই দেশে। বাদ পড়বে না সদ্যোজাতরাও। পূর্ব আফ্রিকার প্রায় শেষ প্রান্তের দেশ সোমালিয়া । যা পাহাড় এবং মরুভূমি ছাড়াও ১৬ কোটি মানুষের আবাসনস্থল। রোমান সাম্রাজ্যের আগে পর্যন্ত এই দেশের একটি সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ছিল। তবে এখন সেসব আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে দেশে আজ শুধুই অনাহার, দুর্ভিক্ষ, এবং খরার মতো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার প্রয়াস করে চলেছেন সাধারণ মানুষ।

২০১১ সালে খাদ্যাভাবের কারণে সোমালিয়ায় এক চতুর্থাংশেরও বেশি লোকের মৃত্যু হয় , যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশু। ২০১১ সালের এই ঘটনার পর সমগ্র বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল যাতে আগামী দিনগুলিতে এর পুনরাবৃত্তি আর না হয়। যদিও তাতে আটকানো যায়নি সমস্যা। সম্প্রতি জাতিসংঘের সমীক্ষায় জানানো হয়েছে যে, সোমালিয়ায় এ বছর প্রায় তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হতে পারেন। আর আগে ২০১৭ সালে প্রথমবারের জন্য দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল সোমালিয়ায়। তবে কোনও দেশের সরকার এককভাবে কখনওই একটি জায়গাকে দুর্ভিক্ষপীড়িত ঘোষণা করতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন হয় সেই দেশের সরকার এবং জাতিসংঘের যৌথ সম্মতির। তবে এছাড়াও যে বিষয়গুলির ওপর ভিত্তি করে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয় সেগুলি হল;

একটি দেশে দুর্ভিক্ষ কখন ঘোষণা করা হয়?

বিপুল পরিমাণে খাদ্য সংকট, অনাহারে মৃত্যু এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখনই সাধারণ মানুষ এটিকে দুর্ভিক্ষ আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে জাতিসংঘের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল যদি তিনটি শর্ত পূরণ করে তবেই সেই জায়গা দুর্ভিক্ষপীড়িত বলে ঘোষণা করা হবে ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হু হু করে পতন জনসংখ্যায়, কেন এই অবস্থা চিনের?

এই মুহূর্তে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগের আশ্রয়স্থল চিন। বর্তমানে সেদেশের মোট জনসংখ্যা ১৪১ কোটির বেশি। কিন্তু ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ পযন্ত দীর্ঘস্থায়ী হওয়া দুর্ভিক্ষের পর থেকে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে এমন পতন লক্ষ করা যায়নি।

১. মোট জনসংখ্যার অন্তত ২০% মানুষ চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হলে।

২. যদি কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শিশু তীব্র পরিমাণে অপুষ্টিতে ভোগে।

৩. নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতি ১০০০০ জন বাসিন্দার মধ্যে যদি অন্তত দুজন প্রতিদিন অনাহারে বা মারাত্মক খাদ্যাভাবে মারা যান।

ক্রমাগত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তবু সরকার থেকে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হলো না কেন ?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই মুহূর্তে বিশ্বে অনাহারে ভুগছেন কত মানুষ! পৃথিবী জুড়ে খাদ্য সংকট নিয়ে মিলল বিস্ফোরক তথ্য

২০৪৭ সালে ভারত উন্নত দেশের তালিকায় নাম লেখানোর পথে হাঁটছে। অন্নের অধিকার নিশ্চিত না করে তা কতখানি সম্ভব তা উত্তর মোদি সরকারের কাছে আছে কি?

যে কোন দেশে দুর্ভিক্ষ ঘোষণার সিদ্ধান্ত সাধারণত সরকার এবং জাতিসংঘ যৌথভাবে নিয়ে থাকে। তবে একটি দেশে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা হলে তা নিয়ে তৈরি হয় নানারকম রাজনৈতিক বিতর্ক। কারণে সেক্ষেত্রে বিরোধী দল শাসক দলের অক্ষমতার দিকগুলি তুলে ধরে, তার জেরেই তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। ঠিক এই কারণেই সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের নবনির্বাচিত সরকার দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে ইচ্ছুক নন কারণ তাদের মতে এটি জনসমর্পণকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এছাড়াও তাদের ধারণা দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করলে যে সমস্ত বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন তারা পুনরায় বিনিয়োগ করতে পিছিয়ে যাবেন এবং বৈদেশিক দেশগুলির সঙ্গে যে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রকল্প রয়েছে সোমালিয়ার তাতেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট মোহামুদ স্বীকার করেছেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে সোমালিয়ার কিছু অংশে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা গুরুতর। ওয়াশিংটনে থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ -এর একটি অনুষ্ঠানে মোহামুদ বলেন , “ কিছু ঘটনা সত্যি হলেও যেমন সব সময় স্বীকার করা যায় না, তেমনই দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছে এই কথা স্বীকার করা একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ । যা শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্তদের প্রভাবিত করবে তাই নয়, উপরন্তু দেশের উন্নয়নেও অনেক বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি হবে"।

সোমালিয়া কেন আরেকটি দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হলো ?

বলা যেতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনই হল এই দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ। সোমালিয়ার পাশের দুই দেশ ইথিওপিয়া এবং কেনিয়াতে বিগত পাঁচ বছরে বর্ষার ছিটেফোঁটাও হয়নি ফলে উৎপাদন হয়নি পর্যাপ্ত ফসল। এছাড়াও টানা দুবছর করোনা মহামারীর কারণে বন্ধ ছিল সমস্ত কিছুই। এমতাবস্থায় দাড়িয়ে আবারও দেশে তীব্র আকার ধারণ করছে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। অন্যদিকে ইউক্রেনে রাশিয়া আগ্রাসনের পর শস্য, জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে হয়েছে আকাশছোঁয়া। যার ফলে সোমালিয়ার মানুষের অনাহার বেড়ে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে কারণ এই দেশ প্রায় ৯০% গমের জন্যই রাশিয়া এবং ইউক্রেনের ওপর নির্ভশীল। সাধারণ মানুষের মুখে শুধু একটাই কথা। খাবার নেই, জল নেই... জীবন বাঁচানোই একমাত্র দায় হয়ে ঠেকেছে।

দুর্ভিক্ষ আসন্ন সোমালিয়ায়

বিগত তিন দশক ধরেই রাজনৈতিক অরাজকতার সম্মুখীন সোমালিয়া, ফলে ধ্বংস হয়েছে উত্তরাংশের সবুজ। ইতিমধ্যেই প্রায় চারবার এখানকার মানুষ নানারকম ভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে খরার কারণে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে পঞ্চমবারও খরার সম্মুখীন হতে চলেছে সোমালিয়া। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে যে দুটি দেশ সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সোমালিয়া। দ্বিতীয় নাইজের। তবে খাদ্য সংকটের প্রসঙ্গ এলে বাদ পড়ে না ভারতও। করোনা মহামারীর কারণে যখন ধনকুবেররা আরও ধনী হয়েছে তখন তার ঠিক উল্টোদিকেই হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারতের স্থান হয়েছে ১০৭। যদিও সোমালিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু বেশিই ভয়ংকর কারণ এখানে একটা সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয় আরেকটা।এমতাবস্থায় সমগ্র দেশের যৌথ প্রচেষ্টাই একমাত্র পারে এই সোমালিয়াকে মৃত্যুপুরী হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে।

লিখেছেন
Shibani
Shibani
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।