কেন কোরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো?
South Korea Former President Yoon Suk Yeol: বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ কোরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে সংবিধানবিরোধী অভ্যুত্থান পরিচালনার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিন চিহ্নিত হলো। দেশটির সিওল কেন্দ্রীয় জেলা আদালত বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলকে সংবিধানবিরোধী অভ্যুত্থান পরিচালনার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে।
বিচারক বলেছেন, তাঁর সেই কাজ গণতান্ত্রিক মৌলিক কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে, যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেনে নেওয়া যায় না।
এই ঘটনার সূত্রপাত ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট ইউন ‘মার্শাল ল’ অর্থাৎ জরুরি সামরিক আইন জারি করেন। তিনি দাবি করেছিলেন, দেশের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, আসলে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্থগিত করে বিরোধী দলগুলিকে চাপে রাখা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Faroe Islands geopolitics: ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ তথাকথিত 'GIUK Gap' (গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য) এর কেন্দ্রে অবস্থিত, যা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি নৌ ও আকাশপথ। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে এই করিডর পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার আর্কটিক নৌঘাঁটি 'মুরমানস্ক' থেকে আটলান্টিকে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট এটি।
সংসদ ভবনের বাইরে সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়, বিরোধী নেতাদের চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আটক করার চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই প্রবল জনরোষ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিরোধী দলের সদস্যরা অবরোধ ভেঙে সংসদে প্রবেশ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মার্শাল ল’ তুলে নেওয়া হয়।
কেন এটি অপরাধ? দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান ও ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, কেউ যদি সংসদ বা সরকারের মতো রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানকে অচল করে দিতে চায় বা জোর করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে, তাহলে তা ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে গণ্য হয়। বিচারক স্পষ্ট বলেন, মার্শাল ল’ জারি করে সংসদের কাজকর্ম থামিয়ে দেওয়া এবং সেখানে সেনা পাঠানো ছিল অভ্যুত্থানেরই সামিল। তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা।
বিচারকের কথায়, “ইউন সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দিয়েছেন, যা সংবিধানের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।” আদালত জানিয়েছে, এটি সাধারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; গণতন্ত্রের কাঠামোকেই ঝুঁকির মুখে ফেলার চেষ্টা ছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Thailand Election: অনেক বছর ধরে থাইল্যান্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আছে। কখনও সেনা অভ্যুত্থান, কখনও আদালতের হস্তক্ষেপ, কখনও আবার দল ভাঙনের রাজনীতি— এই সব কিছুর মধ্যে সাধারণ মানুষের মতামত বারবার চাপা পড়েছে। তাই এবারের নির্বাচনকে সাধারণ মানুষ তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেরা কথা বলার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ইউনের আইনজীবীদের বক্তব্য ছিল, সে সময়কার অস্থির পরিস্থিতি সামাল দিতেই তিনি আইনের মধ্যেই থেকে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন, এবং মার্শাল ল’ ছিল জরুরি অবস্থার মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ। কিন্তু আদালত এই যুক্তি মানেনি। বিচারকদের মতে, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই আইনসম্মত হতে পারে না।
দক্ষিণ কোরিয়ায় এর আগেও ক্ষমতাসীন বা প্রাক্তন রাষ্ট্রনেতাদের বিচারের মুখে পড়তে হয়েছে। যেমন ১৯৯০-এর দশকে সাবেক সামরিক শাসক চুন ডু-হোয়ান-কে সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পান। তবে ইউন-এর ঘটনা আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি নয়। এটিই প্রথমবার, এমন একজন নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্টকে ‘অভ্যুত্থান’ বা সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
দেশটি এখন স্পষ্টভাবে দু’ভাগে বিভক্ত। একদল মনে করছে, ইউন-এর পদক্ষেপ গণতন্ত্রের উপর সরাসরি আঘাত ছিল এবং আদালতের এই রায় সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করেছে। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের একাংশের দাবি, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা।
এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ায় গণতন্ত্র, ক্ষমতার সীমা এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার এক জোরালো বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকলেও সংবিধানবিরোধী পদক্ষেপ নিলে তার জন্য আইনের কাছে জবাবদিহি করতেই হবে। এই রায়ের প্রভাব দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।






