ওটেনকে সুভাষ কখনো মারতে চাননি

Debabrata Mondal
৩ মিনিট
ওটেনকে সুভাষ কখনো মারতে চাননি

৮৬/১ কলেজ স্ট্রিট, বইপাড়া। পুরনো বইয়ের মন ভালো করা গন্ধের সঙ্গে এখানে মিশে আছে ইতিহাসের পুরনো গন্ধ। এই অঞ্চলের ইতিউতি ছড়িয়ে আছে পুরনো ইতিহাস। যে ইতিহাস বাংলায় নবজাগরণ আগমনের গল্প বলে, স্বাধীনতার অগ্নিযুগের গল্প বলে, সত্তরের দশকে বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে যাওয়া কিছু তরুণ-তরুণীর রোমান্টিসিজমের গল্প বলে এই বইপাড়া। কলেজ স্ট্রিট দেখেছে ডিরোজিও - সুভাষকে, এই বইপাড়ার হাত ধরেই সমগ্র কলকাতাবাসী পরিচিত হয়ে উঠেছে পোড়া ট্রাম, গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড় যুবকের দেহ আর গলাকাটা কনস্টেবলের লাশের সঙ্গে। আজও প্রেসিডেন্সি, হিন্দু বা হেয়ার স্কুলের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় এমন অনেক ইতিহাসে স্মৃতিচারণ।

১৯১৩ সালের এক সকাল। সদ্য ঘুমভাঙা চোখে কলকাতা প্রস্তুতি নিচ্ছে আর একটা ব্যস্ত দিনের। এমন সময় প্রেসিডেন্সি কলেজের গেটে এসে দাঁড়ালেন এক তরুণ। সুভাষচন্দ্র বসু। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা। বস্তুতপক্ষে প্রেসিডেন্সির মাটি থেকেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুভাষের হাতেখড়ি যা পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ভারতে। প্রেসিডেন্সির বুকে এক সময় ডিরোজিওর মতো তরুণ অধ্যাপক উড়িয়ে দিয়েছিলেন যে প্রতিস্পর্ধার জয়ধ্বজা, সুভাষ যেন দক্ষ হাতে বহন করে নিয়ে চললেন তাঁকে। প্রেসিডেন্সিতে এলেও এখানে পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারেননি সুভাষ। একের পর এক জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছিলেন কলেজ জীবন থেকেই । সেই সময়ে প্রতিনিয়ত নতুন ভাবে আঁকতে হচ্ছিল আমাদের জীবনের যাপনচিত্র, ব্যতিক্রম ছিলেন না সুভাষচন্দ্র বসু। কটকের সেই একরত্তি ছেলেটাকে সময় যেন ভেঙেচুরে নিজের মতো করে গড়ে নিল পরবর্তী কয়েকটা বছরে।

হিন্দু হোস্টেলের বার্ষিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরেই বিতর্কে সূত্রপাত, যার জল পরবর্তীকালে গড়িয়েছিল অনেকদূর।' বঙ্গ আমার জননী আমার ' গানটি তখন ইংরেজ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে ইংরেজ সরকারের অত্যাচারের গ্রাফ। হিন্দু হোস্টেলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ইংরেজ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ' বঙ্গ আমার জননী আমার ' গানটি পরিবেশন করলেন হোটেল আবাসিকরা। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন ওটেন। তিনি সহ্য করেননি ছাত্রদের এই অবাধ্যতা। বক্তৃতার সময় ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করলেন ওটেন। বিরুদ্ধতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র প্রেসিডেন্সিতে। হিন্দু হোস্টেলের ডাকে শুরু হলো অনির্দিষ্টকালীন ছাত্র ধর্মঘট। অবশ্য এর আগে ছাত্রদেরকে প্রতিনিধিরূপে পাঠানো হয়েছিল সুভাষকে, অধ্যক্ষের কাছে সুভাষ দাবি জানান ওটেন যেন তার মন্তব্যের জন্য ছাত্রদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। প্রথম দিকে মানতে না চাইলেও, পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলনের কাছে অধ্যাপক ওটেন নতিস্বীকার করে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বাধ্য হলেন।

-

এর কিছুদিন পরেই আবার ওটেনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদের সুভাষ পুনর্বার ছাত্রধর্মঘটের ডাক দিলেন। সুভাষের কথা মতো, প্রেসিডেন্সি কলেজে এই ধর্মঘটের সাফল্যে সারা শহরে প্রবল উত্তেজনার কারণ হয়েছিল, ধর্মঘটের ছোঁয়াচ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো এবং কর্তৃপক্ষ ঘাবড়াতে শুরু করলেন। ধর্মঘটে যোগ দেওয়া ছাত্রদের উপর জরিমানা ধার্য করে আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভাঙতে চেয়েছিল প্রেসিডেন্সি কর্তৃপক্ষ। এরপরেও ছাত্ররা আন্দোলনের পথ থেকে সরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত ওটেন আবারও ছাত্রদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। যদিও ছাত্রদের জরিমানা প্রত্যাহার করা হয়নি।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। প্রবল বাকবিতণ্ডা শুরু হয় হিন্দু হোস্টেলের আবাসিক এবং ভারতবিদ্বেষী ওটেনের মধ্যে। এবার তার বিরুদ্ধে ছাত্রদের অভিযোগ ছিল আরও মারাত্মক। ওটেন নাকি বেশ কিছু ছাত্রকে শারীরিক নির্যাতন করেছিলেন। বাক বিতন্ডার মধ্যেই হিন্দু হোস্টেলের আবাসিকরা ওটেনকে নির্মমভাবে প্রহার করে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুভাষ ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। না এই ঘটনায় কাউকে পাশে পায়নি ছাত্রসমাজ। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ 'ছাত্রশাসনতন্ত্র'তে লিখেছিলেন, "কিন্তু ছাত্রকে জেলের কয়েদি বা ফৌজের সিপাই বলে আমরা মনে করতে পারি না। অতএব যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা, বা ড্রিল সার্জেন্ট বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত নয় ছাত্রদের মানুষ করবার ভার লওয়া।"

এই ঘটনার সঙ্গে সুভাষ যে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রমথনাথ সরকারের লেখায়, " তখন তিনটে কি চারটে বাজে, শেষ পিরিয়ডের শেষে ওটেন সাহেব সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন। তখন হিন্দু হোস্টেলের কয়েকজন বাছা বাছা ছেলে যারা পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছিল তারাই মেরেছিল।"

অনঙ্গমোহন দাস ছিলেন সেই দলে। তিনি বলেন, " ওটেন পড়ে গেলে আমি ও বিপিন দে তাকে দু - চার ঘা দিই। ওই মারামারিতে সুভাষ ছিল না।"

সুভাষ এই মারামারিতে না থাকলেও বেয়ারা বংশীলালের সাক্ষ্য অনুযায়ী সুভাষ এবং অনঙ্গমোহন দাস দু'জনকেই কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হল।

ইতিহাস বড় বিশ্বাসঘাতক। তাই বোধহয় সে বড় সহজেই দুয়ে দুয়ে চার করে ফেলতে পারে। তবে একথা সত্যি সেদিন যে বিদ্রোহের মশাল জ্বলেছিল সুভাষের হাতে, তা পরবর্তীকালে আলো যুগিয়েছে সারা ভারতবর্ষকে।

তথ্যসূত্র :-

১. ' দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র ' - পার্থ গোস্বামী

২. আনন্দবাজার পত্রিকা

৩. কলকাতাট্রিবিউন.ইন

লিখেছেন
Debabrata Mondal
Debabrata Mondal
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।