সুভাষ না রাসবিহারী, বাঙালির প্রাণের নায়ক সব্যসাচী আসলে কে!

rudranjan
৫ মিনিট
সুভাষ না রাসবিহারী, বাঙালির প্রাণের নায়ক সব্যসাচী আসলে কে!

ঝড় জলের রাতে সব্যসাচী বৃষ্টির আস্তরণ পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন দূরে। তাঁর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভারতী। সুমিত্রার চোখের কোলে জমছে কান্না। এতদিন বর্মা মুলুকে যৌথ প্রচেষ্টায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার শেষ কি এখানেই? নাকি, আরও কোনও একলব্য আছেন যিনি মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে অবলীলায় হানা দেবেন সূর্যতোরণে ? আশা নিরাশার এই দোলাচলেই ফুরোয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী'। তার কুশীলব সব্যসাচী মল্লিক বাঙালির আদর্শ সুপারহিরো। কঠিন শপথ তাঁর, যে কোনও মূল্যে ভারতবর্ষের শরীর থেকে মুছে ফেলতে হবে পরাধীনতার গ্লানি। দুই হাতে পোক্ত তীরন্দাজের তেজ নিয়ে তিনি যাত্রা করেন অন্ধকার থেকে আলোর উদ্দেশ্যে। ইংরেজ শাসনে সব্যসাচীর মধ্যে দিয়ে যেন একজন যথার্থ বিপ্লবীকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন শরৎচন্দ্র। তাঁর চিন্তাধারায় প্রকাশ পেয়েছিল অগ্নিযুগের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার স্পৃহা। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, সে চরিত্রের বাস্তব অনুপ্রেরণা কে? কার আদলে সব্যসাচীর মতো অমন একজন প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন চরিত্র এঁকেছিলেন তিনি? একদল মনে করেন সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু তথ্য প্রমানের রায় এ ধারণার বিপরীতে। সব্যসাচীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর সঙ্গে আসলে যাঁর মিল খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর নাম রাসবিহারী বসু। যাঁর কিস্সা কাহিনি শ্রোতাকে যুগ যুগ ধরে রোমাঞ্চিত করে এসেছে।

দিনটা ছিল খ্রিস্টমাসের, সাল ১৯১২। তৎকালীন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সিদ্ধান্তে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে দিল্লিতে। তারই উদ্বোধনে সারা শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জৌলুষময় 'State entry' । বিরাট শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে নতুন রাজধানীর মানুষজন বরণ করে নিচ্ছেন হার্ডিঞ্জকে।।তিনি বসে আছেন জমকালো সাজের এক পেল্লায় হাতির উপর। হঠাৎ করে তাঁর উপর এসে পড়ল দুটো বোমা। ক্ষয় ক্ষতি বিশেষ হল না ঠিকই, কিন্তু মাহুতের মৃত্যু ঘটল তৎক্ষণাৎ। আশেপাশে হুলুস্থুল পড়ে গেল। কার এত বড় আস্পর্ধা যে স্বয়ং বড়লাটকে লক্ষ্য় করে বোমা ছোঁড়ে? সাক্ষীও পাওয়া গেল অল্প সময়ের মধ্যেই। তিনি জানালেন যে এক বাড়ির ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখেছেন দুজন মুসলমান জেনানাকে বোমা ছুঁড়তে। আসলে কেউই জানতেন না, মহিলার ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন খোদ বাংলার দুই দামাল বিপ্লবী। তাঁদের নাম বসন্ত বিশ্বাস এবং মন্মথনাথ বিশ্বাস। গুপ্ত সমিতির নায়ক রাসবিহারীর নির্দেশেই তাঁরা চাঁদনি চৌকের একটা বাড়ির ছাদে পজিশন নিয়েছিলেন। সযত্নে তাঁদের ছদ্মবেশে মুড়ে দিয়েছিলেন খোদ রাসবিহারী। ইংরেজ সরকারের কাছে তাঁর মাথার দাম তখন অনেক। ফেরারি জীবনের সূত্রপাত অবশ্য হয়েছিল এ ঘটনার আগেই। এককালে ফরেস্ট অফিসের নিরীহ কেরানির ছদ্মবেশে চালাতেন বিপ্লবের কাজ। কিন্তু আত্মগোপন করে থাকা বেশিদিন সম্ভব হল না তাঁর পক্ষে। পালাতে হল কাশীতে।

ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন শহর বারাণসী। সেখানেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে রাসবিহারী থাকেন। জোর কদমে চলে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের তালিম। এমনই একদিন দলের ছেলেদের বোমা বাঁধা শেখাতে গিয়ে কোনোভাবে বাড়ির ভেতরেই ঘরে গেল বিস্ফোরণ। এলাকা কেঁপে উঠল তার শব্দে। বাড়িওয়ালা ছুটে এলেন তড়িঘড়ি, ছেলে ছোকরারা করে কী। এসে তো তিনি হতবাক। সমবেতভাবে তাঁর কাছে সাফাই গাওয়া হল, 'ইয়ে, মানে, এসিড ভরতি একটা বোতল ফেটে শব্দ হল আর কী।' এরপর আর সে বাড়িতে থাকা চলেনা রাসবিহারীর। উপরন্তু, বোমা ফেটে খানিক আহতও হয়েছিলেন তিনি। তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল ডাক্তার কালীপ্রসন্ন সন্যালের বাড়ি। হঠাৎ একদিন তাঁর এক সহকর্মী এসে জানালেন, কাশীর দেওয়ালে দেওয়ালে তাঁর ছবি আটকানো পোস্টার ঘুরছে। ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেছে, যে ধরিয়ে দিতে পারবে রাসবিহারীকে, তাকে দেওয়া হবে মোটা টাকা পুরস্কার। রাসবিহারী বুঝলেন এমন অনেকেই আছে যারা কটা টাকার জন্য তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পেছপা হবে না। কী করা যায়?

এসব ভাবতে ভাবতেই মাথায় একটা ফন্দি এল। সহকর্মীদের বললেন একটা খাটিয়া জোগাড় করতে। তারপর খেলার শুরুওয়াত। রাসবিহারীকে গ্রেপ্তার করতে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ, তাঁদের চোখের সামনে দিয়েই খাটিয়া করে চাদর চাপা মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে গেলেন একদল। শবের ছদ্মবেশে ঠায় শুয়ে রইলেন রাসবিহারী বসু। এভাবেই পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সেখান থেকে পালালেন তিনি। এমন ঘটনার সন্ধান রাসবিহারীর জীবনে যে কত পাওয়া যাবে তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর ছদ্মবেশে জাপান পালানোর গল্প আজকের দিনেও শিহরণ জাগায়।

দিল্লীর বিস্ফোরণের ঠিক তিন বছর পরেই রাসবিহারী বুঝলেন ভারতে থেকে আর কাজ করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বার্থে জাপান যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে যাবেনই বা কী করে? পাসপোর্ট কোথায়? এমন সময় তাঁর কানে এলো কয়েকদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের সে দেশে যাওয়ার কথা। এসে পড়ল সুযোগ। মাথায় সাদা রেশমের পাগড়ি এবং বুকে অভিজাত কোর্ট চাপিয়ে তিনি একটা ব্রুহাম চেপে রওনা হলেন পাসপোর্ট অফিসের দিকে। সেখানে গিয়ে চোস্ত ইংরেজিতে জিগেস করলেন, 'আমি কি একবার পাসপোর্ট অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে পারি?' অমন সম্ভ্রান্ত পোশাক দেখে পাসপোর্ট অফিসার এমনিতেই হকচকিয়ে গেছিলেন। এবার রাসবিহারী তাঁকে জানালেন যে তিনি রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়, রাজা পি. এন. টেগোর। তারপর তাঁর প্রয়োজন খোলসা করলেন। পাসপোর্ট অফিসার নিশ্চই শুনেই থাকবেন যে রবীন্দ্রনাথ জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন। তিনি যাচ্ছেন রবিবাবুর সহকারী হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের জাপান পৌঁছনোর আগেই তাঁকে পৌঁছে যাবতীয় বন্দ্যবস্ত সেরে রাখতে হবে। সেসব মাথায় রেখে তাঁকে যদি চটজলদি একটা পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় তাহলে খুবই সুবিধা হয়। ঠাকুরবাড়ির একজন সদস্য এসে পাসপোর্ট চাইছেন আর অফিসারসাহেব তাঁকে মানা করে দেবেন তা কি হয়? অল্প সময়ের মধ্যেই রাসবিহারীর হাতে এসে গেল পাসপোর্ট।

এভাবেই ছদ্মবেশকে কাজে লাগিয়ে ভয়ঙ্কর সমস্ত অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়েছেন রাসবিহারী বসু। তাঁর এই ছদ্মবেশের কারিগরী সব্যসাচী মল্লিকের মধ্যেও প্রবলভাবে লক্ষ করা যায়। পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে কখনও ঢিলে পায়জামা আর রাওলপিন্ডির নাগরা পরে তিনি কাবুলিওয়ালা সাজেন। আবার কোনও সময় তিনি চট্টগ্রামের মাঝির বেশ ধরে যাত্রীদের নদী পারাপার করান। রাসবিহারীর মতোই তিনি বহু ভাষায় কথা বলতে পারেন। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী সুভাষের আদলে গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না প্রধানত দুটো কারণে। প্রথমত শরৎচন্দ্র সাক্ষাৎকরে নিজেই জানিয়েছেন যে সব্যসাচীর ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন রাসবিহারীকে। দ্বিতীয়ত, সুভাষবাবু কলকাতা ছেড়ে আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে পালয়েছিলেন ১৯৪১ সালে। অথচ, এর ১৫ বছর আগেই প্রকাশিত হচ্ছে 'পথের দাবী'।

বিতর্ক চলবে নিজের পথে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম দুই নায়ককে কেন্দ্র করে সাধারন মানুষের গল্পকথার অন্ত নেই। চে গেভারা মনে করতেন, 'A revolutionary is guided by feelings of love'। ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করতে এই রোম্যান্টিকতার টানেই তো দেশ ছেড়েছিলেন রাসবিহারী। পরবর্তীতে তাঁর পথ অনুসরণ করেছিলেন সুভাষ। ২৩ জানুয়ারি সুভাষের জন্মদিন। তার ঠিক দুদিন পর, অর্থাৎ ২৫ এ জানুয়ারি জাপানে সম্পন্ন হয়েছিল রাসবিহারীর শেষকৃত্য। একে কাকতলীয় ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে? শুধু আদর্শ নয়, জন্ম মৃত্যুর তারিখের মধ্যে দিয়েও বাঙালির দুই শ্রেষ্ঠ নেতা যেন চলে এসেছেন পরস্পরের বড্ড কাছাকাছি।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।