গরমে অস্থির, আসুন গা ছমছমে ব্রিটিশ বাংলো আর চা বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রামে

গা ছমছমে বাংলো, সবুজ ঢেউখেলানো চা বাগান, অর্কিড আর কুয়াশায় ঘেরা তাকদা মুগ্ধতা ছড়াবেই। নির্জনতা ভালবাসলে চলে আসুন নীলপাহাড়ি আর কুয়াশার এই দেশে।

tiasa gupta
৪ মিনিট
গরমে অস্থির, আসুন গা ছমছমে ব্রিটিশ বাংলো আর চা বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রামে

...পাকদণ্ডি পথ বেয়ে তার বাগানঘেরা বাড়ি।

বাগান শেষে সদরদুয়ার,

বারান্দাতে আরামচেয়ার

গালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের ফালি

সেথায় এসে মেঘপিওনের সমস্ত ব্যাগ খালি

এখান থেকে আকাশজোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা ডাক পাঠাবে। নিচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর সঙ্গম। পাহাড়ি উপকথায় তিস্তার জল যখন শুকিয়ে যাচ্ছিল, তার ডাকে ছুটে এসেছিল রঙ্গিত। পাকদণ্ডি পথ ধরে এগিয়ে যেতেই চা বাগান আর রঙিন অর্কিডের দেশ তাকদা।

এই পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আছে দু’দণ্ড শান্তি, নির্জনতা, উন্মুক্ত প্রকৃতি, বিশুদ্ধ বাতাস আর আনন্দ। লেপচা ভাষায় নাকি 'তাকদা’ শব্দের অর্থ মেঘে ঢাকা বা কুয়াশায় ঘেরা। এখানে নেমে আসে কুয়াশা যখনতখন, তারপর সবুজ চা বাগিচা, বড় বড় পাইনগাছের সারি, পাথুরে প্রাচীন রাস্তা, ইতিহাসের গন্ধমাখা ব্রিটিশ বাংলো তখন ঢেকে যায় কুয়াশার চাদরে। মেঘ ঘিরে ফেলে সবুজ ঢেউখেলানো চা বাগান, পাহাড়ি উপত্যকা।

তাকদার সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা হল অর্কিড হাউস। ব্রিটিশ আমলের বেশ কিছু হেরিটেজ বাংলো আছে এখানে, যাদের বয়স কম করে একশো পূর্ণ হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আর্মি অফিসাররা ভালবেসে ফেলেছিলেন এই জায়গা, তাঁদেরই বাংলোগুলো এখন ইতিহাসের অধ্যায় বুকে নিয়ে রয়ে গেছে। কোনও কোনও বাংলোর তলায় নাকি আছে ব্রিটিশ বাঙ্কার!

চারদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গাছেরা। তার মধ্য দিয়ে মেঘপিওনের চলাচল। তারা খবর নিয়ে যায়, আপনি কেমন আছেন মেঘের দেশে। নানা রঙের অর্কিডে ঘেরা একটি ছোট পাহাড়ি জনপদ এই তাকদা। এই গ্রামটির উচ্চতা প্রায় ৪০০০ ফিট, স্থানীয় ভাষায় 'তাকদা' বা 'তুকদা' কথার অর্থ হল মেঘে ঢাকা, প্রকৃতপক্ষেই পাহাড়ের ঢালে মেঘে ঘেরা এই গ্রামটি।

তাকদা গ্রামে স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ অফিসারদের সেনানিবাস ছিল। ফলে তাকদাতে ব্রিটিশ সেনাদের পুরনো বাংলো ঐতিহাসিক নিদর্শন বহন করছে। এখানে এলে আপনিও সাক্ষী হতে পারবেন সেই ইতিহাসের। ব্রিটিশরা কী ঠাঁটবাটে থাকত, তার হালহদিশ চাক্ষুষ করতে পারবেন এই ব্রিটিশ বাংলোগুলোতে। চারদিকে সবুজে ঘেরা চা বাগান , আপনার ঘুম ভাঙবে পাখিদের ডাকে, বিভিন্ন প্রজাতির হরেক রঙের অর্কিড, শান্ত নির্জন পরিবেশ– এসব নিয়েই বর্ষায় অপরূপ হয়ে ওঠে তাকদা।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে এলে বা অফিসের কাজের পর সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর জন্য শান্ত পরিবেশের একটি পাহাড়ি গ্রাম হিসেবে তাকদাকে অবশ্যই বেছে নিতে পারেন। তাকদা পর্যটক স্থান হিসেবে খ্যাত না হওয়ায় এখানে তেমন ভিড় পাবেন না। ফলে খুব শান্ত একটি পরিবেশে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারবেন। তাহলে আর দেরি কেন? আপনার ভ্রমণ-তালিকায় টুকে নিন তাকদার নাম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দার্জিলিং নয়, চা-বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রাম থেকেই দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্রেষ্ঠ রূপ

এখানে আসার শ্রেষ্ঠ সময় হল নভেম্বর থেকে মার্চ মাস। বিশেষ করে আপনি যদি কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দর্শন করতে চান। তবে সারা বছরই এখানে আসা যায়।

তাকদা এলে তিনচুলে যাবেন না, তা হয় না কি! তাকদা থেকে তিন কিমি. দূরেই রয়েছে আর এক পাহাড়ি গ্রাম তিনচুলে। এই তিনচুলে এখন বেশ পরিচিত ট‍্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। তিনচুলে থেকে তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর সঙ্গমস্থল এক দুর্দান্ত দৃশ্য। এছাড়া তাকদা থেকে লামাহাট্টা, দুর্পিন, পেশক, মংপু, ছোট মাংগাওয়া সবই ১২-১৪ কিমি.-র মধ্যে।

যা যা দেখতেই হবে

তাকদার মূল আকর্ষণ বিস্তৃত সবুজে ঘেরা চা বাগান, যা দেখে তার মাঝে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে। এই চা বাগানগুলির মধ্যে অন্যতম হল রংলি রাংলিওত চা বাগান, তিস্তা ভ্যালি চা বাগান, গিল্লে চা বাগান, নাম্রিং চা বাগান। এই সমস্ত চা বাগান গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন এবং দেখে নিতে পারেন চা ফ্যাক্টরি, যেখানে এই সমস্ত চা বাগানের চা পাতা প্রসেস করে চা বানানো হয়।

তাকদা থেকে প্রায় ৪ কিমি. দূরে অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রাম তিনচুলে, এখানে থেকে মেঘমুক্ত আকাশে সহজেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন, চাইলে তিনচুলেতেও থাকতে পারেন।

তাকদা থেকে প্রায় ১২ কিমি. দূরে ঘন পাইনের জঙ্গলে ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর এক পার্কে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার শোভা উপভোগ করতে পারেন। ত্রিবেণী হল তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর মিলনস্থল। ত্রিবেণীতে দু'টি নদীর মিলনস্থলের পাশে সাদা বালুর চরের ওপর ক্যাম্পিং করে থাকার ব্যবস্থা আছে।

কীভাবে যাবেন তাকদা

তাকদা গ্রামটি শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৬০ কিমি., এনজেপি থেকে প্রায় ৬৫ কিমি. ও দার্জিলিং থেকে প্রায় ২৭ কিমি. দূরত্বে অবস্থিত। আপানারা এই সমস্ত জায়গা থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য সরাসরি গাড়ি পেয়ে যাবেন। শিলিগুড়ি বা এনজেপি থেকে গাড়ি ভাড়া করলে ছোট গাড়ির ভাড়া পড়বে ২৫০০-৩০০০ টাকা (আনুমানিক) এবং বড় গাড়ির ভাড়া পড়বে ৩৫০০-৪০০০ টাকা (আনুমানিক)।

এছাড়াও চাইলে শেয়ার গাড়ি করে, রুট বদলে বদলে চলে আসতে পারেন তাকদায়, সেক্ষেত্রে গাড়িভাড়ার খরচ কম লাগতে পারে।

কোথায় থাকবেন

তাকদা একটি ছোট অখ্যাত পাহাড়ি গ্রাম হওয়ায় এখানে থাকার জন্য কোনও হোটেল পাবেন না, তবে এখানে থাকার জন্য আপানারা হোম স্টে পেয়ে যাবেন, যেগুলির বেশিরভাগই ব্রিটিশদের তৈরি পুরনো বাংলো। স্বাধীনতার পর এই পরিত্যক্ত পুরনো ব্রিটিশ বাংলোগুলি স্থানীয়রা অধিগ্রহণ করে আধুনিকীকরণ করে সেগুলিকে পর্যটকদের থাকার জন্য হোম স্টে হিসেবে ব্যবহার করছে।

পুরনো দিনের ব্রিটিশদের তৈরি ওইসব বাংলোতে থেকে এবং তাদের তৈরি বিভিন্ন স্থাপত্য দেখে আপনার মনে এক আলাদা রাজকীয় আনুভুতির সৃষ্টি হতেই পারে।

গা ছমছমে বাংলো, সবুজ ঢেউখেলানো চা বাগান, অর্কিড আর কুয়াশায় ঘেরা তাকদা মুগ্ধতা ছড়াবেই। নির্জনতা ভালবাসলে চলে আসুন নীলপাহাড়ি আর কুয়াশার এই দেশে। 'যেথায় যে মন থাক সে'... আপনার গন্তব্য হয়ে উঠুক তাকদা।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।