গরমে অস্থির, আসুন গা ছমছমে ব্রিটিশ বাংলো আর চা বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রামে

...পাকদণ্ডি পথ বেয়ে তার বাগানঘেরা বাড়ি।
বাগান শেষে সদরদুয়ার,
বারান্দাতে আরামচেয়ার
গালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের ফালি
সেথায় এসে মেঘপিওনের সমস্ত ব্যাগ খালি

এখান থেকে আকাশজোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা ডাক পাঠাবে। নিচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর সঙ্গম। পাহাড়ি উপকথায় তিস্তার জল যখন শুকিয়ে যাচ্ছিল, তার ডাকে ছুটে এসেছিল রঙ্গিত। পাকদণ্ডি পথ ধরে এগিয়ে যেতেই চা বাগান আর রঙিন অর্কিডের দেশ তাকদা।

এই পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আছে দু’দণ্ড শান্তি, নির্জনতা, উন্মুক্ত প্রকৃতি, বিশুদ্ধ বাতাস আর আনন্দ। লেপচা ভাষায় নাকি 'তাকদা’ শব্দের অর্থ মেঘে ঢাকা বা কুয়াশায় ঘেরা। এখানে নেমে আসে কুয়াশা যখনতখন, তারপর সবুজ চা বাগিচা, বড় বড় পাইনগাছের সারি, পাথুরে প্রাচীন রাস্তা, ইতিহাসের গন্ধমাখা ব্রিটিশ বাংলো তখন ঢেকে যায় কুয়াশার চাদরে। মেঘ ঘিরে ফেলে সবুজ ঢেউখেলানো চা বাগান, পাহাড়ি উপত্যকা।

আরও পড়ুন: দার্জিলিং নয়, চা-বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ি গ্রাম থেকেই দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্রেষ্ঠ রূপ

তাকদার সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা হল অর্কিড হাউস। ব্রিটিশ আমলের বেশ কিছু হেরিটেজ বাংলো আছে এখানে, যাদের বয়স কম করে একশো পূর্ণ হয়ে গেছে। ব্রিটিশ আর্মি অফিসাররা ভালবেসে ফেলেছিলেন এই জায়গা, তাঁদেরই বাংলোগুলো এখন ইতিহাসের অধ্যায় বুকে নিয়ে রয়ে গেছে। কোনও কোনও বাংলোর তলায় নাকি আছে ব্রিটিশ বাঙ্কার!

চারদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গাছেরা। তার মধ্য দিয়ে মেঘপিওনের চলাচল। তারা খবর নিয়ে যায়, আপনি কেমন আছেন মেঘের দেশে।  নানা রঙের অর্কিডে ঘেরা একটি ছোট পাহাড়ি জনপদ এই তাকদা। এই গ্রামটির উচ্চতা প্রায় ৪০০০ ফিট, স্থানীয় ভাষায় 'তাকদা' বা 'তুকদা' কথার অর্থ হল মেঘে ঢাকা, প্রকৃতপক্ষেই পাহাড়ের ঢালে মেঘে ঘেরা এই গ্রামটি।

তাকদা গ্রামে স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশ অফিসারদের সেনানিবাস ছিল। ফলে তাকদাতে ব্রিটিশ সেনাদের পুরনো বাংলো ঐতিহাসিক নিদর্শন বহন করছে। এখানে এলে আপনিও সাক্ষী হতে পারবেন সেই ইতিহাসের। ব্রিটিশরা কী ঠাঁটবাটে থাকত, তার হালহদিশ চাক্ষুষ করতে পারবেন এই ব্রিটিশ বাংলোগুলোতে। চারদিকে সবুজে ঘেরা চা বাগান , আপনার ঘুম ভাঙবে পাখিদের ডাকে, বিভিন্ন প্রজাতির হরেক রঙের অর্কিড, শান্ত নির্জন পরিবেশ– এসব নিয়েই বর্ষায় অপরূপ হয়ে ওঠে তাকদা।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে এলে বা অফিসের কাজের পর সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর জন্য শান্ত পরিবেশের একটি পাহাড়ি গ্রাম হিসেবে তাকদাকে অবশ্যই বেছে নিতে পারেন। তাকদা পর্যটক স্থান হিসেবে খ্যাত না হওয়ায় এখানে তেমন ভিড় পাবেন না। ফলে খুব শান্ত একটি পরিবেশে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারবেন। তাহলে আর দেরি কেন? আপনার ভ্রমণ-তালিকায় টুকে নিন তাকদার নাম।

তাকদা এলে তিনচুলে যাবেন না, তা হয় না কি! তাকদা থেকে তিন কিমি. দূরেই রয়েছে আর এক পাহাড়ি গ্রাম তিনচুলে। এই তিনচুলে এখন বেশ পরিচিত ট‍্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। তিনচুলে থেকে তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর সঙ্গমস্থল এক দুর্দান্ত দৃশ্য। এছাড়া তাকদা থেকে লামাহাট্টা, দুর্পিন, পেশক, মংপু, ছোট মাংগাওয়া সবই ১২-১৪ কিমি.-র মধ্যে।

যা যা দেখতেই হবে
তাকদার মূল আকর্ষণ বিস্তৃত সবুজে ঘেরা চা বাগান, যা দেখে তার মাঝে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে। এই চা বাগানগুলির মধ্যে অন্যতম হল রংলি রাংলিওত চা বাগান, তিস্তা ভ্যালি চা বাগান, গিল্লে চা বাগান, নাম্রিং চা বাগান। এই সমস্ত চা বাগান গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন এবং দেখে নিতে পারেন চা ফ্যাক্টরি, যেখানে এই সমস্ত চা বাগানের চা পাতা প্রসেস করে চা বানানো হয়।

তাকদা থেকে প্রায় ৪ কিমি. দূরে অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রাম তিনচুলে, এখানে থেকে মেঘমুক্ত আকাশে সহজেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন, চাইলে তিনচুলেতেও থাকতে পারেন।

তাকদা থেকে প্রায় ১২ কিমি. দূরে ঘন পাইনের জঙ্গলে ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর এক পার্কে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার শোভা উপভোগ করতে পারেন। ত্রিবেণী হল তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর মিলনস্থল। ত্রিবেণীতে দু'টি নদীর মিলনস্থলের পাশে সাদা বালুর চরের ওপর ক্যাম্পিং করে থাকার ব্যবস্থা আছে।

কীভাবে যাবেন তাকদা
তাকদা গ্রামটি শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৬০ কিমি., এনজেপি থেকে প্রায় ৬৫ কিমি. ও দার্জিলিং থেকে প্রায় ২৭ কিমি. দূরত্বে অবস্থিত। আপানারা এই সমস্ত জায়গা থেকে তাকদা যাওয়ার জন্য সরাসরি গাড়ি পেয়ে যাবেন। শিলিগুড়ি বা এনজেপি থেকে গাড়ি ভাড়া করলে ছোট গাড়ির ভাড়া পড়বে ২৫০০-৩০০০ টাকা (আনুমানিক) এবং বড় গাড়ির ভাড়া পড়বে ৩৫০০-৪০০০ টাকা (আনুমানিক)।

এছাড়াও চাইলে শেয়ার গাড়ি করে, রুট বদলে বদলে চলে আসতে পারেন তাকদায়, সেক্ষেত্রে গাড়িভাড়ার খরচ কম লাগতে পারে।

কোথায় থাকবেন
তাকদা একটি ছোট অখ্যাত পাহাড়ি গ্রাম হওয়ায় এখানে থাকার জন্য কোনও হোটেল পাবেন না, তবে এখানে থাকার জন্য আপানারা হোম স্টে পেয়ে যাবেন, যেগুলির বেশিরভাগই ব্রিটিশদের তৈরি পুরনো বাংলো। স্বাধীনতার পর এই পরিত্যক্ত পুরনো ব্রিটিশ বাংলোগুলি স্থানীয়রা অধিগ্রহণ করে আধুনিকীকরণ করে সেগুলিকে পর্যটকদের থাকার জন্য হোম স্টে হিসেবে ব্যবহার করছে।

পুরনো দিনের ব্রিটিশদের তৈরি ওইসব বাংলোতে থেকে এবং তাদের তৈরি বিভিন্ন স্থাপত্য দেখে আপনার মনে এক আলাদা রাজকীয় আনুভুতির সৃষ্টি হতেই পারে।

গা ছমছমে বাংলো, সবুজ ঢেউখেলানো চা বাগান, অর্কিড আর কুয়াশায় ঘেরা তাকদা মুগ্ধতা ছড়াবেই। নির্জনতা ভালবাসলে চলে আসুন নীলপাহাড়ি আর কুয়াশার এই দেশে। 'যেথায় যে মন থাক সে'... আপনার গন্তব্য হয়ে উঠুক তাকদা।

More Articles

;