কালীর সম্পূর্ণ অন্য রূপ তন্ত্রসাধনায়, হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে গোপন ধারাটি সম্পর্কে যে তথ্য অজানা...

'তনোতি ত্রায়তি তন্ত্র'- তন্ত্রের আক্ষরিক উদ্ভব সম্পর্কে মূলত এমনটাই মনে করা হয়। ভারত তন্ত্রসাধনার দেশ। প্রাচীন কাল থেকে ভক্তরা তাঁদের সিদ্ধিলাভের জন্য তন্ত্রসাধনা করে আসছেন। যেসব দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে তন্ত্র সাধনা হয়ে থাকে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবী হলেন কালী। তন্ত্রসাধনা খুবই গুপ্ত ও কঠিন সাধনা। একমাত্র সিদ্ধিলাভ করেছেন এমন গুরুই তাঁর শিষ্যকে তন্ত্রসাধনার দীক্ষা দিয়ে সঠিক পথ প্রদর্শন করতে পারেন। এর সাধনকৌশল নিয়ে যুগে যুগে কৌতূহল সঞ্চারিত হয়েছে। তাই আজও এর সাধন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

 

তন্ত্র কী?
মনে করা হয়, সনাতন ধর্মে এই তন্ত্রসাধনার উদ্ভব ঘটেছিল খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের প্রথম দিকে। তন্ত্র হল এক বৃহত্‍ ও গভীর, গোপন বিষয়। প্রকৃত গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে গুরু-নির্দেশিত পথে তন্ত্রসাধনা করতে হয়।

 

তবে সংক্ষেপে বলতে হলে বলা যায়, তন্ত্র হল সৃষ্টি পরিচালনার নিয়ম। তাই তন্ত্র বিষয়টির তাৎপর্য বিশাল। তন্ত্র অতি প্রাচীন, বৃহত্‍, গুপ্ত একটি বিষয়। তন্ত্রসাধকরা মনে করেন, এই মহাবিশ্ব শিবশক্তি ও মাতৃশক্তির অপার লীলা।

 

আরও পড়ুন: নাগা সন্ন্যাসী কারা! কতটা কঠিন এই সাধন পথ, জানলে শিউরে উঠবেন

 

তাই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের কর্মকাণ্ড, অর্থাত্‍ সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়কে তন্ত্র বলা হয়। গুপ্ত যুগের শেষ দিকে তন্ত্রের প্রচলন ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারপর চৈনিক পরিব্রাজকরা অনেক তন্ত্রের পুঁথি তাঁদের দেশে নিয়ে যান। এর ফলে বৌদ্ধধর্মে তন্ত্রের প্রবেশ ঘটে।

 

তন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত আছে মন্ত্র ও যন্ত্র। যন্ত্র হল দর্শন আর পুজো হল পদ্ধতি। অবিদ্যাকে গ্রাস করে জ্ঞানশক্তির উন্মোচন করে তন্ত্র। আর প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময় করাই তন্ত্রের উদ্দেশ্য।

 

তন্ত্র অসীম শক্তির আধার। তন্ত্র সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের পরিচালনশক্তি। তাই তো তন্ত্রবিদ্যা অতি গোপন বিদ্যা। তাই দীক্ষা ছাড়া গুরু কাউকে এই পথের সন্ধান দিতে চান না। মুক্ত বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, "তন্ত্র হল সনাতন হিন্দু সমাজে প্রচলিত উপাসনার একটি পদ্ধতি। তন্ত্রের উদ্দেশ্যই হল মানুষকে অজ্ঞানতা ও পুনঃজন্মের হাত থেকে মুক্ত করা।"

 

‘তনু’ থেকে ‘তন্ত্র’ কথাটি এসেছে। তন্ত্রসাধনার মূল দাঁড়িয়ে আছে ‘পঞ্চ ম’-এর ওপর। এই ‘পঞ্চ ম’ হল ‘মদ্য’, ‘মৎস্য’, ‘মাংস’ ‘মন্ত্র’ ও ‘মৈথুন’। তবে তন্ত্রসাধনা আর তন্ত্র প্রকারে কালীপুজোর মধ্যে, বিশেষ করে লোকচক্ষুর সামনে মা কালীর যে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুজো হয়ে থাকে, তার মন্ত্র, মুদ্রা ও আচার কিছুটা হলেও আলাদা। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে মা কালীর পুজোয় জীব বলি দেওয়া হয় ও মৎস্য ভোগও নিবেদন করা হয়। মাকে সুরা নিবেদন করা হয় মন্ত্র দ্বারা। তান্ত্রিক পদ্ধতিতে কালীপুজোয় বোয়াল মাছ ও অন্যান্য মাছ ভোগ দেওয়া হয়। বলির মাংস পাঁঠার ঘাড় বা গলার কাছ থেকে কয়েক টুকরো মাংস ও রক্ত মাকে ছোট মাটির মুছি বা ছোট সরার মতো বাটিতে, এবং মন্ত্র দ্বারা সেইসব বাটিতে একটি করে কলা দিয়ে মা কালীকে নিবেদন করা হয়। বলির মাংস রান্না করে মায়ের ভোগে দেওয়া হয়।

 

ডান পা শিবের ওপর রাখা মা কখনও কৃষ্ণবর্ণা, কখনও নীলবর্ণা, আবার পীতবর্ণা, রক্তবর্ণা, শুভ্রবর্ণা কখনও তিনি চামুণ্ডা, কখনও বা শত্রু দমনকারী বগলা, তিনিই আবার তন্ত্রমতে মা কমলা, মহালক্ষ্মী, আবার তন্ত্রের দেবী মাতঙ্গি বিদ্যাদাত্রী সরস্বতী। সাধারণত, কাপালিক, অঘোরী, তান্ত্রিক প্রভৃতি, যাঁরা তন্ত্রের দ্বারা কালী সাধনা করে থাকেন।

 

তন্ত্রসাধনা বেশ কষ্টকর। প্রথমে পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে বশে আনতে হবে। নিজের কুলকুণ্ডলিনীকে জাগাতে হবে। শোনা যায়, তন্ত্রসাধনা করতে গেলে সাধক বা সাধিকা ভূত-প্রেত ও নানা রকম ভয় ও প্রলোভনকে জয় করে তবেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারেন। সন্ন্যাস নিয়ে বা গৃহে থেকেও সঠিক গুরুর পরামর্শে সাধক বা সাধিকা তন্ত্রসাধনায় মা কালীকে তৃপ্ত করতে পারেন।

 

তন্ত্রসাধনা কত প্রকার ও কী কী?
তন্ত্রসাধনাকে সাধারণত দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়, প্রথম হল আভ্যন্তরীণ যেখানে সমস্ত ক্রিয়া শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং দ্বিতীয় হল বাহ্যিক প্রক্রিয়া, যেখানে নানা আচার-অনুষ্ঠান ক্রিয়া সম্পন্ন করা দরকার।

 

এই দুই ভাগের ওপর ভিত্তি করে ভারতে কয়েকহাজার তন্ত্রসাধনা প্রণালীর জন্ম, যা ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়াও বহু প্রকৃতির তন্ত্রসাধন প্রণালী সম্পূর্ণ গোপন ও গুরু-শিষ্য পরম্পরায় লাভ হয়ে থাকে, যার লিখিত কোনও পুঁথিপত্র নেই।

 

সবকিছুর মধ্যেও পরিচিত কিছু তন্ত্র প্রণালীর নাম হল কালভৈরব তন্ত্র, কুমারী তন্ত্র, কুণ্ডলিনী তন্ত্র, বিশুধি তন্ত্র, শৈব তন্ত্র, শাক্ত তন্ত্র, সূর্য তন্ত্র, কামধেনু তন্ত্র, নির্বাণ তন্ত্র, কামখা তন্ত্র, তারা তন্ত্র, কুল তন্ত্র, অভয় তন্ত্র, যোগিনী তন্ত্র ইত্যাদি।

 

এছাড়া আমাদের অথর্ব বেদ, পুষ্করা সংহিতা, পদ্ম সংহিতা, ভৈরব সংহিতা, গুপ্ত তন্ত্র লিপি, নারদীয় সংহিতা- বহু গ্রন্থ থেকে বহু তন্ত্ররীতি উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

তন্ত্রশাস্ত্রকে উত্তর-বৈদিক যুগের রচনা বলে মনে করা হয়, যার বিকাশলাভ প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যভাগের কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল। সাহিত্যরূপে যেভাবে পুরাণ গ্রন্থকে মধ্যযুগীয় দার্শনিক-ধার্মিক রচনা হিসেবে মান্য করা হয়ে থাকে, সেভাবেই তন্ত্রশাস্ত্রে প্রাচীন আখ্যান, কাহিনি ইত্যাদির সমাবেশ রয়েছে। বিষয়বস্তুগত দৃষ্টিতে একে ধর্ম, দর্শন, সৃষ্টিরচনা শাস্ত্র, প্রাচীন বিজ্ঞান ইত্যাদির বিশ্বকোষও বলা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা তাঁদের ঔপনিবেশিকতাবাদী উদ্দেশ্যসাধনে তন্ত্রকে 'সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ' আখ্যা দিয়ে দিগভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গ, বিহার ও রাজস্থান তন্ত্রের মুখ্যপীঠ ছিল।

 

ধ্যান বা সাধারণ কিছু আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া অভ্যেসের জন্য বাস্তবিক, গুরুর কোনও প্রয়োজন হয় না। শিষ্যকে সেই নামহীন তূরীয় আনন্দের অনুভূতিতে ভরিয়ে রাখার মধ্য দিয়েই গুরুর মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়। সুতরাং, তন্ত্র হল মুক্তি পথের দিশারী, দাসত্বে আটকে রাখার জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি নয়।।

More Articles

;