নাগা সন্ন্যাসী কারা! কতটা কঠিন এই সাধন পথ, জানলে শিউরে উঠবেন

মকর সংক্রান্তিতে জমে ওঠে গঙ্গাসাগর। আর গঙ্গাসাগর মানেই দল বেঁধে নাগা সন্ন্যাসীদের ভিড়। কনকনে ঠাণ্ডায় সাগরের তীরভূমিতে তাঁদের গায়ে একফালি কাপড়ের দেখা মেলে না। গা-ভর্তি ছাইভষ্ম মাখা মানুষগুলি যেন শীত-গ্রীষ্ম বর্ষা--যে কোনও সময়েই যেন নির্বিকার। সঙ্গত কারণেই এই নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। মিথ অনুযায়ী, অন্যধর্মের আগ্রাসন থেকে হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার জন্য আদিগুরু শঙ্করাচার্য সাধুদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে এই নাগা সন্ন্যাসীরা কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে ক্ষিপ্র হয়ে উঠতে থাকেন এবং ধর্মকে রক্ষার জন্য অস্ত্রশিক্ষাও নেন। তাদের যথাযোগ্যস্থানে মর্যাদা দিতে নাগা সাধুদের কুম্ভমেলায় স্নানের অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে তাঁদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়।


কারা নাগা সন্ন্যাসী?

শাস্ত্র বলছে, কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন সন্ন্যাসী 'নাগা সন্ন্যাসী' হতে পারেন। কাম-ক্রোধ ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেই তিনি হয়ে ওঠেন নাগা।এমনকী নাগা সাধুদের লিঙ্গ পর্যন্ত অকেজো করে দেওয়া হয়। জুনা আখড়ার মুখ্য আহ্বায়ক মোহান্ত হরি গিরির কথায়, 'যে ব্যক্তির বৈরাগ্য লাভের ইচ্ছে প্রবল, তিনি যে জাতি, ধর্ম বা বর্ণেরই হোন না কেন, তিনি নাগা সন্ন্যাসী হওয়ার যোগ্য। অনেক মুসলিম, খ্রিস্টান ও অন্য ধর্মের মানুষও নাগা সন্ন্যাসে দীক্ষিত হয়েছেন। তেমনই সমাজের তথাকথিত উচ্চ শ্রেণি থেকে আসা অনেক ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারও দীক্ষিত হয়েছেন'। চুল কেটে টিকি রাখা, মৃত্যুর আগেই নিজের এবং পরিবারের লোকজনের পিণ্ডদান করা-- এমনই কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে উতরোতে হয় নবীন সাধুদের। শুধু পরিবার বা পরিজন থেকে দূরে যাওয়া নয়, পার্থিব সব ইচ্ছে, কাম, গর্ব- সব কিছু মন থেকে ধুয়ে ফেলতে হয় নাগা সন্ন্যাসীদের। কঠিন এই সব ক্রিয়াই তাঁদের সন্ন্যাস লাভের একমাত্র পথ।

২০ বছরের লম্বা সফর

নাগা অর্থ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃত সত্য সন্ধান করে যে। এ ধরনের ব্যক্তিদের সাংসারিক জীবন থেকে দূরে থাকতে হয়। তবে তাঁদের অনেকে সৈনিক সন্নাসীও বলে থাকেন। কারণ যে কোনও পরিস্থিতিতে তাদের অটল থাকতে এবং প্রয়োজনে মাতৃভূমি এবং সমাজের জন্য অস্ত্র ধারণ করতে হয়।
একজন মানুষের নাগা সন্নাসী হয়ে উঠতে প্রায় ২০ বছর লেগে যায়। ১২ বছর পর্যন্ত চলে কঠোর প্রশিক্ষণ। এই সময় নিজেদের খাবার নিজেদের তৈরি করার পাশাপাশি গুরুর সেবা করা অবশ্য কর্তব্য। এছাড়া এরা সারাজীবন তেল-সাবান মেখে স্নান করতে পারেন না। যে সমস্ত খাবার শরীরে উত্তেজনা তৈরি করে সেই সব খাবার থেকে তাঁদের দূরে থাকতে হয়। নাগা সন্ন্যাসীরা শরীরে একফালি কাপড় পর্যন্ত পড়েন না। তাঁর বদলে সারা শরীরে ছাই মেখে থাকেন।

সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর ফারাক 

জানা যায় এক বিশেষ পদ্ধতিতে এই ছাই তৈরি করেন তাঁরা। যজ্ঞের ভস্মে গোবর, কলাপাতা, বেলপাতা, কলা, ঘি, কাঁচা দুধ মিশিয়ে তৈরি হয় ওই বিশেষ মিশ্রন। যা গায়ে মাখলে মশা বা বিষাক্ত সাপ ধারে কাছে ঘেঁষেনা। নাগা সন্ন্যাসী শুধু পুরুষরাই হতে পারেন তা নয়। মহিলারাও হতে পারেন নাগা সন্ন্যাসিনী।

তবে ফারাক একটাই, মহিলা নাগা সন্নাসিনী সম্পূর্ণ নগ্ন থাকেন না। শরীরে সেলাইবিহীন একটুকরো হলুদ রঙের কাপড় জড়িয়ে রাখতে হয় তাঁদের। নাগা সন্ন্যাসীনী হয়ে ওঠার আগে একজন মহিলাকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি ঈশ্বরেই সম্পূর্ণতা সমর্পিত এবং পার্থিব বাসনা-কামনায় তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নিজের ও পরিবারের সকলের পিণ্ড তাঁকে জীবিত অবস্থাতেই দিতে হয়। নাগা সন্ন্যাসিনীরা কপালে এক বিশেষ টিকা লাগান। সন্ন্য্যাসী-বৃত্তে নাগা সন্ন্যাসিনীদের সন্ন্যাসীদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়।

More Articles

;