তাজমহল কি সত্যিই তেজো মহালয়া ছিল?

তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের দড়ি টানাটানি সাম্প্রদায়িক বিতর্ককেই উস্কানি দিয়েছে। বর্তমান সময়ে রজনীশ সিং বারবারই বিজেপির উপরমহলের নেতাদের কাছে নতুন করে তাজমহল বিতর্ককে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
তাজমহল কি সত্যিই তেজো মহালয়া ছিল?

তাজমহল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য। তাজমহল ভালোবাসার প্রতীক বিশ্বের মানুষের কাছে। তাজমহলের গঠনশৈলী, স্থাপত্য, নির্মাণ রীতি পৃথিবীর কাছে বিস্ময়। কিন্তু তাজমহল ই ফের একবার বিতর্কের শিরোনামে। কিছুদিন আগেই বিজেপি নেতা এবং উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার বিজেপির মিডিয়া ইন চার্জ রজনীশ সিং দাবি করেন তাজমহলের যাবতীয় রহস্য লুকিয়ে আছে তাজমহলের ভিতরে বন্ধ থাকা ২২ টা ঘরের ভিতরে। এই মর্মেই এলাহাবাদ হাইকোর্টে রজনীশ তাজমহলের সঠিক পরিচয় জানার জন্য আবেদন করেন।

এলাহাবাদ হাইকোর্ট এই প্রসঙ্গে রায়দান করেছে। তাতে বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় এবং সুভাষ বিদ্যার্থীর বেঞ্চ এই মামলা খারিজ করে দিয়েছেন।তার সঙ্গেই কোর্ট থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এই ধরনের বি কোর্ট কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু তাজমহল নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগেও পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য নিয়ে বারে বারে দানা বেঁধেছে বিতর্ক।

ইতিহাসবিদ পি এন ওক তাঁর তাজমহলের উপর লেখা বই ' তাজমহল দি ট্রু স্টোরি ' বইটিতেই প্রথম দাবি করেন তাজমহল প্রথমে একটি শিব মন্দির ছিল। পরবর্তীকালে মুঘলরা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে।তারপর সম্রাট শাহাজান সেখানে নিজের বেগম মুমতাজের স্মৃতিতে তাজমহল নির্মাণ করেন। ওক দাবি করেছিলেন যে স্মৃতিস্তম্ভটি ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল ওকের বক্তব্য ছিল যে কাঠামোটি নির্মিত হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। মুঘলরা ভারত আক্রমণের আগে থেকেই ‘তেজো মহালয়া’ ছিল এবং তাজমহল নামটি একটি সংস্কৃত শব্দ "তেজো মহালয়" এরই অস্পষ্ট ভ্রষ্ট রূপ। তত্ত্বগুলি বেশ কয়েক বছর ধরে ইন্টারনেট ফোরামে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বেশিরভাগ আলোচনাই ওকের তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছে।

ওকের তাজমহল তত্ত্ব অনুযায়ী তাজমহল সম্ভবত হিন্দু শাসক জয় সিংহের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তাজমহল আসলে একটি শিব মন্দির এবং রাজপুত রাজপ্রাসাদ ছিল তেজো মহালয়া। এটি শাহজাহান ক্ষমতায় আসার পর দখল করে নেন এবং তারপর প্রিয় বেগম মুমতাজের সমাধির স্মৃতি স্বরূপ তার নামকরণ করা হয় তাজমহল। সুপ্রিম কোর্ট ২০০০ সালে তাজমহলের মালিকানা সংক্রান্ত মামলায় ওকের দাবি খারিজ করে দেয়।‌

তাজমহল নিয়ে অন্য একটি বিতর্কে, বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার দাবি করেন যে সতেরো শতকের স্মৃতিস্তম্ভটি মুঘল সম্রাট শাহজাহান একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার পরে তৈরি করেছিলেন। কাটিয়ারের দাবি ছিল যে, হিন্দু মন্দিরটি আগে তাজমহলের জায়গায় ছিল তাকে "তেজো মহালয়া" বলা হত এবং সেখানে একটি শিবলিঙ্গ ছিল। আগেও বিজেপির বহু নেতাই একই ধরনের দাবি করেছেন। ২০১৪ সালে, বিজেপি নেতা লক্ষ্মীকান্ত বাজপেয়ী ও পি এন ওকের বইয়ের সূত্র ধরে দাবি করেন হিন্দু মন্দির তেজো মহালয়া ধ্বংস করেই তাজমহল নির্মাণ করেছেন শাহাজান। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আগ্রা জেলা আদালতে ছয়জন আইনজীবী তাজমহলকে শিব মন্দির হিসেবে দাবি জানিয়ে একটি আবেদন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাঙ্গনে ‘দর্শন’ ও ‘আরতি’ করতে দেওয়া হোক। আদালত এই প্রসঙ্গে কেন্দ্র, সংস্কৃতি মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট তলব করেছিল।

২০০৫ সাল থেকে তাজমহলের মালিকানার মামলাটি আদালতের বিচারাধীন থাকায় এই বিষয়ে এ এস আই জেলা আদালতের তলবকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। যদিও আগস্ট মাসে আগ্রা আদালতে একটি লিখিত বয়ান জমা দেওয়া হয়েছিল এ এস আইয়ের তরফ থেকে যেখানে আদালতকে স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়, ‘ মন্দির, সমাধি সব কিছুর আগে তাজমহল একটি স্থাপত্য বিস্ময়। রাজনীতির বাইরে গিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই তাজমহলের মূল্যায়ন করতে হবে’।

২০১৫ সালের নভেম্বরে সংসদে একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়, তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা বলেছিলেন যে, তাজমহল শিব মন্দির নষ্ট করে হয়েছে এমন কোনও প্রমাণ সরকারের কাছে নেই।

বারে বারে তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের দড়ি টানাটানি সাম্প্রদায়িক বিতর্ককেই উস্কানি দিয়েছে। বর্তমান সময়ে রজনীশ সিং বারবারই বিজেপির উপরমহলের নেতাদের কাছে নতুন করে তাজমহল বিতর্ককে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এলাহাবাদ কোর্টের কঠোর ভূমিকা আপাতত যাবতীয় জল্পনায় জল ঢালল।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।