তাজমহল কি সত্যিই তেজো মহালয়া ছিল?

তাজমহল পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য। তাজমহল ভালোবাসার প্রতীক বিশ্বের মানুষের কাছে। তাজমহলের গঠনশৈলী, স্থাপত্য, নির্মাণ রীতি পৃথিবীর কাছে বিস্ময়। কিন্তু তাজমহল ই ফের একবার বিতর্কের শিরোনামে। কিছুদিন আগেই বিজেপি নেতা এবং উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার বিজেপির মিডিয়া ইন চার্জ রজনীশ সিং দাবি করেন তাজমহলের যাবতীয় রহস্য লুকিয়ে আছে তাজমহলের ভিতরে বন্ধ থাকা ২২ টা ঘরের ভিতরে। এই মর্মেই এলাহাবাদ হাইকোর্টে রজনীশ তাজমহলের সঠিক পরিচয় জানার জন্য আবেদন করেন।

 

এলাহাবাদ হাইকোর্ট এই প্রসঙ্গে রায়দান করেছে। তাতে বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় এবং সুভাষ বিদ্যার্থীর বেঞ্চ এই মামলা খারিজ করে দিয়েছেন।তার সঙ্গেই কোর্ট থেকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এই ধরনের বি কোর্ট কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু তাজমহল নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগেও পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য নিয়ে বারে বারে দানা বেঁধেছে বিতর্ক।

 

ইতিহাসবিদ পি এন ওক তাঁর তাজমহলের উপর লেখা বই ' তাজমহল দি ট্রু স্টোরি ' বইটিতেই প্রথম দাবি করেন তাজমহল প্রথমে একটি শিব মন্দির ছিল। পরবর্তীকালে মুঘলরা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে।তারপর সম্রাট শাহাজান সেখানে নিজের বেগম মুমতাজের স্মৃতিতে তাজমহল নির্মাণ করেন। ওক দাবি করেছিলেন যে স্মৃতিস্তম্ভটি ১১৫৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল ওকের বক্তব্য ছিল যে কাঠামোটি নির্মিত হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। মুঘলরা ভারত আক্রমণের আগে থেকেই ‘তেজো মহালয়া’ ছিল এবং তাজমহল নামটি একটি সংস্কৃত শব্দ "তেজো মহালয়" এরই অস্পষ্ট ভ্রষ্ট রূপ। তত্ত্বগুলি বেশ কয়েক বছর ধরে ইন্টারনেট ফোরামে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বেশিরভাগ আলোচনাই ওকের তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছে।

 

ওকের তাজমহল তত্ত্ব অনুযায়ী তাজমহল সম্ভবত হিন্দু শাসক জয় সিংহের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। তাজমহল আসলে একটি শিব মন্দির এবং রাজপুত রাজপ্রাসাদ ছিল তেজো মহালয়া। এটি শাহজাহান ক্ষমতায় আসার পর দখল করে নেন এবং তারপর প্রিয় বেগম মুমতাজের সমাধির স্মৃতি স্বরূপ তার নামকরণ করা হয় তাজমহল। সুপ্রিম কোর্ট ২০০০ সালে তাজমহলের মালিকানা সংক্রান্ত মামলায় ওকের দাবি খারিজ করে দেয়।‌

 

আরও পড়ুন-মৃতদেহ এসেছিল শোভাযাত্রা করে, বন্দি সম্রাট দেখতেন জানলা দিয়ে || তাজমহলের যে ইতিহাস অজানা আজও

 

তাজমহল নিয়ে অন্য একটি বিতর্কে, বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার দাবি করেন যে সতেরো শতকের স্মৃতিস্তম্ভটি মুঘল সম্রাট শাহজাহান একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার পরে তৈরি করেছিলেন। কাটিয়ারের দাবি ছিল যে, হিন্দু মন্দিরটি আগে তাজমহলের জায়গায় ছিল তাকে "তেজো মহালয়া" বলা হত এবং সেখানে একটি শিবলিঙ্গ ছিল। আগেও বিজেপির বহু নেতাই একই ধরনের দাবি করেছেন। ২০১৪ সালে, বিজেপি নেতা লক্ষ্মীকান্ত বাজপেয়ী ও পি এন ওকের বইয়ের সূত্র ধরে দাবি করেন হিন্দু মন্দির তেজো মহালয়া ধ্বংস করেই তাজমহল নির্মাণ করেছেন শাহাজান। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আগ্রা জেলা আদালতে ছয়জন আইনজীবী তাজমহলকে শিব মন্দির হিসেবে দাবি জানিয়ে একটি আবেদন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাঙ্গনে ‘দর্শন’ ও ‘আরতি’ করতে দেওয়া হোক। আদালত এই প্রসঙ্গে কেন্দ্র, সংস্কৃতি মন্ত্রক, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট তলব করেছিল।

 

২০০৫ সাল থেকে তাজমহলের মালিকানার মামলাটি আদালতের বিচারাধীন থাকায় এই বিষয়ে এ এস আই জেলা আদালতের তলবকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। যদিও আগস্ট মাসে আগ্রা আদালতে একটি লিখিত বয়ান জমা দেওয়া হয়েছিল এ এস আইয়ের তরফ থেকে যেখানে আদালতকে স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়, ‘ মন্দির, সমাধি সব কিছুর আগে তাজমহল একটি স্থাপত্য বিস্ময়। রাজনীতির বাইরে গিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই তাজমহলের মূল্যায়ন করতে হবে’।

 

২০১৫ সালের নভেম্বরে সংসদে একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়, তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা বলেছিলেন যে, তাজমহল শিব মন্দির নষ্ট করে হয়েছে এমন কোনও প্রমাণ সরকারের কাছে নেই।

 

বারে বারে তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের দড়ি টানাটানি সাম্প্রদায়িক বিতর্ককেই উস্কানি দিয়েছে। বর্তমান সময়ে রজনীশ সিং বারবারই বিজেপির উপরমহলের নেতাদের কাছে নতুন করে তাজমহল বিতর্ককে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এলাহাবাদ কোর্টের কঠোর ভূমিকা আপাতত যাবতীয় জল্পনায় জল ঢালল।

More Articles

;