যে ছবি দেউলিয়া করেছিল রাজ কাপুরকে
Raj Kapoor: মুক্তির পর ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ভারতে নেট কালেকশন মাত্র ৮০ লাখ টাকা। যা বাজেটের কাছাকাছিও পৌঁছয়নি।

হাস্যোল্লাস ছড়িয়েও দর্শকের মনে একরাশ মনখারাপি প্রশ্ন নিয়ে সিনেমাহল ছাড়ার মতো ছবি খুব কমই হয়েছে। ১৯৭০ সালে এমনই এক ছবি 'মেরা নাম জোকার' মুক্তি পায়। রাজ কাপুরের সেরা সৃষ্টির একটি। শোম্যানের নিজের বানানো প্রিয় ছবিও হয়তো এটিই (এক সাক্ষাৎকারে এই কথায় বলেন রাজপুত্র রণধীর কাপুর)। এই ছবি শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, রাজ কাপুরের নিজের জীবনের আয়না। জোকারের মুখোশে লুকোনো কান্না, ভালোবাসার অসম্পূর্ণতা, স্বপ্নের পথে লড়াই– সবকিছুতেই রাজু (রাজ কাপুরের চরিত্র) যেন রাজ কাপুরের নিজের ছায়া। এ যেন ছবির ক্যানভাসে আঁকা রাজ কাপুরের জীবনকথা। রাজ কাপুরের জীবনও ছিল সার্কাসের মতো– রঙিন আলো, তালির শব্দ, কিন্তু পর্দার আড়ালে একাকীত্বের ছায়া।
১৯২৪ সালের ১৪ই ডিসেম্বর পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন শোম্যান। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন অভিনেতা, মা রামসরণী মেহরা কাপুর গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই চোখে স্বপ্ন জ্বলজ্বল করত ছোট্ট রাজের। কিশোর রাজ ছিল বোম্বে টকিজের ক্ল্যাপার বয়। তারপর 'নীল কমল' (১৯৪৭) দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু। তবে, প্রকৃত অর্থে যাত্রা শুরু হয় 'আওয়ারা' (১৯৫১)-র পর।
ভবঘুরের মতো অভিনয় করে বিশ্বজয় করেন রাজ। 'মেরা নাম জোকার' এই যাত্রার মাইলফলক। ছবিটি তিন ভাগে বিভক্ত– কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব। প্রথম ভাগে দেখা যায় কিশোর রাজুর সার্কাসের প্রতি ভালোবাসা। তার জীবন যেন সার্কাসের রিং-এর মতোই ঘুরতে থাকে। দ্বিতীয় ভাগে যুবক রাজু মারিনা (সেনিয়া রাবিনকিনা) এবং মিনা (পদ্মিনী)-কে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা ফেরত আসে না। তৃতীয় ভাগে জীবনভর অন্যকে হাসানোর জন্য জোকার হয়ে ওঠে সে। এই ছবি রাজ কাপুরের নিজের জীবনের প্রতিফলন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Suchitra Sen Raj Kapoor : সঙ্গে অভিনয় তো বটেই; প্রবল ব্যক্তিত্বের জন্যও তিনি অনন্যা। আক্ষরিক অর্থেই বাংলা নয়, ভারতের সিনে ইতিহাসের একটা অধ্যায়ও বটে তিনি।
এত সহজে সারমর্ম বোঝা গেলেও রাজ কাপুরের স্বপ্নের ছবি ‘মেরা নাম জোকার’ এত সহজে বানানো যায়নি। এই ছবি নির্মাণের নেপথ্যে ছিল অকৃত্রিম আবেগ, পরিশ্রম আর কষ্ট। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির শুটিং শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। সেই সময় এই ছবির বাজেট ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। 'মেরা নাম জোকার' ছিল রাজ কাপুরের স্বপ্নের ছবি। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই যাত্রা শুধু ছবি তৈরির নয়, রাজ কাপুরের জীবনের এক অধ্যায়। খাজা আহমেদ আব্বাসের গল্পে নিজের ছায়া দেখে রাজ কাপুর নিজেই দায়িত্ব নেন পরিচালনা, প্রযোজনা, অভিনয়, এবং সম্পাদনার।

জোকার রাজু
ছবিটি তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়, রাজ কাপুর প্রতিটি অধ্যায় আলাদা আলাদা ফিল্মের মতো করে তৈরি করেছিলেন। তৃতীয় অধ্যায়টি আগে শুট হয়। দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুলে, স্কুলের দৃশ্যগুলো তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু প্রথম অধ্যায় শুরু করার সময় বাজেট ছাড়িয়ে যায় এবং সময়সীমাও পেরিয়ে যায়। ছেলে ঋষি কাপুরের বয়স মাত্র ১২ বছর, এটিই ছিল তাঁর প্রথম ছবি। রাজ কাপুরের পারফেকশনিস্ট মন সন্তুষ্ট হয় না বিভিন্ন দৃশ্যে, তাই সেই সকল দৃশ্য শুট করা হয় বারবার। সার্কাসের বিভিন্ন দৃশ্যে নানা প্রযুক্তিগত জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। তৎকালীন ভারতে সীমিত ইফেক্টস, লাইটিং এবং ক্যামেরা প্রযুক্তির কারণে একই দৃশ্য বারবার শুট করতে হয়। মস্কোতে সপ্তাহব্যাপী শুটিংয়ের জন্য সোভিয়েত টেকনিশিয়ান,সার্কাস শিল্পীদের আনা হয়। ছবির দৈর্ঘ্য তিন ঘণ্টা ৪০ মিনিট করতে শঙ্কর-জয়কিশনের সুর, মুকেশ-লতার গানগুলোতে বারবার পরিবর্তন করা হয়। সিমি গারেওয়ালের সাহসী দৃশ্য, একই ছবিতে দুটি ইন্টারভালের মতো অভিনব ফর্ম্যাটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে সময় লেগে যায় ছয় বছর। আর্থিক সংকট দেখা দেয়, বাজেট ছাড়িয়ে যায়, রাজ কাপুর সম্পত্তি বিক্রি করে দেন, আর কে স্টুডিও বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। এই দীর্ঘ যাত্রায় আর্থিক চাপ বাড়ে, কিন্তু রাজ কাপুর থামেননি। ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় ছবি। আজ এই বিলম্বকে কালজয়ী ছবির রহস্য বলা হয়। দর্শকরা বুঝেছে, ছয় বছরের কষ্টই তৈরি করেছে অমর 'জোকার'কে।
কিন্তু মুক্তির পর ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ভারতে নেট কালেকশন হয় মাত্র ৮০ লাখ টাকা। যা বাজেটের কাছাকাছিও পৌঁছয়নি। রাজ কাপুর দেউলিয়া হয়ে যান সেসময়। ডিস্ট্রিবিউটররা রাজ কাপুরকে পরিত্যাগ করেন, বলেন "রাজ কাপুর পাগল হয়ে গেছে"। তাঁর কন্যা রিমা কাপুর বলেন, "বাবা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হন, সম্মান হারান এবং পরের ছবি ‘ববি’র জন্য কেউ ঋণ দিতে চায় না।" পুত্র ঋষি কাপুর বলেন, "স্টুডিওসহ সবকিছু বন্ধক ছিল রিলিজের জন্য।" প্রেম চোপড়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “রাজ কাপুর শেষ হয়ে গিয়েছিলেন, সবকিছু বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।” তবু রাজ কাপুর হার মানেননি; পরবর্তী ছবি ‘ববি’ দিয়ে ক্ষতিপূরণ করেন।
ভারতে সেইসময় ছবিটি না চললেও সোভিয়েত ইউনিয়নে ছবি সুপারহিট হয়। রাজ কাপুর মাত্র ১৫ লক্ষ টাকায় ছবিটির স্বত্ব বিক্রি করেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। সেখানে ছবিটিকে তিনভাগে ভাগ করে মুক্তি দেওয়া হয়। মোট ৭.৩ কোটি টিকিট বিক্রি হয়। এবং বক্স অফিস কালেকশন ছিল ১৬ প্রায় কোটির। বর্তমান সময়ে ছবিটি কাল্ট ক্লাসিক বলে পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকরা বুঝেছে, জোকারের হাসির আড়ালে কত গভীরতা লুকিয়ে ছিল। বর্তমানে, আর কে স্টুডিওর সবচেয়ে বেশি আর্থিক লাভদায়ক ছবি 'মেরা নাম জোকার'। আজ ৫৫ বছর পরও 'মেরা নাম জোকার' আমাদের শেখায়– হাসির আড়ালে কত কান্না লুকিয়ে থাকে।















