ফুল হাতে পায়ের নীচে বসে রাজ কাপুর, তবুও কেন মুখের ওপর 'না' বলেছিলেন সুচিত্রা সেন?

Suchitra Sen Raj Kapoor : সঙ্গে অভিনয় তো বটেই; প্রবল ব্যক্তিত্বের জন্যও তিনি অনন্যা। আক্ষরিক অর্থেই বাংলা নয়, ভারতের সিনে ইতিহাসের একটা অধ্যায়ও বটে তিনি।

Aritra Som
৩ মিনিট
ফুল হাতে পায়ের নীচে বসে রাজ কাপুর, তবুও কেন মুখের ওপর 'না' বলেছিলেন সুচিত্রা সেন?

তাঁর কথা সামনে আসলে কেবল অভিনয় কিংবা সৌন্দর্য নয়, উঠে আসে প্রবল ব্যক্তিত্বের কথা। যে ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ালে আপনা থেকেই মাথা নুইয়ে আসে। তাঁর কথা বললে অবধারিতভাবে আরেকজনও চলে আসেন, কিংবদন্তি অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বো। সুচিত্রা সেন আসলে বাঙালির যাবতীয় সংস্কৃতি, সিনেমা, স্পর্ধার মধ্যে লুকিয়ে আছেন। বাংলার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। আর হবেন নাই বা কেন! তিনি যে মহানায়িকা! বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘ম্যাডাম সেন’। যিনি নিজেকে জায়গা নিজে তৈরি করেছিলেন, ধরেও রেখেছিলেন সেই তেজে। অমন ভুবনমোহিনী রূপ আর হাসি, সঙ্গে অভিনয় তো বটেই; প্রবল ব্যক্তিত্বের জন্যও তিনি অনন্যা। আক্ষরিক অর্থেই বাংলা নয়, ভারতের সিনে ইতিহাসের একটা অধ্যায়ও বটে তিনি।

সুচিত্রা সেন বললেই প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় চলে আসবে উত্তম কুমারের নাম। দু’জনের জুটি তৈরি করেছিল একের পর এক ইতিহাস। যার সাক্ষী থেকেছিল আপামর বাংলা। মনে রাখবেন, এটা সেই সময়, যখন নায়করাই পর্দায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেতেন। নায়িকাদের থেকে বেতনও বেশি হতো তাঁদের। এখনও যে পরিস্থিতি একেবারে উল্টে গিয়েছে তা নয়, তবে বদল এসেছে। আর সেই বদলের শুরুটা হয়েছিল সুচিত্রা সেনের হাত ধরেই। শ্যুটিংয়ে কোনও কারণে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে চলে যাওয়া মানে সিনেমা ‘প্যাক আপ’। পরিচালকেরও মাথায় হাত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আদৌ কোনও বাইকে চড়েননি উত্তম-সুচিত্রা! কীভাবে শ্যুটিং হয়েছিল সপ্তপদী ছবির বিখ্যাত দৃশ্য?

Uttam Kumar-Suchitra Sen : ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে আদৌ কোনও বাইকে চড়েননি উত্তম-সুচিত্রা! অবাক করবে আসল রহস্য

কেন? তিনি যে ‘ম্যাডাম সেন’! তাঁর মুখের ওপর কোনও কথা চলে নাকি! একসময় সুচিত্রা সেনের দাবিও ছিল পারিশ্রমিক উত্তম কুমারের সমান করার। এও বলেছিলেন, পোস্টারে যেন ‘উত্তম-সুচিত্রা’ না যায়; সবসময় লেখা থাকবে ‘সুচিত্রা-উত্তম’। ‘ফেমিনিজম’ শব্দটি আধুনিক পৃথিবীতে প্রায়শই ব্যবহার করা হয়। নারীর অধিকার, নারী স্বাধীনতার কথা বলা হয়। আজ থেকে অন্তত ৪০-৫০ বছর আগে সেই কাজটাই শুরু করেছিলেন সুচিত্রা সেন। এমনি এমনি সম্মান নয়; নিজের প্রতিভায়, পরিশ্রমের জেরে অর্জিত সেই গৌরব, সেই সিংহাসন।

তবে কেবল বাংলা সিনে জগতই নয়, বলিউডও সাক্ষী থেকেছিল মহানায়িকার এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের। বাংলায় অগুনতি ছবি করলেও বলিউডের মাটিতে খুব বেশি ছবি করেননি সুচিত্রা সেন। ১৯৫৫ সালে প্রথমবার বলিউডের পর্দায় উঠে আসেন তিনি, আর বিপরীতে কে? দিলীপ কুমার! মুক্তি পেয়েছিল ‘দেবদাস’। বাকিটা ইতিহাস। দিলীপ কুমার, বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে ‘পারো’র ভূমিকায় সুচিত্রা সেন ছিলেন অনন্য। তাঁর বাঙালি উচ্চারণে হিন্দি শুনে বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন দিলীপ কুমারও। এর পাঁচবছর পর ফের একটি হিন্দি ছবি, নাম ‘বোম্বাই কা বাবু’। একদিকে সুচিত্রা, অন্যদিকে দেব আনন্দ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় প্রথম গানেই কিস্তিমাত, কেন হারিয়ে গেলেন ‘গায়িকা’ সুচিত্রা সেন

Suchitra Sen : স্টারডাম, আভিজাত্যের সঙ্গে সততা, আত্মবিশ্বাস এমন বৈচিত্র্যময় স্বভাবে রহস্যময়ী রমণীসত্ত্বার ঘেরাটোপ বরাবরই বজায় ছিল তাঁর।

১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল সুচিত্রা-সঞ্জীব কাপুরের ‘আন্ধি’। মহানায়িকার কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সিনেমায় বেশ কঠিন চরিত্রেই অভিনয় করেছিলেন। যদিও সুচিত্রার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে যান প্রত্যেকে। মনে করা হয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আদলে তৈরি করা হয়েছিল ম্যাডাম সেনের চরিত্রটি। গুলজারের পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া এই ছবিটিকে একসময় ব্যানও করে দেওয়া হয়েছিল। তবে এসবের বাইরেও থেকে গিয়েছে আরও একটি গোপন ঘটনা। না, এই ঘটনা কোনও পর্দায় উঠে আসেনি। কিন্তু সুচিত্রা সেনের গাম্ভীর্য, তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রবলভাবে উঠে আসে এখানে। যে ঘটনার অন্যপিঠে রয়েছেন আরেক কিংবদন্তি, রাজ কাপুর।

তখন সুচিত্রা সেন মধ্যগগনে। বাংলা তো বটেই, গোটা ভারতে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। এমন সময়ই তাঁর কাছে সিনেমার অফার আনেন খোদ রাজ কাপুর। তাঁর সম্পর্কে নতুন করে বলার নিশ্চয়ই অবকাশ নেই। তিনি চান, সুচিত্রা সেন তাঁর সিনেমার প্রধান নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করুন। এমন সৌন্দর্য যার, তাঁকে পর্দায় না ধরলে যে অন্যায় হবে! কিন্তু রাজ কাপুর তখনও সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তবে জেনে গেলেন খানিক পরেই।

এক সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা সেন বলেছিলেন সেই ঘটনার কথা। ছবির নায়িকার রোল অফার করতে সটান তাঁর বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিলেন রাজ কাপুর। যেই সুচিত্রা নিজের সোফায় বসলেন, অমনি এক কাণ্ড করে বসলেন রাজ। সুচিত্রার পায়ের নীচে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন। আর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে। হাতে থাকা গোলাপের তোড়া এগিয়ে দিলেন মহানায়িকার দিকে। এমন সৌন্দর্যের সামনে মাথা নত করে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন সুচিত্রা সেন। এবং তখনই, রাজ কাপুরের মুখের ওপর জানিয়ে দিলেন, তিনি দুঃখিত। কিন্তু এই সিনেমায় অভিনয় করতে তিনি পারবেন না। তাঁর চেহারায় যেন ফুটে বেরোচ্ছিল ব্যক্তিত্বের ঝলক। রাজ কাপুরের মতো অমন সুপারস্টারও হকচকিয়ে গেলেন। পরে সাক্ষাৎকারে সুচিত্রা বলেছিলেন, তাঁর রাজ কাপুরের স্বভাব মোটেও ভালো লাগেনি। এক পুরুষ ফুলের তোড়া এনে মেয়ের পায়ের কাছে এসে বসে পড়বে, এমন চরিত্রবানদের তিনি কখনই পছন্দ করতেন না। সুচিত্রাই বলেছেন, চেহারা নয়, মানুষের ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা আর বুদ্ধিমত্তাই তাঁকে আকর্ষণ করে। সেখানে রাজ কাপুরের এই স্বভাব একেবারেই মানতে পারেননি সুচিত্রা সেন। তাই একেবারে মুখের ওপরই না করে দিয়ে বেরিয়ে যান।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।