জয় গোস্বামী থেকে ৯১ বছরের আশালতা ভট্টাচার্য; নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে ডাক কেন?
Election commission voter hearing: একজন মানুষ যিনি দীর্ঘদিন এই দেশে ভোট দিয়ে এসেছেন, তাঁকেও লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে তিনি ভারতীয়।
কবি জয় গোস্বামী, ৯১ বছরের আশালতা ভট্টাচার্য, কিংবা ৮০ বছরের বেলা চক্রবর্তীরা আজ একই সারিতে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিচ্ছেন, যে তাঁরাও এই দেশের নাগরিক। তাঁদের নাম ২০০২ সালের নির্বাচনে ভোটার তালিকায় থাকার কথা ছিল। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাঁদের নাম সে তালিকায় নেই। অগত্যা এখন তাঁদেরই দায়িত্ব নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার।
শুধু এঁরাই নয় নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে ডাক পেয়েছেন অভিনেতা, কবি ও গায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্যও। ডাক পড়ছে সাধারণের। কে ডাক পাবেন, কে ডাক পাবেন না, তা কেউ জানে না, রোজ কেউ না কেউ তাঁর বিএলও’র কাছ থেকে ফোন পাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, তাঁর নামের সঙ্গে কিছু অযৌক্তিক অসঙ্গতি বা ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ পাওয়া গেছে, তাই তাঁকে নির্বাচন কমিশনের ধার্য করা শুনানি কেন্দ্রে এসে সমস্ত নথি দেখিয়ে প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি এই দেশেরই নাগরিক।
যদিও কমিশনের নিয়ম আছে, ৮৫ বছরের ঊর্দ্ধে সমস্ত মানুষদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের ভোটার নথি যাচাই করবে খোদ কমিশনই, কিন্তু তা সত্ত্বেও কাগজ দেখার নামে মানুষকে হয়রান করার ঘটনা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, একজন মানুষ যিনি দীর্ঘদিন এই দেশে ভোট দিয়ে এসেছেন, তাঁকেও লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে তিনি ভারতীয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR: এইসব গোঁজামিল, অসম্পূর্ণতা ছাড়াও বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এমন কিছু আছে যাকে কাকতালীয় বলে মেনে নেওয়া মুশকিল। এই এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক দানা বেঁধেছে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া (deletion) নিয়ে।
অনেকেই বলছেন ২০০২ সালের তালিকায় তথ্যের একাধিক অমিলেই নাকি এই সমস্যা সৃষ্টি। কিন্তু কেউ এই প্রশ্নটা করছে না, এই ভুল তথ্য তো আমরা নিজেরা বা কোনো নাগরিক নিজে থেকে করেননি, করেছে নির্বাচন কমিশন। তার দায় কেন একজন সাধারণ নাগরিককে নিতে হবে? শুনানি চলাকালীন নির্বাচন কমিশন একটা বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছিল, যে তারা যে প্রযুক্তির সাহায্যে ২০০২ কিংবা ২০২৫ সালের তালিকাকে ডিজিটাইজ করেছেন, তার ত্রুটির কারণেই এই তালিকা অসম্পূর্ণ, যার ফলেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে মানুষ যে ভীত এবং আতঙ্কিত, তা তাঁদের মুখ চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ফলে শত বাধা অতিক্রম করেও তাঁরা শুনানিতে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন। কেউ নিজের পয়সায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আসছেন, কেউ স্ট্রেচারে শুয়ে আসছেন আবার কেউ অন্যভাবে।
যাদবপুর অঞ্চলে রান্নার কাজ করেন সবিতা নস্কর, তাঁর ডাক পড়েছে তাঁর নিজের গ্রাম দক্ষিণ ২৪ পরগণার রায়দীঘি অঞ্চলের জেলাশাসকের দফতরে। তাঁকে অন্তত একদিন ছুটি নিতে হবে কাজ থেকে, অথচ তাঁর কাজের জায়গার মালিকেরা ছুটি দিতে চাইছেন না।
বহুদিন ধরে কিছু মানুষ বলে আসছেন সমস্যা ভোটার তালিকার একটি নিবিড় সংশোধনের ধারণায় নয়, আসলে যে প্রক্রিয়ায় গণনা ফর্ম এবং নাগরিকত্বের প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার মতো দুটি অভূতপূর্ব এবং অপ্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা আছে, সেই প্রক্রিয়ায় যে কেউ এই শুনানিতে ডাক পেতে পারেন। একবার এই দুটি উপাদানই যদি স্তিমিত করা হয়, তাহলে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে ব্যাপক ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার সমস্যা আসবে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BLO's problems:বিএলওরা সবচেয়ে বেশি বিপন্নতার শিকার হচ্ছেন। প্রতি বুথ পিছু একজন আধিকারিক।
বিষয়টা যদি বিহার থেকে শুরু করা যায় তাহলে বুঝতে কিঞ্চিৎ সুবিধা হবে। বিহারের খসড়া তালিকা প্রকাশের পর সকলেই হতবাক হয়ে যান, কারণ ৬৫ লক্ষ নাম বাদ পড়ে যায়। পরে সুপ্রিম কোর্টের জারি করা ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য, মোট বাদ পড়া নাম ৬৫’র বদলে গিয়ে ঠেকে ৪৪ লক্ষে। এদিকে বাংলায় যখন খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়েছিল, তখন দেখা গেছে মৃত, স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। অনেকেই তখন হাঁফ ছেড়ে ভেবেছিলেন, যাক নিজের বা পরিচিতদের নাম আছে, আর চিন্তা নেই। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে দেখা যাচ্ছে ঐ খসড়া তালিকা থেকেই বেছে বেছে মানুষদের ডাকা হচ্ছে শুনানির জন্য।
বিহারের ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই নিজস্ব নিজস্ব তত্ত্ব ছিল। অবশ্যই, বিহারে অনেক বেশি ভুয়ো ভোটার অভিবাসী রয়েছে। হয়তো বিহারের প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে মূল তালিকায় জালিয়াতি এবং তা স্ফীতি করা সম্ভবপর হয়েছিল। হয়তো অনেকে ভেবেছিলেন, বিহারে প্রথম এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী হয়েছে, তাই বেশ কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে, কিন্তু বিহারের নির্বাচনের ফলের পরে তাঁরা নিশ্চিত বুঝতে পেরেছেন, কী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা কিংবা দিল্লিতে যে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া চলছিল, সেটাকেই আইনগত মান্যতা দেওয়ার জন্যেই এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চালু হয়েছে। যে ১২টি রাজ্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলছে তাতে এখনও অবধি আগের ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছেন প্রায় ৬.৫ কোটি ভোটার। এরপরে আরও মানুষ যে বাদ পড়বেন তা বোঝাই যাচ্ছে। খসড়া ভোটার তালিকা একটু বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে এটি নিশ্চিত করে যে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে ভোটারদের নাম মুছে ফেলার সঙ্গে মাইগ্রেশন অথবা অভিবাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি যেখান থেকে বেশি মানুষ বাইরের রাজ্যে কাজের সন্ধানে যায়, তার তুলনায় গুজরাট এবং গোয়ার মতো রাজ্যগুলিতে ভোটার তালিকা ব্যাপকভাবে সঙ্কুচিত হয়েছে। গুজরাট এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে যেখানে ভোটার তালিকায় থাকা প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার তুলনায় ভোটার সংখ্যা কম সেখানে ব্যাপকভাবে ভোটার তালিকা মুছে ফেলা হয়েছে, যেমন তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলিতে যেখানে ভোটার তালিকার সংখ্যা বেশি। এটি আরও দেখায় যে ভোটাধিকার বঞ্চনার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নারীদের উপর। এই প্রক্রিয়ার পর প্রতিটি রাজ্যে ভোটার তালিকায় লিঙ্গ অনুপাত হ্রাস পেয়েছে।
অনেকে প্রশ্ন করছেন, আর কোন পদ্ধতিতে এই ভোটার তালিকা সংশোধন করা যেত, যাতে এই বাদ যাওয়ার বিষয়টি আসত না? তখনই আমাদের আসামের উদাহরণ দিতে হবে। আসাম হচ্ছে এমন একটি রাজ্য যেখানে এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করা হয়নি। সেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই প্রক্রিয়া করা হয়েছে এবং কোনো ফর্ম পূরণ করাকে বা নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। দেখা গেছে আসাম তাদের ভোটার তালিকায় ২.৫২ কোটি ভোটার নিয়ে সংশোধন শুরু করে। যেখানে ১০.৫৬ লক্ষ নাম বাদ এবং ১০.৫৫ লক্ষ নাম সংযুক্ত করা হয়। সুতরাং সম্প্রতি ঘোষিত খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ঠিক ২.৫২ কোটি। আসামই একমাত্র রাজ্য যেখানে তালিকা সংশোধনের পরও এখন পর্যন্ত শূন্য শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। অন্যান্য প্রধান রাজ্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে, প্রতিটি রাজ্যেই ৮ থেকে ১৯ শতাংশ বাদ পড়েছে। স্পষ্টতই, ভোটারের উপর দায়িত্ব না চাপানো এবং নাগরিকত্বের কাগজপত্রের উপর জোর না দেওয়ার ফলেই আসামে ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়নি এবং অন্যান্য রাজ্যে হচ্ছে, সেটাই সমস্যার।
আসামে কিন্তু ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী হয়নি এবং সেখানে নির্বাচন কমিশন কেন এই প্রক্রিয়ায় জোর দিল না, তার উত্তরও কিন্তু এখনও অজানা। আসামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে-দেখে ভোটার তালিকা মেলানো হয়েছে, এবং এই পদ্ধতিই একমাত্র পদ্ধতি যার মধ্য দিয়ে ভোটার তালিকায় সংযোজন বা বিয়োজন করা যায়। যাঁরা বলছেন– কেন? কাগজ দেখাতে অসুবিধা কোথায়? তাঁদের প্রশ্ন করতে হয়, তাহলে আসামে কেন হলো না? এর একমাত্র সম্ভাব্য উপসংহার হল সমস্যাটি এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ডিজাইনের মধ্যেই নিহিত আছে। যেখানে একজন নাগরিকের উপরই তার নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়িত্ব বর্তায় সেখানে নাম বাদের ঘটনাই স্বাভাবিক। আজকে যখন দিকে দিকে অস্তিত্ব প্রমাণে নাজেহাল মানুষের ছবি সামনে আসছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো এক অদ্ভুত নীরবতা অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একদিকে বিজেপির তরফ থেকে বলা হচ্ছে যদি কেউ ভোটের দিন ভোট দিতে যেতে পারেন, তাহলে শুনানিতে যেতে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশন যদি এই কাজ করতে চায়, তাহলে তার গুণাগার এবং খরচ সাধারণ মানুষ কেন দেবেন? আসলে বিষয়টা আত্মমর্যাদার। একজন ৭০ বছরের মানুষকে যদি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করা হয়, তাহলে যে কোনো আত্মমর্যাদাপূর্ণ মানুষের সম্মানে লাগা উচিৎ। সেই বোধ অবশ্য বিজেপির জনপ্রতিনিধিদের কাছে আশা করা অন্যায়। আর যদি বলেন ভোটের কথা, তাহলে ভোট দেওয়া তাঁর অধিকার এবং সেটা তিনি আদৌ দেবেন কি না, তা তাঁর ব্যক্তিগত। তিনি ভোট না’ই দিতে পারেন, কিন্তু তাঁকে যদি বাধ্য করা হয় তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণে , তাহলে সেটা অসম্মানের। এই বয়সে এসেও তাঁদের প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তাঁরা রোহিঙ্গা অথবা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন, তাঁরা ভারতের নাগরিক। এর আগেও নোটবন্দির নামে এই মানুষগুলোকে ব্যাঙ্কের লাইনে এক অমানবিক ভয়াবহতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নোটবন্দির কোনো সুফল কি দেশবাসী পেয়েছে? কালোটাকা ফেরত এসেছে? তখনও বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনী যদি সীমান্তে দাঁড়িয়ে কনকনে ঠান্ডায় দেশের সুরক্ষা দিতে পারেন, তো আমরা এটুকু করতে পারবনা? ফল অবশ্য সেই ভাঁড়ে মা ভবানীই। এক্ষেত্রেও যে সেই একই ঘটবে তা এতদিনে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। মাঝখান থেকে বারংবার হয়রানির শিকার হচ্ছে এই মানুষগুলো।
বিজেপি না হয় এই প্রক্রিয়ার সমর্থক, কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তো খাতায় কলমে এই প্রক্রিয়ার বিরোধী, তাঁদের তরফ থেকে কেন কোনো কথা নেই? প্রসঙ্গত, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে শুনানিতে যাতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা থাকতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা হোক। যদিও কমিশন সেই দাবি মানতে নারাজ। ফলে কবি জয় গোস্বামী কেন, যেকোনো সময় ভোটার তালিকা থেকে যে কোনো মানুষের নামই বাদ পড়তে পারে।






