২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কার দিকে ঝুঁকছে পাল্লা? কী বলছে সমীক্ষা?
West Bengal Election 2026: ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কি ফের জিতবে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে ভারতীয় জনতা পার্টি? সমীক্ষা কি বলছে—তৃণমূল এগিয়ে, নাকি লড়াই টানটান? ভোটের আগে জনমত কতটা বদলাতে পারে?
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই চড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। রাস্তায় সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় মিছিল থেকে শুরু করে টিভি স্টুডিও—সব জায়গাতেই এখন একটাই প্রশ্ন: বাংলায় কি ফের ক্ষমতায় আসবে তৃণমূল, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে বিজেপি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিভিন্ন সংস্থা ও মিডিয়া হাউস ইতোমধ্যেই মতামত সমীক্ষা বা ‘ওপিনিয়ন পোল’ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সেই সব পোলের ফলাফল বলছে, লড়াই এখনও তৃণমূল বনাম বিজেপি, কিন্তু আগের মতো একতরফা নয়।
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনে ভোট হবে দুই দফায়, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল, এবং ফল ঘোষণা ৪ মে। গত ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ২০০-র বেশি আসন পেয়েছিল। এবার লক্ষ্য, চতুর্থবার ক্ষমতায় ফেরা। অন্যদিকে বিজেপি চাইছে সেই ব্যবধান কমিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে আরও কাছে পৌঁছতে।
বলে রাখা ভালো, সমীক্ষাগুলি ভোটের আগেই সম্ভাব্য ফলাফলের একটা ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করলেও এগুলিই চূড়ান্ত ফল নয়। ভোটের আগে জনমনের প্রবণতা বোঝার একটা ইঙ্গিত মাত্র। তবু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক লড়াই কোন দিকে এগোচ্ছে, তা বুঝতে এই পোলগুলির গুরুত্ব অনেক। সবচেয়ে আলোচিত সমীক্ষাগুলির মধ্যে রয়েছে ভোটভাইব-সিএনএন-নিউজ১৮ এবং ম্যাট্রিজ-আইএএনএস-এর জরিপ। এই দুই সমীক্ষার ফলাফল একসঙ্গে দেখলে একটা স্পষ্ট প্রবণতা ধরা পড়ে, রাজ্যে এখনও এগিয়ে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টি-ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।
ভোটভাইব-সিএনএন-নিউজ১৮ সমীক্ষা অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস চতুর্থবারের মতো সরকার গড়তে পারে। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২৯৪ টি বিধানসভা আসনের মধ্যে তৃণমূল পেতে পারে প্রায় ১৮৪ থেকে ১৯৪টি আসন। অর্থাৎ, সরকার গড়তে যত আসন দরকার (১৪৮), তার থেকেও অনেক বেশি।
এই একই সমীক্ষা বিজেপির জন্য ৯৮ থেকে ১০৮টি আসনের পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থাৎ, বিজেপি আগের তুলনায় শক্ত অবস্থানে থাকলেও সরকার গড়ার মতো সংখ্যায় এখনও কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে ছোট দল ও আঞ্চলিক শক্তির উপস্থিতি খুব সীমিত থাকবে বলেই উঠে এসেছে সমীক্ষায়। ভোট শতাংশের ক্ষেত্রেও তৃণমূল এগিয়ে। সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৪১.৯ শতাংশ ভোট তৃণমূলের দিকে যেতে পারে, যেখানে বিজেপির সম্ভাব্য ভোট শেয়ার ৩৪.৯ শতাংশের আশেপাশে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rajbanshi leader Banshibadan Barman: কোচবিহারের রাজবংশী নেতা বংশীবদন বর্মনের বিজেপিতে যোগদান কি উত্তরবঙ্গের ভোটের সমীকরণ বদলে দেবে? রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কে কী প্রভাব পড়বে?
অন্যদিকে ম্যাট্রিজ-আইএএনএস-এর সমীক্ষাযে একটু ভিন্ন ছবি উঠে এসেছে। এই জরিপ অনুযায়ী, তৃণমূল পেতে পারে ১৫৫ থেকে ১৭০টি আসন, আর বিজেপি পেতে পারে ১০০ থেকে ১১৫টি আসন। এই সমীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তৃণমূলের জয় নিশ্চিত হলেও ব্যবধান আগের নির্বাচনের তুলনায় কমতে পারে। বিজেপি এখানে স্পষ্টতই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসছে।
ভোট শতাংশের হিসেবে ম্যাট্রিজ-আইএএনএস-এর সমীক্ষা বলছে, তৃণমূল পেতে পারে ৪৩-৪৫ শতাংশ ভোট, আর বিজেপি ৪১-৪৩ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। এতে আসন বণ্টনে বড় পার্থক্যও তৈরি করতে পারে।
এই দুই সমীক্ষা পাশাপাশি রাখলে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। ভোটভাইব-এর সমীক্ষা তৃণমূলের বড় জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু ম্যাট্রিজ-আইএএনএস বলছে লড়াই অনেকটাই টাইট।
রাজনীতির মাঠেও এই সমীক্ষার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিজেপি ইতোমধ্যেই সংগঠনকে মজবুত করতে ‘বটম-আপ’ কৌশল নিচ্ছে, বিশেষ করে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জোর দিচ্ছে।
অন্যদিকে তৃণমূলও সংগঠনকে নতুন করে সাজাচ্ছে এবং প্রার্থী তালিকায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pink Booth Kolkata: দেখা যাচ্ছে, রাত ১১টার পর যখন বুথগুলো সবথেকে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাঁকুড়গাছি বা হাডকো ক্রসিংয়ের মতো জায়গায় অনেক সময় বুথগুলো খালি থাকছে।
এই পরিস্থিতিতে লড়াই মূলত দুই দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। একদিকে তৃণমূল, অন্যদিকে বিজেপি। যদিও কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট নিজেদের জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে, সমীক্ষাগুলিতে তাদের প্রভাব খুব সীমিত বলেই দেখা যাচ্ছে।
সমীক্ষাগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের মাত্রা। কিছু সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, একটা অংশ এখনও বর্তমান বিধায়কদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট এবং তাদের ফের ভোট দিতে প্রস্তুত।
এটা তৃণমূলের জন্য বড় সুবিধা হতে পারে।
তবে সবকিছুর মধ্যেও একটা বিষয় পরিষ্কার, ২০২১ সালের মতো একতরফা ফল নাও হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও শহরাঞ্চলে ফলাফল খুব কাছাকাছি হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো জোট রাজনীতি। বাম ও কংগ্রেস একসঙ্গে লড়বে কি না, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই জোট হলে কিছু আসনে সমীকরণ বদলাতে পারে, যদিও তার প্রভাব সীমিতই থাকবে বলে মত ওয়াকিবহল মহলের।
এখন পর্যন্ত যে সমীক্ষাগুলো সামনে এসেছে, তা থেকে তিনটি বড় ট্রেন্ড স্পষ্ট। প্রথমত, তৃণমূল এখনও এগিয়ে। দ্বিতীয়ত, বিজেপি আগের তুলনায় শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অনেক আসনে লড়াই কঠিন করে তুলতে পারে। তৃতীয়ত, অন্য দলগুলির প্রভাব কমে গিয়ে লড়াই মূলত দ্বিমুখী হয়ে উঠছে। সুতরাং ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন এখনো ‘ওপেন কন্টেস্ট’।
ভোটের আগে মানুষের মত বদলে যেতে পারে। কে প্রার্থী হচ্ছে, কীভাবে প্রচার চলছে, কী ইস্যু উঠছে আর ভোটের দিন কত মানুষ ভোট দিচ্ছে—সব মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত ফল ঠিক হবে। সমীক্ষা তৃণমূলকে এগিয়ে রাখলেও, বিজেপির চ্যালেঞ্জকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নয়। শেষ কথা বলবে ব্যালট। ৪ মে ফল ঘোষণার দিনই জানা যাবে, সমীক্ষা কতটা সত্যি হলো।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে একজিট পোল ঘিরে বড়সড় বুমেরাং দেখা গিয়েছিল। ভোটের শেষ দফার পর বেশিরভাগ জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের একজিট পোলই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকতে পারে, এমনকী সরকার গঠনের সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছিল। অনেক সমীক্ষায় বিজেপিকে ১৩০-১৬০ আসনের মধ্যে দেখানো হয়, আর অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস-কে ধরা হয় তার কাছাকাছি বা কিছুটা পিছিয়ে। কিন্তু ২ মে ফল ঘোষণার পর বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে যায়। তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন জিতে বিপুল ব্যবধানে ক্ষমতায় ফেরে, আর বিজেপি পায় ৭৭ আসন। অর্থাৎ, একজিট পোলের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ফলের ফারাক ছিল বিশাল। ভোট শতাংশের ক্ষেত্রেও তৃণমূল স্পষ্টভাবে এগিয়ে ছিল।
ফলে ২০২১-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একজিট পোল সবসময় নির্ভুল নয়। এগুলো শুধু একটা ইঙ্গিত দেয়, চূড়ান্ত ফল নয়, শেষ কথা বলে ভোটবাক্সই।






