ভোটের অঙ্কে নতুন মোড়? বামেদের সম্ভাবনা কতটা?
West Bengal Elections 2026: বাম শিবির কি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে বাংলার রাজনীতিতে? এই ট্রেন্ডে বিজেপির আসনে কি চাপ বাড়বে? মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় সংঘর্ষের অভিযোগ কতটা প্রভাব ফেলবে ফলাফলে? এবার কি বদলাবে ভোটের অঙ্ক?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় রেকর্ড ভোট পড়ার পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলির অন্দরমহলে শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাবনিকাশ। বিশেষ করে বাম শিবির এই বাড়তি ভোটদানের হারকে নিজেদের পক্ষে সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। তাদের যুক্তি, যত বেশি ভোট পড়বে, ততই সংগঠিত ভোটব্যাঙ্কের বাইরে থাকা অসন্তুষ্ট বা নীরব ভোটাররা বুথমুখী হবেন আর সেই অংশের একটা বড় অংশ বামেদের দিকে ফিরতে পারে।
এই প্রত্যাশার পেছনে কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও, তাদের একটি স্থায়ী কোর ভোট এখনও রয়েছে। সেই কোর ভোট যদি পুরোপুরি বুথে আসে এবং তার সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত ভোট যুক্ত হয়, তাহলে কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে লড়াই জমে উঠতে পারে বলেই মনে করছে বাম নেতৃত্ব। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও মুর্শিদাবাদ-নদিয়া বেল্টের কিছু কেন্দ্রকে তারা আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই তালিকায় রয়েছে করণদিঘি, ডোমকল, জলঙ্গি, খরগ্রাম এবং রানীনগর। এই কেন্দ্রগুলিতে ঐতিহাসিকভাবে বামেদের সংগঠন ছিল শক্তিশালী। যদিও গত কয়েকটি নির্বাচনে সেই শক্তি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তবুও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। বামেদের হিসেব বলছে, যদি ভোটের শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, তাহলে এই কেন্দ্রগুলিতে তারা আগের তুলনায় ভালো ফল করতে পারে।
গত নির্বাচনের ফলাফল দেখলে এই বিশ্লেষণের একটা ভিত্তি বোঝা যায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট কার্যত ভরাডুবি করেছিল। রাজ্যে একটিও আসন জিততে পারেনি তারা। বহু আসনে তাদের প্রার্থীরা তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে চলে গিয়েছিলেন। ভোটের শতাংশও নেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকলেও সেই জোট খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: এসআইআর বিতর্কের পর প্রথম দফাতেই ৯২% এর বেশি ভোট—এত বড় অংশগ্রহণ কি তৃণমূলের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত, নাকি ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ? সামশেরগঞ্জের রেকর্ড ভোট কী বলছে? এই উচ্চ ভোট কি বদলের বার্তা, না শাসক দলের পক্ষে হাওয়া?
তবে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো কিছু জেলায় বাম-কংগ্রেস জোট কিছুটা লড়াই দিয়েছিল। ডোমকল, জলঙ্গি বা রানীনগরের মতো কেন্দ্রে তারা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। যদিও জয়ের মুখ দেখেনি, তবুও একটি উল্লেখযোগ্য ভোট তারা ধরে রাখতে পেরেছিল। সেই স্মৃতিই এখন বামেদের আশাবাদী করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রথম দফার উচ্চ ভোটদানের হার নতুন করে সমীকরণ তৈরি করছে। বাম নেতৃত্বের ধারণা, গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে—তা যদি ভোটে প্রতিফলিত হয়, তাহলে তার একটি অংশ তাদের দিকে আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব ভোটার আগে ভোট দিতে যেতেন না বা নিরুৎসাহিত ছিলেন, তারা যদি এবার বুথে যান, তাহলে ফলাফলে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
এই সমীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিজেপির অবস্থান। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে বিজেপি। ২০২১ সালে তারা ৭৭টি আসন জিতে শক্তিশালী উপস্থিতি দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ভোটের একটা বড় অংশই ছিল তৃণমূল বিরোধী ভোটের সমাবেশ। যদি সেই ভোটের কিছু অংশ বামেদের দিকে সরে যায়, তাহলে বিজেপির আসন সংখ্যা কমতে পারে—এমনটাই মনে করছে বাম শিবির।
অর্থাৎ, বামেরা যদি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিজেপির উপর। তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরোধী ভোট বিভক্ত হলে লাভবান হতে পারে শাসক দল। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, বামেরা যদি নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে শক্তিশালী লড়াই দেয়, তাহলে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: বিজেপি কি সত্যিই ১৭০ আসনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বাংলায়? অমিত শাহের ‘সুনামি’ দাবি কতটা বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? উত্তরবঙ্গে শক্তি বাড়লেও দক্ষিণে কি এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে? বেশি ভোট পড়লেই কি বদলাবে সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?
সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়িও বলেন,
বেশ কিছু আসনে বামপন্থীরা জিতবেন। গত কয়েকটি নির্বাচনে বামের উল্লেখযোগ্য অংশের ভোট বিজেপির দিকে সরে গিয়েছিল। এবার সেই ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে ফের টানতে পারবে বাম শিবির।
এই সমস্ত রাজনৈতিক অঙ্কের মধ্যেই উঠে এসেছে ডোমকলের পরিস্থিতি। মুর্শিদাবাদের এই কেন্দ্রটি নিয়ে ভোটের দিন থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বাম সমর্থকদের অভিযোগ, তাঁদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। যদিও শাসক দল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
২২ এপ্রিল রাত থেকেই ডোমকলে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাম এবং তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ভোটের দিন সেই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বলেই অভিযোগ।
এই ধরনের অভিযোগ অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংঘর্ষ, বাধা বা অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটের পর বোঝা যাচ্ছে, লড়াই শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, তার মধ্যে আবার জায়গা করে নিতে চাইছে বামেরা। বাড়তি ভোটের শতাংশ, নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে সংগঠনের উপস্থিতি এবং বিরোধী ভোটের সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই তারা নতুন করে লড়াইয়ের ময়দানে নামতে চাইছে।
শেষ পর্যন্ত এই অঙ্ক কতটা মিলে যায়, তা জানা যাবে ফল প্রকাশের দিন। তবে আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে ভোটের শতাংশই হয়ে উঠেছে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সূচক, যার উপর নির্ভর করছে একাধিক দলের ভবিষ্যৎ।






