ভোটের অঙ্কে নতুন মোড়? বামেদের সম্ভাবনা কতটা?

West Bengal Elections 2026: বাম শিবির কি আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে বাংলার রাজনীতিতে? এই ট্রেন্ডে বিজেপির আসনে কি চাপ বাড়বে? মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় সংঘর্ষের অভিযোগ কতটা প্রভাব ফেলবে ফলাফলে? এবার কি বদলাবে ভোটের অঙ্ক?

inscript
৩ মিনিট
ভোটের অঙ্কে নতুন মোড়? বামেদের সম্ভাবনা কতটা?

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় রেকর্ড ভোট পড়ার পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলির অন্দরমহলে শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাবনিকাশ। বিশেষ করে বাম শিবির এই বাড়তি ভোটদানের হারকে নিজেদের পক্ষে সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। তাদের যুক্তি, যত বেশি ভোট পড়বে, ততই সংগঠিত ভোটব্যাঙ্কের বাইরে থাকা অসন্তুষ্ট বা নীরব ভোটাররা বুথমুখী হবেন আর সেই অংশের একটা বড় অংশ বামেদের দিকে ফিরতে পারে।

এই প্রত্যাশার পেছনে কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও, তাদের একটি স্থায়ী কোর ভোট এখনও রয়েছে। সেই কোর ভোট যদি পুরোপুরি বুথে আসে এবং তার সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত ভোট যুক্ত হয়, তাহলে কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে লড়াই জমে উঠতে পারে বলেই মনে করছে বাম নেতৃত্ব। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও মুর্শিদাবাদ-নদিয়া বেল্টের কিছু কেন্দ্রকে তারা আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই তালিকায় রয়েছে করণদিঘি, ডোমকল, জলঙ্গি, খরগ্রাম এবং রানীনগর। এই কেন্দ্রগুলিতে ঐতিহাসিকভাবে বামেদের সংগঠন ছিল শক্তিশালী। যদিও গত কয়েকটি নির্বাচনে সেই শক্তি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তবুও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। বামেদের হিসেব বলছে, যদি ভোটের শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, তাহলে এই কেন্দ্রগুলিতে তারা আগের তুলনায় ভালো ফল করতে পারে।

গত নির্বাচনের ফলাফল দেখলে এই বিশ্লেষণের একটা ভিত্তি বোঝা যায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট কার্যত ভরাডুবি করেছিল। রাজ্যে একটিও আসন জিততে পারেনি তারা। বহু আসনে তাদের প্রার্থীরা তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে চলে গিয়েছিলেন। ভোটের শতাংশও নেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট থাকলেও সেই জোট খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রথম দফায় কত আসন? কী কথা তৃণমূলের অন্দরে?

West Bengal Election 2026: এসআইআর বিতর্কের পর প্রথম দফাতেই ৯২% এর বেশি ভোট—এত বড় অংশগ্রহণ কি তৃণমূলের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত, নাকি ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ? সামশেরগঞ্জের রেকর্ড ভোট কী বলছে? এই উচ্চ ভোট কি বদলের বার্তা, না শাসক দলের পক্ষে হাওয়া?

তবে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো কিছু জেলায় বাম-কংগ্রেস জোট কিছুটা লড়াই দিয়েছিল। ডোমকল, জলঙ্গি বা রানীনগরের মতো কেন্দ্রে তারা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। যদিও জয়ের মুখ দেখেনি, তবুও একটি উল্লেখযোগ্য ভোট তারা ধরে রাখতে পেরেছিল। সেই স্মৃতিই এখন বামেদের আশাবাদী করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রথম দফার উচ্চ ভোটদানের হার নতুন করে সমীকরণ তৈরি করছে। বাম নেতৃত্বের ধারণা, গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে—তা যদি ভোটে প্রতিফলিত হয়, তাহলে তার একটি অংশ তাদের দিকে আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব ভোটার আগে ভোট দিতে যেতেন না বা নিরুৎসাহিত ছিলেন, তারা যদি এবার বুথে যান, তাহলে ফলাফলে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এই সমীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিজেপির অবস্থান। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে বিজেপি। ২০২১ সালে তারা ৭৭টি আসন জিতে শক্তিশালী উপস্থিতি দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই ভোটের একটা বড় অংশই ছিল তৃণমূল বিরোধী ভোটের সমাবেশ। যদি সেই ভোটের কিছু অংশ বামেদের দিকে সরে যায়, তাহলে বিজেপির আসন সংখ্যা কমতে পারে—এমনটাই মনে করছে বাম শিবির।

অর্থাৎ, বামেরা যদি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিজেপির উপর। তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিরোধী ভোট বিভক্ত হলে লাভবান হতে পারে শাসক দল। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, বামেরা যদি নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে শক্তিশালী লড়াই দেয়, তাহলে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বেশি ভোট পড়লেই বদলায় সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?

West Bengal Election 2026: বিজেপি কি সত্যিই ১৭০ আসনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বাংলায়? অমিত শাহের ‘সুনামি’ দাবি কতটা বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? উত্তরবঙ্গে শক্তি বাড়লেও দক্ষিণে কি এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে? বেশি ভোট পড়লেই কি বদলাবে সরকার, নাকি তৃণমূলই আবার এগিয়ে থাকবে?

সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়িও বলেন,

বেশ কিছু আসনে বামপন্থীরা জিতবেন। গত কয়েকটি নির্বাচনে বামের উল্লেখযোগ্য অংশের ভোট বিজেপির দিকে সরে গিয়েছিল। এবার সেই ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে ফের টানতে পারবে বাম শিবির।

এই সমস্ত রাজনৈতিক অঙ্কের মধ্যেই উঠে এসেছে ডোমকলের পরিস্থিতি। মুর্শিদাবাদের এই কেন্দ্রটি নিয়ে ভোটের দিন থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বাম সমর্থকদের অভিযোগ, তাঁদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। যদিও শাসক দল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

২২ এপ্রিল রাত থেকেই ডোমকলে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাম এবং তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ভোটের দিন সেই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বলেই অভিযোগ।

এই ধরনের অভিযোগ অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংঘর্ষ, বাধা বা অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটের পর বোঝা যাচ্ছে, লড়াই শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, তার মধ্যে আবার জায়গা করে নিতে চাইছে বামেরা। বাড়তি ভোটের শতাংশ, নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে সংগঠনের উপস্থিতি এবং বিরোধী ভোটের সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই তারা নতুন করে লড়াইয়ের ময়দানে নামতে চাইছে।

শেষ পর্যন্ত এই অঙ্ক কতটা মিলে যায়, তা জানা যাবে ফল প্রকাশের দিন। তবে আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে ভোটের শতাংশই হয়ে উঠেছে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সূচক, যার উপর নির্ভর করছে একাধিক দলের ভবিষ্যৎ।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।