৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনকে বাদ দিয়েই ভোট? কী প্রভাব পড়বে?
West Bengal voter list revision: পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়ল ভোটার তালিকা থেকে—এ কি শুধুই সংশোধন, নাকি রাজনৈতিক কৌশল? সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতেই কেন বাদের হার বেশি? ২০২৬-এর নির্বাচনে কি বদলে যাবে ফলাফল?
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বাদ পড়েছে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল সোমবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে জানান, ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে ৪৫ শতাংশেরও বেশি নাম অযোগ্য বলে বাদ দেওয়া হয়েছে। ৭০৫ জন বিচারকের অধীনে এই যাচাই চলেছে। চূড়ান্ত তালিকা এখন 'ফ্রিজ' হয়ে গেছে।
এসআইআর-এর আগের পর্যায়ে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জনের নাম। তারপর পোস্ট-এসআইআর পর্যায়ে আরও কিছু বাদের পর বিবেচনাধীন তালিকা থেকে এই ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন বাদ যাওয়ায় মোট বাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জন। এর ফলে রাজ্যের ভোটার সংখ্যা আগের ৭ কোটি ৬৬ লক্ষের কাছাকাছি থেকে নেমে এসেছে ৭ কোটি ৪ লক্ষের নীচে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gyanesh Kumar controversy: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর বিরুদ্ধে আনা অপসারণ প্রস্তাব কেন খারিজ করলেন উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন? অভিযোগগুলি কি সাংবিধানিক ‘মিসবিহেভিয়র’-এর মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, নাকি রাজনৈতিক বিতর্কই এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা নিল?
বাদ পড়া মানুষের সংখ্যর দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন চোখে পড়বে। সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে—৪ লক্ষ ৫৫ হাজার। তারপর উত্তর ২৪ পরগনা (৩ লক্ষ ২৫ হাজার), মালদা (২ লক্ষ ৩৯ হাজার), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (২ লক্ষ ২২ হাজার) এবং পূর্ব বর্ধমান (২ লক্ষ ৯ হাজার)। এই পাঁচ জেলায় বাদ পড়া নামের সংখ্যা মোট বাদ পড়া নামের অর্ধেকেরও বেশি। মনে রাখতে হবে এই এলাকাগুলি সীমান্তসংলগ্ন, ঘনবসতিপূর্ণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদায় সংখ্যালঘু জনসংখ্যার অনুপাত অন্যান্য জেলাগুলির থেকে অনেকটাই বেশি। ফলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, জনতার ভোটাধিকার বাতিল করেই কি ক্ষমতাদখলের ঘুঁটি সাজানো হচ্ছে?
নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকে বলে আসছে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ও অযোগ্য ভোটারদের তালিকা পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াকেই বাস্তবায়ন করছে তারা। এই পর্বে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে বিচারকরা প্রতিটি মামলা খতিয়ে দেখেছেন। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক শিবিরকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বাদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বক্তব্য, এতে তাদের ভোটে কোপ পড়ছে। এই প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই করা। বিজেপির পাল্টা জাল ও অবৈধ ভোটার সরিয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং আইনানুসারে হয়েছে। কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Amit Shah West Bengal visit: বঙ্গ বিজেপির উপর কি সত্যিই আস্থা হারাচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব? কেন বাংলার ভোটে সরাসরি ময়দানে নামছেন অমিত শাহ? টার্গেট কমানো, বাড়তি কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ—এসবই কি কৌশল, নাকি অবিশ্বাসের ইঙ্গিত?
ভোটের রাজনীতি ছাড়াও নাম বাতিলের বিষয়ে কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের আপিলের জন্য মাত্র ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, সেগুলি প্রধানত কলকাতায়। মুর্শিদাবাদ বা মালদার গ্রামীণ এলাকার একজন ভোটারের পক্ষে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে প্রমাণ জমা দেওয়া কতটা সম্ভব? এর সময়সীমাও স্পষ্ট নয়। কেন নিজের অর্থ খরচ করে একজন বৈধ নাগরিক ফের নিজের নাম তুলবেন, এ প্রশ্নের ফলে উত্তর দেওয়ারও কেউ নেই। এটুকু তারা জানেন, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন না। পরে ট্রাইব্যুনালে ফয়সলা হলে নাম তালিকায় ফিরতে পারে, কিন্তু ভোটের দিন আপাতত তারা অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
স্বচ্ছ ভোটার তালিকার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। মৃত বা স্থানান্তরিত নাম সরানো গণতন্ত্রের স্বার্থেই জরুরি। কিন্তু প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে যদি ভৌগোলিক ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন থাকবেই। সাধারণ ভোটারের কি ব্যবস্থায় আস্থা অটুট থাকবে? ভোটব্য়বস্থাকে স্বচ্ছ এবং প্রশ্নাতীত রাখাটাও কি নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য নয়?





