একে একে নিভিছে দেউটি, কেন বন্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ওয়েস্টল্যান্ড?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
একে একে নিভিছে দেউটি, কেন বন্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ওয়েস্টল্যান্ড?

করোনার দিনগুলিতে বহু ছোট ব্যবসাই যখন প্রায় ধুঁকছে তখনই বইপ্রেমীদের জন্য আরেক দুঃসংবাদ। এবার বই ব্যবসায় ইতি টানল ভারতের অন্যতম বৃহৎ বই প্রকাশক ওয়েস্টল্যান্ড বুকস। ওয়েস্টল্যান্ডের মালিক ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নানা দিক খতিয়ে দেখে আলোচনা করে আমরা ওয়েস্টল্যান্ড প্রকাশনা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কঠিন ছিল তবু সব দিক মাথায় রেখেই আমরা এই ওয়েস্টল্যান্ড বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা এই মুহূর্তে কর্মচারী, লেখক, এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউশন এবং অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছি’।

ওয়েস্টল্যান্ডের বেড়ে ওঠা

১৯৬২ তে যখন পথ চলা শুরু করে ওয়েস্টল্যান্ড, তখন তার নাম ছিল ইস্ট- ওয়েস্ট বুকস। মালিক ছিল টাটার আয়ত্তাধীন সংস্থা ট্রেন্ট লিমিটেড। ২০১৭ সালে অ্যামাজনের ভারতীয় শাখা দায়িত্ব নেয় ইস্ট ওয়েস্ট বুকসের। বদল হয় নাম। তারপর থেকে ৫ বছরে বিভিন্ন ধরনের বইয়ের আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করেছে ওয়েস্ট ল্যান্ড। বেস্টসেলার থেকে প্রান্তিক লেখক প্রায় সকলের লেখাকেই পাঠকের কাছে অবাধে পৌঁছে দিয়েছে।

প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে স্বাভাবিক ভাবেই কর্পোরেট পুঁজির আলাদা কদর আছে। অ্যামাজনের মত একটি সংস্থার হাত ধরে নিজের ব্যবসায়িক বৃদ্ধির পথকেই প্রশস্ত করতে চেয়েছিল ওয়েস্টল্যান্ড। আবার অন্যদিকে হারপার কলিন্স, পেঙ্গুইনের মত আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের টক্কর দিতে শুরু করেছিল ওয়েস্টল্যান্ড।

২০১৮ সালে এই মুহূর্তে ভারতের অন্যতম বেস্ট সেলার লেখক চেতন ভগতের বই প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় ওয়েস্টল্যান্ড। ‘ফোর হানড্রেড ডেজ’ থেকে শুরু করে ‘ওয়ান অ্যারেঞ্জড মার্ডার’, ‘দ্য গার্ল ইন রুম ১০৫’ এর মতন অসংখ্য বিখ্যাত বইয়ের প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় ওয়েস্টল্যান্ড। প্রকাশনা বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার পরে নেওয়ার পর পাঠক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এই বইগুলির ভবিষ্যৎ কী! ২০০৪ সালে চেতন যখন লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন প্রাথমিকভাবে রূপা পাবলিকেশনের মাধ্যমেই তার বইগুলি বাজারে আসতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে অ্যামাজনের মত একটি বৃহৎ সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন চেতন ভগত। এক বিপুল আর্থিক অঙ্কের বিনিময়ে চেতনের যাবতীয় বইয়ের দায়িত্ব নেয় অ্যামাজন। এই বিষয়ে চেতনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, যেভাবে ভারতের প্রতিটি কোণে কোণে যোগাযোগের সেতু বেঁধে দিয়েছে অ্যামাজন তাই নিজের বইকে পাঠকের দরজায় দরজায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যামাজনের মালিকানাধীন ওয়েস্টল্যান্ডের কোনও বিকল্প হতেই পারে না। তাই অ্যামাজনের এই সিদ্ধান্ত আঘাত দিয়েছে লেখক থেকে বইপ্রেমী সকলকেই।

বাংলার একমাত্র ওয়েস্টল্যান্ড প্রকাশিত বইয়ের লেখক সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী। ১০টির বেশি বই রয়েছে তাঁর ওয়েস্টল্যান্ড থেকে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এই খবর অত্যন্ত দুঃখের। এতজন লেখক, কর্মীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে এর সাথে।যদি ও আমি এই অবধি কোনও অফিসিয়াল চিঠি হাতে পাইনি। আমার সঙ্গে ওদের চুক্তির মেয়াদ পূরণের আগেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। আমার বইয়ের প্রকাশনার বিষয়ে বিকল্প ভাবনা আমি এখনও ভাবিনি। চিঠি হাতে পেলে এই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব’।

শেডস অফ স্যাফ্রন: ফ্রম বাজপেয়ী টু মোদী গ্রন্থের লেখক সাংবাদিক সাবা নকভি টুইটে লিখেছেন, ‘ আমি ওয়েস্টল্যান্ড সংস্থার তরফে চিঠি পেয়েছি। সেখানে ফেব্রুয়ারির শেষের মধ্যে আমার বইয়ের যাবতীয় সত্ত্ব আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না ঠিক কী কারণে ওয়েস্টল্যান্ডের মতো একটি প্রকাশনা সংস্থাকে তুলে নেওয়ার কথা ভাবল অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ তবে আমি আশাবাদী শেষ মুহূর্তে হলে ও যদি কোনোভাবে অ্যামাজন তাদের সিদ্ধান্ত বদলায়’। মনে রাখতে হবে ওয়েস্টল্যান্ডের লেখক তালিকায় আছে আমিশ ত্রিপাঠী, দেবদত্ত পট্টনায়ক, রুজুতা দিবাকর, হর্ষ ভোগলের মত নামও।

কেন বন্ধ হচ্ছে ওয়েস্টল্যান্ড?

ওয়েস্টল্যান্ড বন্ধের সঠিক কারণের কোনও উল্লেখ নেই অ্যামাজনের সরকারি বিবৃতিতে। এমনকী এই বন্ধের ফলে পুরনো সংস্করণগুলির কী হবে তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ওয়েস্টল্যান্ডের মত একটি লাভজনক প্রকাশনীকে হঠাৎ কেন বন্ধ করার পথে হাঁটল অ্যামাজন তাই নিয়ে লেখক- পাঠক মহলে ও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অনেকে মনে করেন কোভিডের দুবছরের ধাক্কার পরে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে এই বিবেচনাতেই ঝাঁপ বন্ধ করছে ওয়েস্টল্যান্ড। যেখানে পেঙ্গুইনের বাৎসরিক আয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা, সেখানে ওয়েস্টল্যান্ড টেনেটুনে ৩০ কোটিতে পৌঁছেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারতের ক্রেতাবাজারের সিংহভাগ দখল করে রয়েছে চার থেকে পাঁচটি প্রকাশনা। এই মুহূর্তে ওয়েস্টল্যান্ডের মতো প্রকাশনার চলে যাওয়া মানে বৈচিত্র্যের যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল, তার অপমৃত্যু।

লেখকদের একাংশের ধারণা, এর পিছনে স্পষ্ট কাজ করছে রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব। ফেসবুক, টুইটারের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপির প্রতি আনুগত্য আগেই বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণিত। সেই তালিকায় সম্ভবত নতুন সংযোজন অ্যামাজন। সাংবাদিক লেখক অমিত ভার্মা টুইটে সেই রাজনৈতিক ইন্ধনের প্রশ্নকেই উসকে দিয়েছেন। শেষ কয়েক বছরে ওয়েস্টল্যান্ড থেকে বেরিয়েছে ক্রিস্টোফার জ্যাফ্রেলটের ‘মোদী’স ইন্ডিয়া’, আকর পটেলের ‘আওয়ার হিন্দু রাষ্ট্র’, অরবিন্দ নারায়ণের ‘ইন্ডিয়া’স আনডিক্লেয়ারড এমারজেন্সির’ মত বই।প্রতিটি বইয়েই বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধ স্পষ্ট। তবে কি বিরুদ্ধ স্বরেরই মাসুল গুনতে হল ওয়েস্টল্যান্ড কে?

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।