ত্রাসের নাম SIR, গত কয়েক মাসে যা দেখল বাংলা
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নাগরিকত্ব থাকবে তো? উৎকণ্ঠায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যোগ্য ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা যাক, গত কয়েক মাসে এসআইআর-এর নামে যে ত্রাস দেখেছে বাংলা।
রাজ্যে ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে, আর সেই আবহে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়া। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়া জুড়ে স্বচ্ছতা, সময়সীমা এবং ভোটাধিকার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার থাকবে তো? উৎকণ্ঠায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যোগ্য ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা যাক, গত কয়েক মাসে এসআইআর-এর নামে যে ত্রাস দেখেছে বাংলা।
গত বছর ২৭ অক্টোবর SIR-এর সূচি ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরের দিন থেকেই শুরু হয় প্রক্রিয়া। ২০০২ সালের পর এই প্রথম রাজ্যে এত বড় মাপের সংশোধন অভিযান চালানো হয়। শুরুতে রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই বাদ যায় ৫৮ লক্ষের বেশি নাম, ফলে তালিকায় নাম দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষের কিছু বেশি।
নভেম্বর মাস থেকে মাঠে নামে বুথ লেভেল অফিসাররা। ৪ নভেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই, এনুমারেশন ফর্ম পূরণ— সব মিলিয়ে শুরু হয় বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের কাজ। ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বিএলও-দের প্রতিটি বুথের সমস্ত বাড়িতে পৌঁছনোর নির্দেশ ছিল কমিশনের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Election 2026: ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কি ফের জিতবে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে ভারতীয় জনতা পার্টি? সমীক্ষা কি বলছে—তৃণমূল এগিয়ে, নাকি লড়াই টানটান? ভোটের আগে জনমত কতটা বদলাতে পারে?
তবে প্রক্রিয়া শুরু হতেই আইনি লড়াইও শুরু হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বাসিন্দা মোস্তারি বানু সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। সেখানে নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়ায় এনুমারেশন ফর্মে বাধ্যতামূলক পাসপোর্ট সাইজ ছবি যুক্ত করার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। মোস্তারির যুক্তি ছিল, মুসলিম সমাজের বহু নারী ধর্মীয় কারণে মুখ ঢেকে রাখেন। ফলে ছবি বাধ্যতামূলক করলে তাঁদের ভোটাধিকার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, যা সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। তবে প্রথম শুনানির কয়েক ঘণ্টা আগেই নির্বাচন কমিশন জানায়, ছবি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
এই মামলায় ১৯ জানুয়ারি এক গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানায়, মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড জন্মতারিখের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রভাবিত ব্যক্তিরা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সই বা টিপছাপ সহ সরল আবেদনের ভিত্তিতে নথি জমা দিতে পারবেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal voter list controversy: সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ নাম বাদ। কারও কাছে পাসপোর্ট আছে, তবুও ভোটাধিকার অনিশ্চিত। প্রাক্তন বিচারপতিও রেহাই পাননি। কারণ না জানিয়ে নাম বাদ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ কী করবে? ট্রাইবুনাল কোথায়, প্রক্রিয়া কী কেউ জানে না।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি খসড়া তালিকা প্রকাশের পর যাঁদের নাম নিয়ে সংশয় ছিল, তাঁদের নোটিস পাঠিয়ে শুনানিতে ডাকা হয়। এই প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম থেকেই নাগরিকত্ব হারানো এবং দেশছাড়া হওয়ার আতঙ্কে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কাজের চাপে বেশ কিছু বিএলও-রও মৃত্যু হয়। এসআইআর নিয়ে নানান চাপানউতোরের মাঝেই ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি SIR প্রক্রিয়ায় আদালত হস্তক্ষেপ করে। প্রক্রিয়া চালু রাখার পাশাপাশি সময়সীমা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়।
নতুন সূচি অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুনানি, ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যাচাই এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয় আদালত। এই সময়েই লক্ষ লক্ষ দাবি নিষ্পত্তি করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক নাম বাদ বা স্থগিত রাখা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Politics: ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাই ভোটের অঙ্ক বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। SIR-এ কে লাভের গুড় ঘরে তুলবে, সেই অঙ্কই কষছে তৃণমূল-বিজেপি যুযুধান দুই পক্ষ।
২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় চূড়ান্ত তালিকা। মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২। সেই তালিকায় বিবেচনাধীন ছিলেন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫। যা নিয়ে চরমে ওঠে রাজনৈতিক বিতর্ক। মার্চ মাসে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ২৩ মার্চ প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় প্রায় ২৭ লক্ষ নাম থাকলেও তার মধ্যে ৪০ শতাংশ নাম বাদ পড়ে।
২৭ মার্চ দ্বিতীয় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ হলেও কতজনের নাম নিষ্পত্তি হয়েছে বা কতজন বাদ পড়েছেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এর মধ্যেই ২৯ মার্চ তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। তাতে দেখা যাচ্ছে, এখনও প্রায় ২ লক্ষ ভোটার বিবেচনাধীন রয়েছেন।
এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিবেচনাধীন তালিকা থেকেও প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশ নাম ইতোমধ্যেই বাদ পড়েছে। চূড়ান্ত তালিকার পরবর্তী ধাপে ৪০ লক্ষের তালিকা থেকে আরও প্রায় ১৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে।
এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়া ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে উঠেছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি, তালিকা শুদ্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ, অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ— ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। সময়সীমা কম থাকায় আপিল প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বহু মানুষ। নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে ভোটার তালিকা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি হয়েছে বাংলায়। SIR প্রক্রিয়া শেষের পথে, তবে বিতর্ক থামার কোনও ইঙ্গিত এখনও নেই।






