ত্রাসের নাম SIR, গত কয়েক মাসে যা দেখল বাংলা

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নাগরিকত্ব থাকবে তো? উৎকণ্ঠায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যোগ্য ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা যাক, গত কয়েক মাসে এসআইআর-এর নামে যে ত্রাস দেখেছে বাংলা।

inscript
৪ মিনিট
ত্রাসের নাম SIR, গত কয়েক মাসে যা দেখল বাংলা

রাজ্যে ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে, আর সেই আবহে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়া। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়া জুড়ে স্বচ্ছতা, সময়সীমা এবং ভোটাধিকার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার থাকবে তো? উৎকণ্ঠায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যোগ্য ভোটাররা। এমন পরিস্থিতিতে ফিরে দেখা যাক, গত কয়েক মাসে এসআইআর-এর নামে যে ত্রাস দেখেছে বাংলা।

গত বছর ২৭ অক্টোবর SIR-এর সূচি ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরের দিন থেকেই শুরু হয় প্রক্রিয়া। ২০০২ সালের পর এই প্রথম রাজ্যে এত বড় মাপের সংশোধন অভিযান চালানো হয়। শুরুতে রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই বাদ যায় ৫৮ লক্ষের বেশি নাম, ফলে তালিকায় নাম দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষের কিছু বেশি।

নভেম্বর মাস থেকে মাঠে নামে বুথ লেভেল অফিসাররা। ৪ নভেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই, এনুমারেশন ফর্ম পূরণ— সব মিলিয়ে শুরু হয় বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহের কাজ। ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বিএলও-দের প্রতিটি বুথের সমস্ত বাড়িতে পৌঁছনোর নির্দেশ ছিল কমিশনের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কার দিকে ঝুঁকছে পাল্লা? কী বলছে সমীক্ষা?

West Bengal Election 2026: ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কি ফের জিতবে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, নাকি ঘুরে দাঁড়াবে ভারতীয় জনতা পার্টি? সমীক্ষা কি বলছে—তৃণমূল এগিয়ে, নাকি লড়াই টানটান? ভোটের আগে জনমত কতটা বদলাতে পারে?

তবে প্রক্রিয়া শুরু হতেই আইনি লড়াইও শুরু হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বাসিন্দা মোস্তারি বানু সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। সেখানে নির্বাচন কমিশনের SIR প্রক্রিয়ায় এনুমারেশন ফর্মে বাধ্যতামূলক পাসপোর্ট সাইজ ছবি যুক্ত করার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। মোস্তারির যুক্তি ছিল, মুসলিম সমাজের বহু নারী ধর্মীয় কারণে মুখ ঢেকে রাখেন। ফলে ছবি বাধ্যতামূলক করলে তাঁদের ভোটাধিকার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, যা সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। তবে প্রথম শুনানির কয়েক ঘণ্টা আগেই নির্বাচন কমিশন জানায়, ছবি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

এই মামলায় ১৯ জানুয়ারি এক গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানায়, মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড জন্মতারিখের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রভাবিত ব্যক্তিরা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সই বা টিপছাপ সহ সরল আবেদনের ভিত্তিতে নথি জমা দিতে পারবেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এসআইআর: প্রাক্তন বিচারপতিরও নাম উঠে গেল, কী হবে সাধারণ মানুষের?

West Bengal voter list controversy: সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ নাম বাদ। কারও কাছে পাসপোর্ট আছে, তবুও ভোটাধিকার অনিশ্চিত। প্রাক্তন বিচারপতিও রেহাই পাননি। কারণ না জানিয়ে নাম বাদ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ কী করবে? ট্রাইবুনাল কোথায়, প্রক্রিয়া কী কেউ জানে না।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি খসড়া তালিকা প্রকাশের পর যাঁদের নাম নিয়ে সংশয় ছিল, তাঁদের নোটিস পাঠিয়ে শুনানিতে ডাকা হয়। এই প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম থেকেই নাগরিকত্ব হারানো এবং দেশছাড়া হওয়ার আতঙ্কে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কাজের চাপে বেশ কিছু বিএলও-রও মৃত্যু হয়। এসআইআর নিয়ে নানান চাপানউতোরের মাঝেই ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি SIR প্রক্রিয়ায় আদালত হস্তক্ষেপ করে। প্রক্রিয়া চালু রাখার পাশাপাশি সময়সীমা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়।

নতুন সূচি অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুনানি, ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যাচাই এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দেয় আদালত। এই সময়েই লক্ষ লক্ষ দাবি নিষ্পত্তি করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক নাম বাদ বা স্থগিত রাখা হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR-এ লাভবান হবে কে? পশ্চিমবঙ্গে ভোট রাজনীতির অঙ্ক কি ঘুরিয়ে দেবে ভোটার তালিকার সংশোধন?

West Bengal Politics: ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তাই ভোটের অঙ্ক বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। SIR-এ কে লাভের গুড় ঘরে তুলবে, সেই অঙ্কই কষছে তৃণমূল-বিজেপি যুযুধান দুই পক্ষ।

২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় চূড়ান্ত তালিকা। মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২। সেই তালিকায় বিবেচনাধীন ছিলেন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫। যা নিয়ে চরমে ওঠে রাজনৈতিক বিতর্ক। মার্চ মাসে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ২৩ মার্চ প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় প্রায় ২৭ লক্ষ নাম থাকলেও তার মধ্যে ৪০ শতাংশ নাম বাদ পড়ে।

২৭ মার্চ দ্বিতীয় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ হলেও কতজনের নাম নিষ্পত্তি হয়েছে বা কতজন বাদ পড়েছেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এর মধ্যেই ২৯ মার্চ তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। তাতে দেখা যাচ্ছে, এখনও প্রায় ২ লক্ষ ভোটার বিবেচনাধীন রয়েছেন।

এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিবেচনাধীন তালিকা থেকেও প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশ নাম ইতোমধ্যেই বাদ পড়েছে। চূড়ান্ত তালিকার পরবর্তী ধাপে ৪০ লক্ষের তালিকা থেকে আরও প্রায় ১৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে।

এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়া ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চরমে উঠেছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের দাবি, তালিকা শুদ্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ, অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ— ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। সময়সীমা কম থাকায় আপিল প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বহু মানুষ। নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে ভোটার তালিকা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি হয়েছে বাংলায়। SIR প্রক্রিয়া শেষের পথে, তবে বিতর্ক থামার কোনও ইঙ্গিত এখনও নেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।