একযোগে বরখাস্ত নয় জেনারেল! কেন শাস্তির মুখে চিনের সেনা শীর্ষকর্তারা?

9 military officers dismissed in China: তবে বহু বিশ্লেষকই বলছেন, এই অভিযান শি জিনপিঙের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাই তিনি পার্টির সর্বস্তরে নিজের প্রভাবকে আরও দৃঢ় করছেন।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
একযোগে বরখাস্ত নয় জেনারেল! কেন শাস্তির মুখে চিনের সেনা শীর্ষকর্তারা?

চিনের সেনাবাহিনীতে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি। দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে সেনাবাহিনীর নয়জন শীর্ষ জেনারেলকে। একই সঙ্গে দল থেকেও তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে চিনের সামরিক কাঠামোয় এত বড়ো ধরনের অভিযান দেখা যায়নি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা 'দলীয় শৃঙ্খলা গুরুতরভাবে ভঙ্গ করেছেন' এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকার এটিকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই সিদ্ধান্ত আসলে শি জিনপিঙের নেতৃত্বে শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের উপর আরও জোর দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে চিন তাদের সেনাবাহিনীতে চলমান অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়ার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল।

এই অভিযানে কারা বাদ পড়লেন?

যে নয়জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে দল ও বাহিনী থেকে সরানো হয়েছে, তাঁদের অনেকেই চিনের ক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (CMC) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তাঁরা হলেন—

১) হি ওয়েইডং— সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শি জিনপিংয়ের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা,

২) মিয়াও হুয়া— সিএমসি-র রাজনৈতিক বিভাগের পরিচালক,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমেরিকা বনাম চিন! চাঁদ জয়ের যুদ্ধে কে এগিয়ে?

Space Race: ১৯৭২-এর পর বহুদিন চাঁদ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো, কিন্তু হঠাৎ কী এমন হল যার জন্য সবাই চাঁদ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে চাঁদের বুকে জমানো সম্পদের অন্দরে।

৩) হে হংজুন— একই বিভাগের নির্বাহী উপপরিচালক,

৪) ওয়াং জিউবিন— জয়েন্ট অপারেশন কমান্ড সেন্টারের উপপরিচালক,

৫) লিন জিয়াংইয়াং— ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের প্রধান,

৬) কিন শুতং— সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক কমিশনার,

৭) ইয়ুআন হুয়াজি— নৌবাহিনীর রাজনৈতিক কমিশনার,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিনের গোলামিই নেপালে কেপি ওলির পতন ডেকে আনল?

Pro-China KP Oli: নেপালের জনগণের একাংশ এটা দেশকে স্বাধীনভাবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও, অনেকেই মনে করেন ওলির নীতিতে নেপাল অতিরিক্তভাবে চিনের প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে।

৮) ওয়াং হৌবিন— রকেট ফোর্সেস কমান্ডার,

৯) ওয়াং চুনিং— আর্মড পুলিশ ফোর্স কমান্ডার।

এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নাম হি ওয়েইডং। তিনি শুধু সিএমসি-র ভাইস চেয়ারম্যানই ছিলেন না, কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরোরও সদস্য ছিলেন। গত মার্চ মাসে তাঁকে শেষবার প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছিল। বিবিসি জানিয়েছে, হি ওয়েইডং এই প্রথম পলিটব্যুরোর কোনো সদস্য যিনি তদন্ত ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন।

চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা দলের নিয়ম-কানুন ভেঙেছেন এবং দায়িত্ব পালনে গুরুতর অপরাধ করেছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তদন্ত কেবল অর্থনৈতিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেকেই মনে করছেন, এটি মূলত শি জিনপিঙের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আরও মজবুত করার এক কৌশল। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষক নেইর থমাস বিবিসি-কে বলেন, “শি জিনপিং চান পার্টি এবং সেনাবাহিনীতে যাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অবিশ্বস্ত, তাঁদের সরিয়ে দিতে।" তাঁর মতে, এভাবেই পার্টিকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হবে ২০ অক্টোবর। ওই বৈঠকে চিনের অর্থনৈতিক নীতি ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আগেই সেনা নেতৃত্বে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রকেট ফোর্সেও একাধিক পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি চিনের পারমাণবিক অস্ত্রাগার পরিচালনা করে। গত বছর থেকেই সেখানে বড়ো ধরনের অদলবদল শুরু হয়েছে। বাহিনীর কমান্ডার ও উপকমান্ডার দু-জনকেই হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়। এবার আবার সেই বাহিনীর প্রধান ওয়াং হৌবিন-কে বরখাস্ত করা হলো। ফলত বোঝাই যাচ্ছে, এই বাহিনীতেও শি জিনপিঙের আস্থা কমেছে।

এর আগেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চিনের দুই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংঘে ও লি শাংফুকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও এ রকম ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি গ্যাং হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পরে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর উত্তরসূরি লিউ জিয়ানচাউকেও গত জুলাই থেকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না।

চিনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন কয়েক মাস আগে একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল, তখন সেনা কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছিল, বাহিনীর ভেতরে ‘অপকর্ম, অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততা’কে আর বরদাস্ত করা হবে না। এই নির্দেশিকার পরপরই বড়ো পরিসরে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, যা অনেকের কাছে শি জিনপিঙের কৌশলগত সতর্কবার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে বহু বিশ্লেষকই বলছেন, এই অভিযান শি জিনপিঙের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাই তিনি পার্টির সর্বস্তরে নিজের প্রভাবকে আরও দৃঢ় করছেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বারবার বলেছেন, “দল যদি নিজের ভেতরের দুর্নীতি ও ভ্রান্তি দূর না করে, তাহলে সেটিই হবে পতনের কারণ।” এই কারণেই তাঁর নেতৃত্বে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা এবং নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

২০ অক্টোবরের অধিবেশনে পার্টির ভেতরের নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। বরখাস্ত হওয়া জেনারেলদের জায়গায় যাদের আনা হবে, তার মাধ্যমেই বোঝা যাবে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ কী হতে পারে। তবে আপাতত স্পষ্ট যে শি জিনপিং চিনের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছেন। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই আবারও স্পষ্ট হয়ে গেল।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।