একযোগে বরখাস্ত নয় জেনারেল! কেন শাস্তির মুখে চিনের সেনা শীর্ষকর্তারা?
9 military officers dismissed in China: তবে বহু বিশ্লেষকই বলছেন, এই অভিযান শি জিনপিঙের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাই তিনি পার্টির সর্বস্তরে নিজের প্রভাবকে আরও দৃঢ় করছেন।

চিনের সেনাবাহিনীতে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি। দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে সেনাবাহিনীর নয়জন শীর্ষ জেনারেলকে। একই সঙ্গে দল থেকেও তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে চিনের সামরিক কাঠামোয় এত বড়ো ধরনের অভিযান দেখা যায়নি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা 'দলীয় শৃঙ্খলা গুরুতরভাবে ভঙ্গ করেছেন' এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকার এটিকে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই সিদ্ধান্ত আসলে শি জিনপিঙের নেতৃত্বে শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের উপর আরও জোর দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে চিন তাদের সেনাবাহিনীতে চলমান অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়ার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল।
এই অভিযানে কারা বাদ পড়লেন?
যে নয়জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে দল ও বাহিনী থেকে সরানো হয়েছে, তাঁদের অনেকেই চিনের ক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (CMC) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তাঁরা হলেন—
১) হি ওয়েইডং— সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শি জিনপিংয়ের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা,
২) মিয়াও হুয়া— সিএমসি-র রাজনৈতিক বিভাগের পরিচালক,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Space Race: ১৯৭২-এর পর বহুদিন চাঁদ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো, কিন্তু হঠাৎ কী এমন হল যার জন্য সবাই চাঁদ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে চাঁদের বুকে জমানো সম্পদের অন্দরে।
৩) হে হংজুন— একই বিভাগের নির্বাহী উপপরিচালক,
৪) ওয়াং জিউবিন— জয়েন্ট অপারেশন কমান্ড সেন্টারের উপপরিচালক,
৫) লিন জিয়াংইয়াং— ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ডের প্রধান,
৬) কিন শুতং— সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক কমিশনার,
৭) ইয়ুআন হুয়াজি— নৌবাহিনীর রাজনৈতিক কমিশনার,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pro-China KP Oli: নেপালের জনগণের একাংশ এটা দেশকে স্বাধীনভাবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও, অনেকেই মনে করেন ওলির নীতিতে নেপাল অতিরিক্তভাবে চিনের প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে।
৮) ওয়াং হৌবিন— রকেট ফোর্সেস কমান্ডার,
৯) ওয়াং চুনিং— আর্মড পুলিশ ফোর্স কমান্ডার।
এই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নাম হি ওয়েইডং। তিনি শুধু সিএমসি-র ভাইস চেয়ারম্যানই ছিলেন না, কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম পলিটব্যুরোরও সদস্য ছিলেন। গত মার্চ মাসে তাঁকে শেষবার প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছিল। বিবিসি জানিয়েছে, হি ওয়েইডং এই প্রথম পলিটব্যুরোর কোনো সদস্য যিনি তদন্ত ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন।
চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা দলের নিয়ম-কানুন ভেঙেছেন এবং দায়িত্ব পালনে গুরুতর অপরাধ করেছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তদন্ত কেবল অর্থনৈতিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেকেই মনে করছেন, এটি মূলত শি জিনপিঙের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আরও মজবুত করার এক কৌশল। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষক নেইর থমাস বিবিসি-কে বলেন, “শি জিনপিং চান পার্টি এবং সেনাবাহিনীতে যাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অবিশ্বস্ত, তাঁদের সরিয়ে দিতে।" তাঁর মতে, এভাবেই পার্টিকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হবে ২০ অক্টোবর। ওই বৈঠকে চিনের অর্থনৈতিক নীতি ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আগেই সেনা নেতৃত্বে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রকেট ফোর্সেও একাধিক পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি চিনের পারমাণবিক অস্ত্রাগার পরিচালনা করে। গত বছর থেকেই সেখানে বড়ো ধরনের অদলবদল শুরু হয়েছে। বাহিনীর কমান্ডার ও উপকমান্ডার দু-জনকেই হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়। এবার আবার সেই বাহিনীর প্রধান ওয়াং হৌবিন-কে বরখাস্ত করা হলো। ফলত বোঝাই যাচ্ছে, এই বাহিনীতেও শি জিনপিঙের আস্থা কমেছে।
এর আগেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চিনের দুই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংঘে ও লি শাংফুকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়েও এ রকম ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি গ্যাং হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পরে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর উত্তরসূরি লিউ জিয়ানচাউকেও গত জুলাই থেকে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না।
চিনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন কয়েক মাস আগে একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল, তখন সেনা কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছিল, বাহিনীর ভেতরে ‘অপকর্ম, অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততা’কে আর বরদাস্ত করা হবে না। এই নির্দেশিকার পরপরই বড়ো পরিসরে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, যা অনেকের কাছে শি জিনপিঙের কৌশলগত সতর্কবার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে বহু বিশ্লেষকই বলছেন, এই অভিযান শি জিনপিঙের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাই তিনি পার্টির সর্বস্তরে নিজের প্রভাবকে আরও দৃঢ় করছেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বারবার বলেছেন, “দল যদি নিজের ভেতরের দুর্নীতি ও ভ্রান্তি দূর না করে, তাহলে সেটিই হবে পতনের কারণ।” এই কারণেই তাঁর নেতৃত্বে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা এবং নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
২০ অক্টোবরের অধিবেশনে পার্টির ভেতরের নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। বরখাস্ত হওয়া জেনারেলদের জায়গায় যাদের আনা হবে, তার মাধ্যমেই বোঝা যাবে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ কী হতে পারে। তবে আপাতত স্পষ্ট যে শি জিনপিং চিনের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছেন। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই আবারও স্পষ্ট হয়ে গেল।







