বারবার হরতাল! কেন ক্ষুব্ধ ডেলিভারি কর্মীরা?

Delivery workers strike India: সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে ‘কুইক কমার্স’ মডেল নিয়ে। ১০ মিনিটে ডেলিভারি বিষয়টিও বিপজ্জনক। সময়ের চাপে বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবকিছুই বাড়ছে।

inscript
৩ মিনিট
বারবার হরতাল! কেন ক্ষুব্ধ ডেলিভারি কর্মীরা?

নিউ ইয়ার ইভ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ব্যস্ততা তুঙ্গে ওঠার কথা। উৎসবের খাবার, কেক, পানীয়— সবই এখন কয়েক ক্লিকেই দোর গোড়ায়। কিন্তু বছরের ঠিক এই সময়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেলিভারি অ্যাপগুলির স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি বার্তা—‘ডেলিভারি টাইম বেশি লাগতে পারে’। কোথাও আবার পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ। কারণ একটাই, ডেলিভারি কর্মীদের ধর্মঘট।

এই প্রথম নয় বড়দিন, দুর্গাপুজো, দিওয়ালি কিংবা নববর্ষ— যে যে সময় কোম্পানিগুলির ব্যবসা সবচেয়ে লাভজনক, সেই সময়ই বারবার কাজ বন্ধ করছেন গিগ কর্মীরা। প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার হরতাল? কী এমন ক্ষোভ জমেছে যে উৎসবের দিনেও হরতাল করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা?

সুইগি, জোম্যাটো, ব্লিঙ্কিট, জেপ্টো, অ্যামাজনে, ফ্লিপকার্ট— এই সব নাম আজ ঘরে ঘরে পরিচিত। এই বিশাল ডিজিটাল সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে তুলেছেন যাঁরা, তাঁরা পরিচিত ‘ডেলিভারি পার্টনার’ নামে। কিন্তু কোম্পানির কাগজে তাঁরা কর্মচারী নন, স্বনিয়োজিত। এই শব্দটাই মূল সমস্যা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নতুন শ্রম কোডে বিতর্ক, কেন ১০টি ট্রেড ইউনিয়ন তীব্র বিরোধিতা করছে?

India’s New Labour Codes: ১০টি জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, কোডগুলি 'শ্রমিক-বিরোধী ও মালিকপক্ষ-বান্ধব', 'প্রতারণামূলক', এবং 'গণতান্ত্রিক আলোচনাকে উপেক্ষা করা'।

ডেলিভারি কর্মীরা বলছেন, বাস্তবে তাঁরা পূর্ণ সময়ের শ্রমিক। দিনে ১০-১২ ঘণ্টা রাস্তায় কাটে। বৃষ্টি, কুয়াশা, তীব্র গরম কোনো কিছুতেই কাজ বন্ধ রাখার উপায় নেই। কিন্তু কাগজে কলমে তাঁরা কর্মচারী নন, ফলে ন্যূনতম মজুরি, ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন কোনোটাই তাঁদের অধিকারে নেই। এই বৈষম্য থেকেই ক্ষোভ জমছে।

টেলেঙ্গানা গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মী ইউনিয়ন (Telangana Gig and Platform Workers Union বা TGPWU), ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ-ভিত্তিক ট্রান্সপোর্ট কর্মী (Indian Federation of App-Based Transport Workers বা IFAT) এবং গিগ ও প্ল্যাটফর্ম সার্ভিস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (Gig & Platform Service Workers Union) — এই তিনটি সংগঠন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।

ডেলিভারি কর্মীদের অন্যতম বড় অভিযোগ আয় নিয়ে। কয়েক বছর আগেও ইনসেনটিভ মিলিয়ে দিনে তুলনামূলক ভালো টাকা রোজগার করা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে ইনসেনটিভ কাঠামো বদলেছে। বেস পে কমেছে, অর্ডার প্রতি টাকা কমেছে, আবার সেই টাকা তুলতে হলে অসম্ভব শর্ত মানতে হচ্ছে। অনেক কর্মীর বক্তব্য, দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও হাতে থাকে ৭০০-৮০০ টাকা। সেখান থেকে পেট্রোল, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মোবাইল ডেটা সব খরচ বাদ দিলে কার্যত কিছুই থাকে না। দুর্ঘটনায় গাড়ি নষ্ট হলে বা অসুস্থ হলেও পুরো দায় নিজের কাঁধে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অতিরিক্ত চাপে কাজ করলেই সেরা পারফর্ম্যান্স! কেন এমন ধারণা ভারতের চাকরির বাজারে?

Indian Work Culture: পরিসংখ্যান বলছে শতকরা ৫১ ভাগ ভারতীয় কর্মচারী সপ্তাহে ৪৯ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, অর্থাৎ সোম থেকে শুক্র কর্ম দিবসের হিসাবে দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টার চেয়েও বেশি!

অন্যদিকে, ডেলিভারি কর্মীদের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক আজ মানুষ নয়, অ্যালগরিদম। কে কত অর্ডার পাবেন, কে বোনাস পাবেন বা কার আইডি বন্ধ হবে—এই সব সিদ্ধান্ত মানুষের নয়, অ্যাপের ভেতরের অদৃশ্য হিসাবেই ঠিক হয়। সময় মতো ডেলিভারি না হলে রেটিং কমে। রেটিং কমলে অর্ডার কমে। কোনো অভিযোগ এলে শুনানি ছাড়াই আইডি সাসপেন্ড। কর্মীরা জানেন না কেন শাস্তি পেলেন, কবে আবার কাজে ফিরবেন, কার কাছে অভিযোগ জানাবেন। এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের।

সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে ‘কুইক কমার্স’ মডেল নিয়ে। ১০ মিনিটে ডেলিভারি বিষয়টিও বিপজ্জনক। সময়ের চাপে বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবকিছুই বাড়ছে। ডেলিভারি কর্মীরা বলছেন, দ্রুত ডেলিভারির চাপ আসলে তাঁদের উপরই পড়ে। দেরি হলেই জরিমানা, রেটিং ডাউন, ইনসেনটিভ কাটা যায়। কিন্তু দুর্ঘটনায় আহত হলে কোম্পানির দায় প্রায় নেই।

প্রশ্ন ওঠে, উৎসবের দিনে কেন কাজ বন্ধ? কর্মীদের যুক্তি স্পষ্ট। এই দিনগুলোতেই প্ল্যাটফর্মগুলির লাভ সবচেয়ে বেশি। সাধারণ দিনগুলিতে তাঁদের কথা কেউ শোনে না। কিন্তু উৎসবের দিনে পরিষেবা বন্ধ হলে আলোচনায় আসে তাঁদের দাবি। বড়দিনের পর নিউ ইয়ার ইভ— এই ধারাবাহিক ধর্মঘট আসলে চাপ তৈরি করতেই করা। কর্মীরা জানেন, এই সময়েই তাঁদের দর কষাকষির ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।

একসময় গিগ কর্মীদের বড় সমস্যা ছিল সংগঠনের অভাব। এখন সেই ছবি বদলাচ্ছে। বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে ডেলিভারি কর্মী ইউনিয়ন, সমন্বয় কমিটি। সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের ডাক। এই সংগঠনগুলির প্রধান দাবি হলো, গিগ কর্মীদের শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে, তাঁদের ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করতে হবে, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বিমার ব্যবস্থা রাখতে হবে, অ্যাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট করতে হবে, আর শাস্তি দেওয়ার আগে তাঁদের কথা শুনতে হবে।

ভারতে ‘কোড অন সোশ্যাল সিকিউরিটি’ আইনে গিগ কর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সীমিত। সামাজিক সুরক্ষা তহবিল থাকলেও তার সুবিধা কতজন পাচ্ছেন, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কর্মীদের অভিযোগ, সরকার ও কোম্পানি দু’পক্ষই দায় এড়াচ্ছে। একদিকে বলা হচ্ছে, তাঁরা কর্মী নন। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, তাঁরা স্বাধীন। কিন্তু এই স্বাধীনতার মূল্য তাঁদের জীবন ও জীবিকা দিয়ে দিতে হচ্ছে।

বারবার হরতাল আসলে একটি সতর্কবার্তা। গিগ অর্থনীতি ভারতের শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অর্থনীতির ভিত যদি সব সময় অসন্তোষে নড়বড়ে থাকে, তাহলে তা দীর্ঘদিন টিকবে না। বলতেই হয়, ডেলিভারি কর্মীরা নিজেদের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর ন্যায্য অধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলছেন তা উপেক্ষা করলে উৎসবের দিনগুলোয় পরিষেবা বিঘ্নই নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক সংঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।